অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
পুঁজি বাজারের চলমান সঙ্কট নিয়ে সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই গলদঘর্ম হয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু কোনো কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। আস্থায় ফিরছে না পুঁজি বাজার। হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়া দু-একদিন চমক দিয়ে সূচকের উন্নতি ঘটলেও পরদিনই আবার সেই আগের ধারায় ফিরছে বাজার। টানা দরপতনের যেমন সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না তেমনি হঠাৎ করে বাজার সূচকের কোনো কোনো দিনের উন্নতির পেছনেও সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই।
সব মিলে বাজারের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা দিন দিন তলানিতে নামছে। অথচ এর থেকে উত্তরণে সংশ্লিষ্ট সব মহলের দৌড়ঝাঁপও নতুন নয়। প্রায় প্রতিদিনই সংশ্লিষ্ট স্টেক হোল্ডারদের সাথে সিরিজ বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কখনো তা পুঁজি বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কার্যালয়ে, আবার কখনো তা ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে। সর্বত্রই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ একসাথে এ সঙ্কটের সমাধান খোঁজার চেষ্টা করছেন। কিন্তু সবার এ উদ্যোগ কেন যেন হালে পানি পাচ্ছে না। অব্যাহত রয়েছে পতনের ধারা।
১৯ মেও দেশের পুঁজি বাজারে দরপতন দিয়ে লেনদেন শেষ হয়েছে। প্রধান পুঁজি বাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স এদিন ১৪ দশমিক ৭৫ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। ৪ হাজার ৭৯১ দশমিক ০৮ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি সোমবার দিনশেষে নেমে আসে ৪ হাজার ৭৭৬ দশমিক ৩৩ পয়েন্টে। বাজারটির অপর দুই সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ৮ দশমিক ৩০ ও ৪ দশমিক ২১ পয়েন্ট।
দেশের দ্বিতীয় পুঁজি বাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই এদিন ২৫ দশমিক ০৭ পয়েন্ট হারায়। সিএসইর অন্য দুই সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ৪৫ দশমিক ৭৫ ও ১৩ দশমিক ১৬ পয়েন্ট।
এ দিকে পরিস্থিতি উত্তরণে ১৮ মে ডিএসই পরিদর্শন করেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও পুঁজি বাজার উন্নয়ন কমিটির সভাপতি ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী। এদিন পুঁজি বাজারের সব স্টেক হোল্ডারদের নিয়ে তিনি পুনরায় বৈঠক করেন। সভায় বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ, কমিশনার মো. মহসিন চৌধুরী, মো. আলি আকবর, শেয়ার বাজার সংস্কারবিষয়ক টাস্কফোর্সের সদস্যবৃন্দ, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যবৃন্দ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপ, ডিবিএ, সিডিবিএল, সিসিবিএলের প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সভায় স্বাগত বক্তব্যে ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম দেশের শেয়ার বাজারের সামগ্রিক অবস্থা, ডিএসইর কার্যক্রম এবং শেয়ার বাজারের কাঠামোগত বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শেয়ার বাজারের নানা কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো অর্থনীতিতে শেয়ার বাজার ও অর্থ বাজারের ভূমিকা মুখোমুখি হওয়া, নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতা, আইপিও প্রক্রিয়ার ডিজিটালাইজেশন ও মূল্যায়ন, কর্পোরেট বন্ড ও মিউচুয়াল ফান্ডের পলিসি ও প্রক্রিয়া সহজীকরণ, ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্ট ও ডিসকোজারের নির্ভরযোগ্যতা, বাজারের মধ্যস্থতাকারীদের সমতা ও সুশাসন, ইনসাইডার ট্রেডিং, সার্ভেইল্যান্স ও শেয়ার বাজারের জন্য পলিসি সাপোর্ট।
