অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
জুলাই অভ্যুত্থানের এক বছর পার করেছে দেশ। গত বছরের ৫ আগস্ট দীর্ঘ ১৫ বছরের অপশাসনের বিরূদ্ধে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অবসান ঘটেছে ফ্যাসিবাদী সরকারের। দীর্ঘ দিন ধরে চলতে থাকা এ অপশাসন দেশের প্রশাসনিক ও আর্থিকসহ সবগুলো খাতকে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার মাধ্যমে এক প্রকার ধ্বংসের ধারপ্রান্তে নিয়ে যায়। বাদ যায়নি দেশের আর্থিক খাতের আয়না হিসেবে পরিচিত পুঁজি বাজারও। সরকারের ছত্রছায়ায় বিভিন্ন সুবিধাভোগী গোষ্ঠী দেশের শিল্প ও সেবা খাতের পুঁজি জোগানের এ খাতটিতে লুটপাটের মাধ্যমে লণ্ডভণ্ড করে দেয়। পরিবর্তনের এক বছরের মাথায় নেয়া নানা সংস্কার কার্যক্রম পুঁজি বাজারকে আবার আস্থায় ফেরাচ্ছে।
৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর পুঁজি বাজার সংস্কারের অংশ হিসেবে ওই বছরের ১৮ আগস্ট পুঁজি বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) নতুনভাবে পুনর্গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। তবে নতুন কমিশন কাজ শুরু করার অল্প কিছুদিনের মধ্যে বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শুরু করলে প্রথমদিকে কমিশনের অভ্যন্তরে কর্মকর্তা কর্মচারীদের একটি অংশ নতুন কমিশনের সাথে অসহযোগিতার মনোভাব দেখায়। পরবর্তিতে অর্থমন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে সার্বিক বিষয় কমিশনের আয়ত্বে চলে আসে। ওই সময় প্রধান উপদেষ্টা আনিসুজ্জামান চৌধুরীকে পুঁজি বাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী নিয়োগ করলে সংস্কারের গতি আরো ত্বরান্বিত হয়। তবে দীর্ঘ দিনের অব্যবস্থাপনার শিকার পুঁজি বাজারে তখনো টানা দরপতন চলছিল। এতে দিনের পর দিন পুঁজি হারাতে থাকা বিনিয়োগকারিরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।
পরিস্থিতি সামাল দিতে এগিয়ে আসেন খোদ প্রধান উপদেষ্টা। ১১ মে প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তা ও বিএসইসির এক শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা পুঁজি বাজারের সঙ্কট নিরসনে সাতটি নির্দেশনা প্রদান করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল পুঁজি বাজারের গভীরতা বাড়াতে দেমে কার্যক্রম পরিচালনা করা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে পুঁজি বাজারে তালিকাভুক্ত করা, দেশী-বিদেশী লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকারের মালিকানায় থাকা শেয়ারের একটি অংশ বাজারে নিয়ে আসা একবং রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন লাভজনক প্রতিষ্ঠানকে দ্রুততম সময়ে পুঁজি বাজারে তালিকাভুক্ত করার ব্যবস্থা নেয়া। পরবর্তিতে বিএসইসি প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামানের নেতৃত্বে এ নির্দেশনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে শুরু করেন। ইতোমধ্যে বহুজাতিক কোম্পানি ও রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে প্রায় ১৫টি প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্তি নিয়ে অর্থমন্ত্রণলয় ও বিএসইসি সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর সাথে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। অচিরেই এসব কোম্পানির তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি নতুন কমিশন ইতঃপূর্বে পুঁজি বাজারে সংগঠিত বিভিন্ন অনিয়মের জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে শাস্তিস্বরূপ অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করে আদেশ জারি করে যার কারণে দীর্ঘ দিন ধরে অনিয়মের শিকার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে পুঁজি বাজার নিয়ে আস্থার পরিবেশ তৈরি হতে শুরু করে। পুঁজি বাজারের সাম্প্রতিক সময়ের আচরণ তথা লেনদেন ও সূচকের উন্নতি তারই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন পুঁজি বাজার সংশ্লিষ্টরা। ৩১ জুলাই দেশের প্রধান শেয়ার বাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের লেনদেন ও সূচক চলতি বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায়। প্রায় ১১ মাস পর ডিএসইর লেনদেন আবার হাজার কোটি টাকা ছাড়ায়। এর এক দিন পরই সূচক পৌঁছে যায় পাঁচ হাজার ৫০০ পয়েন্টে যা গত দু’মাস আগেও চার হাজার ৬১৫ পয়েন্টে ছিল।
পুঁজি বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, বাজারে এখন বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। এ সময় দরকার ভালো শেয়ারের জোগান। প্রধান উপদেষ্টা নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে দ্রুততম সময়ে ভালো ও মৌল ভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলোর তালিকাভুক্তি নিশ্চিত করা গেলে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের পদভারে আবার সরগরম হয়ে উঠবে পুঁজি বাজার। একই সাথে নতুন কমিশন সব ধরনের প্রভাবমুক্ত হয়ে পুঁজি বাজারের শৃঙ্খলা রক্ষা ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণে যথাযথ ভূমিকা পালন করবে। আর এভাবে এক সময় দেশীয় উদ্যোক্তারা পুঁজি বাজার থেকে ব্যাংকিং খাতের চেয়েও অনেক কম খরচে বিনিয়োগের নিশ্চিত পুঁজি আহরণ করার সুযোগ পাবেন।
এ দিকে ৫ আগস্ট পুঁজি বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন কর্তৃক ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস, ২০২৫’ উপলে কমিশনের সব গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অংশগ্রহণে একটি আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। বিএসইসি ৫ আগস্ট এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দুপুর ১২টায় কমিশনের মাল্টিপারপাস হলে অনুষ্ঠিত ওই আলোচনা সভার সূচনা হয়। বিএসইসির চেয়ারম্যান, খন্দকার রাশেদ মাকসুদ ওই অনুষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। বিএসইসির কমিশনাররা, নির্বাহী পরিচালকরা, পরিচালকরাসহ বিএসইসির সব কর্মকর্তা-কর্মচারী অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন। সভায় বিএসইসির চেয়ারম্যান, খন্দকার রাশেদ মাকসুদসহ বিএসইসির কমিশনাররা বক্তব্য রাখেন।
সভায় ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’ এর গুরুত্ব ও তাৎপর্যের ওপর আলোচনা হয়। এ ছাড়াও সব শহীদের আত্মত্যাগসহ সবার অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়।
আলোচনা সভা শেষে জুলাই অভ্যুত্থানের সব শহীদের রূহের মাগফিরাত কামনা এবং দেশের সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল কামনা করে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। বিএসইসির কর্মকর্তা-কর্মচারীরাসহ উপস্থিত সবাই ওই দোয়া মাহফিলে অংশগ্রহণ করেন। একইসাথে এ দিন ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’ উপলে আয়োজিত র্যালিতে বিএসইসির চেয়ারম্যান, খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বে বিএসইসির সব কমিশনার ও কর্মকর্তা-কর্মচারী যোগদান করেন। ●
অকা/পুঁবা/ফর/বিকাল/৬ আগস্ট, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 7 months আগে

