অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
শেয়ার বাজারের বিনিয়োগকারীদের জন্য ডিভিডেন্ড প্রাপ্তি প্রক্রিয়াকে সহজ ও আধুনিক করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে শেয়ার বাজার স্থিতিশীলতা তহবিল (ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড বা সিএমএসএফ)-কে একটি কেন্দ্রীয় ডিভিডেন্ড বিতরণকারী সংস্থা বা ‘ডিভিডেন্ড হাব’-এ রূপান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য তহবিলটির আইনি ভিত্তি শক্তিশালী করা এবং কার্যপরিধি বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, ভবিষ্যতে তালিকাভুক্ত সব কোম্পানির ডিভিডেন্ড সরাসরি সিএমএসএফ-এর হিসাবে জমা হবে। এরপর বিনিয়োগকারীদের কাছে তা বিতরণ করা হবে। এই প্রক্রিয়ার সময় সিএমএসএফ বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ড থেকে প্রযোজ্য কর কেটে সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা দেবে। ফলে বিনিয়োগকারীদের আলাদাভাবে কর প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ করার ঝামেলা থাকবে না। বর্তমানে প্রতিটি কোম্পানি আলাদাভাবে কর প্রত্যয়ন দেয়, যা করদাতাদের জন্য জটিল প্রক্রিয়া।
বর্তমানে যাদের টিআইএন (কর শনাক্তকরণ নম্বর) আছে, তাদের ডিভিডেন্ড আয়ে ১৫ শতাংশ কর, আর যাদের নেই, তাদের ক্ষেত্রে কর ২০ শতাংশ কাটা হয়। কর ফাঁকি ঠেকাতে প্রত্যেক করদাতাকে আয়কর রিটার্নে কর প্রত্যয়নপত্র জমা দিতে হয়। অনেকে এই ঝামেলার কারণে প্রণোদনা থাকা সত্ত্বেও কর প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহে আগ্রহী হন না। নতুন ব্যবস্থায় বিনিয়োগকারীরা সম্মিলিত ডিভিডেন্ড আয়ের বিপরীতে একটি চালানের মাধ্যমে কর অব্যাহতির সুবিধা পাবেন।
সিএমএসএফ ২০২১ সালের জুনে গঠিত হয়েছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল শেয়ার বাজারের তারল্য সংকট মোকাবিলা করা এবং অবণ্টিত ডিভিডেন্ড বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিতরণ করা। এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা নগদ ডিভিডেন্ড এবং ৩০৫ কোটি টাকার শেয়ার ডিভিডেন্ড বিতরণ করেছে। তবে ফান্ডটির গঠন ও কার্যক্রম নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। প্রাথমিকভাবে তহবিল ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব নজিবুর রহমান। সমালোচকরা অভিযোগ করেছেন, সিএমএসএফ মূলত নজিবুর রহমানকে পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে গঠন করা হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আল-আমিন বলেন, “ফান্ডের টাকা দিয়ে মিটিংয়ের পর মিটিং করা, কিংবা সুদ দিয়ে খরচ করা—নীতিগতভাবে এসব সমর্থনযোগ্য নয়।”
অভিযোগ রয়েছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে শুধুমাত্র সম্মানী ও অনুষ্ঠান বাবদ খরচ হয়েছে ১ কোটি ১৯ লাখ টাকা, যেখানে ওই বছরের মোট পরিচালন ব্যয় ছিল ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। সম্প্রতি প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবণ্টিত ডিভিডেন্ড পাঠানোর জন্য সিএমএসএফ মধুমতি ব্যাংকে একটি বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব খোলার চেষ্টা করে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক তহবিলের আইনি ভিত্তি দুর্বল উল্লেখ করে হিসাব খোলার প্রক্রিয়া স্থগিত রাখে। এরপর অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে সিএমএসএফকে একটি ‘স্ট্যাটুটরি’ বা আইনসিদ্ধ তহবিলে রূপান্তরের প্রস্তাব ওঠে। জানা গেছে, অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এ প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছেন।
নতুন কাঠামোতে সিএমএসএফ বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ড বিতরণের কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্মে পরিণত হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের অর্থ দিয়ে বিনিয়োগ বা মিউচুয়াল ফান্ড স্পনসর করার সুযোগ থাকবে না। অতীতে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) মাধ্যমে সিএমএসএফ কিছু ইকুইটিতে বিনিয়োগ করেছিল এবং ‘আইসিবি এএমসিএল সিএমএসএফ গোল্ডেন জুবিলি মিউচুয়াল ফান্ড’-এর উদ্যোক্তা হিসেবেও ভূমিকা রেখেছিল, যা বাজারে সমালোচনার জন্ম দেয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিএমএসএফ যদি ডিভিডেন্ড হাব হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে, তবে বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রক্রিয়াটি অনেক সহজ হবে। তারা এককভাবে কর পরিশোধের ব্যবস্থা পাবেন, ডিভিডেন্ড অনলাইনে পাওয়া সহজ হবে এবং কর প্রত্যয়নপত্রের জটিলতা দূর হবে। এ পদক্ষেপ শেয়ার বাজারে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়াবে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ●
অকা/পুঁবা/ই/সকাল/২১ জুলাই, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 7 months আগে