বর্তমানে শেয়ার বাজারের পতনের কারণ হিসেবে ডিএসই উল্লেখ করেছে সরকারি সিকিউরিটিজের উচ্চ সুদের হার, করপোরেট প্রফিট হ্রাস, নেগেটিভ ইকুইটি, টাকার অবমূল্যায়ন এবং ম্যানিপুলেটরের ভূমিকা। শেয়ার বাজারের আস্থা বৃদ্ধির জন্য করণীয় বিষয়ে তিনি বলেন, বিও হিসাবের মেইনটেন্যান্স ফি ছাড়, ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স মওকুফ, ব্রোকারেজ কমিশন ০.৫% থেকে হ্রাস করে ০.৩৫% করা, ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের তালিকাভুক্ত কোম্পানি থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ ১ ল টাকা পর্যন্ত করমুক্ত করা এবং লভ্যাংশের উৎসে কর ১০% বা ১৫% চূড়ান্ত করদায়ী হিসেবে বিবেচনা করা, নেগেটিভ ইকুইটির বোঝা থেকে বিনিয়োগকারীদের মুক্ত করা, প্রতি এক লাখ টাকার অগ্রিম আয়কর ৫০ টাকা থেকে কমিয়ে ১৫ টাকা করা, সিসি অ্যাকাউন্টের লভ্যাংশ ২৫% ইনভেস্টর প্রটেকশন ফান্ডে জমা রেখে বাকি অংশ ব্রোকারদের ব্যবহারের সুযোগ দেয়া, নেগেটিভ ইকুইটি ধীরে ধীরে প্রভিশনিং করা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নীতি সহায়তা প্রদানের জন্য নিয়ন্ত্রক ও বাজার মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে প্রতি মাসে যৌথ বৈঠকের আয়োজন করা, তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে কর ব্যবধান ন্যূনতম ১০% করা, বহুজাতিক ও ভালো মৌলভিত্তি সম্পন্ন দেশীয় কোম্পানি তালিকাভুক্ত করা, শেয়ার বাজারে থেকে অর্থ উত্তোলনের প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজ করা, করপোরেট বন্ডের ক্ষেত্রে অ্যাসেট ব্যাকড সিকিউরিটিজের আয়কে করমুক্ত করা এবং কোম্পানির ৫০০ কোটি টাকার ওপরে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে আইপিও/বন্ডের মাধ্যমে শেয়ার বাজার থেকে মূলধন উত্তোলন বাধ্যতামূলক করা।
সরকারের ম্যাক্রো চ্যালেঞ্জগুলো থেকে উত্তরণের জন্য শেয়ার বাজারকে ব্যবহার সম্পর্কে মমিনুল ইসলাম বলেন, সরকারের হাতে থাকা বহুজাতিক ও লাভজনক বেসরকারি কোম্পানি থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার, সরকারের হাতে থাকা ব্যাংক, বীমা, বিমানসহ বিভিন্ন কোম্পানি বেসরকারীকরণ করা যেখানে শর্ত থাকবে যে ২৪ মাসের মধ্যে তা শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হতে হবে, সরকার তার বিভিন্ন প্রাপ্যগুলোকে সিকিউরিটাইজেশন করতে পারে, যা পরবর্তীতে শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত করা যেতে পারে, সাশ্রয়ী মূল্যে আবাসন নিশ্চিত করার জন্য সরকারি জমিতে আবাসন প্রকল্পগুলোকে রিয়েল স্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্টের মাধ্যমে করা যেতে পারে, যা বিশ্বখ্যাত ফান্ড ম্যানেজাররা পরিচালনা করবে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রয়োজনীয় অর্থের জন্য শেয়ার বাজারের মাধ্যমে বন্ড ইস্যু করতে পারে। তিনি শেয়ার বাজার সংক্রান্ত পলিসিগত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে স্টক এক্সচেঞ্জের ন্যূনতম একজন প্রতিনিধি রাখার ব্যাপারে অনুরোধ করেন।
ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, সরকার শেয়ার বাজারের উন্নয়ন ও সংস্কার নিশ্চিতে বিদ্যমান সমস্যাগুলো আন্তরিকতার সাথে দ্রুত সমাধান করার চেষ্টা করছে। প্রধান উপদেষ্টা দেশের উন্নয়ন ও সংস্কার তথা পরিবর্তনের জন্য কাজ করছেন। দেশের অর্থনীতি এখন ফিরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। বিদেশী ঋণ পরিশোধসহ অর্থনীতিতে অনেক ইতিবাচক ঘটনা ঘটছে। এসবের প্রভাব শিগগিরই শেয়ার বাজারে পড়বে। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ হতে যাচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশের উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিদেশীদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে শেয়ার বাজারের শক্ত কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। শেয়ার বাজারকে শক্ত কাঠামোয় গড়ে তুলতে পারলে শিল্পোন্নয়নে পুঁজি সংগ্রহের পথ সহজ হবে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই। শুধুমাত্র নিয়ন্ত্রক সংস্থা কিংবা বিনিয়োগকারীদের ভূমিকা যথেষ্ট নয়; সরকারের সরাসরি সাপোর্ট ছাড়া বাজার ঘুরে দাঁড়াবে না। বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, ব্রোকারেজ হাউজ ও সরকার সব পরে সমন্বিত পদপে জরুরি। তারা সতর্ক করে বলেন, যদি এখনই বাজারে বাস্তব ও স্পষ্ট নীতি সহায়তা না আসে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশে শেয়ার বাজার ব্যবস্থা আরো বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। বিনিয়োগকারীরা সম্পূর্ণভাবে মুখ ফিরিয়ে নিলে অর্থনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ খাতটি অচল হয়ে পড়বে। ●
অকা/পুঁবা/ফর/সন্ধ্যা/২০ মে, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 10 months আগে

