অর্থকাগজ প্রতিবেদন
দেশের পুঁজি বাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এখন থেকে তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানিতে অনিয়মের সন্দেহ হলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) পূর্বানুমতি ছাড়াই তাৎক্ষণিক পরিদর্শন চালাতে পারবে। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় ডিএসইর পক্ষ থেকে উত্থাপিত এমন প্রস্তাবে নীতিগতভাবে সম্মতি জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এর ফলে বাজারে কারসাজি ও আর্থিক অনিয়ম রোধে স্টক এক্সচেঞ্জের তদারকি সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিদ্যমান আইনি সীমাবদ্ধতা ও পরিবর্তনের আভাস
বর্তমানে ডিএসইর লিস্টিং রেগুলেশনের ৫৪(১) ধারা অনুযায়ী, কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে পরিদর্শনের প্রয়োজন হলে ডিএসইকে আগে কমিশনের অনুমতি নিতে হয়। এই দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অনেক সময় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না, যার সুযোগ নেয় অসাধু চক্র। সম্প্রতি ডিএসইর উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে কমিশনের এক বৈঠকে এই বাধ্যবাধকতা শিথিল করার বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করা হয়েছে। ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আমিন জানিয়েছেন, কমিশন নীতিগতভাবে এই বিধান বাতিলের পক্ষে মত দিয়েছে। এর ফলে ডিএসই নিজস্ব বিবেচনায় যেকোনো সময় সন্দেহভাজন কোম্পানিতে আকস্মিক পরিদর্শন চালাতে পারবে।
কার্যক্রম পরিচালনার নতুন কাঠামো ও প্রস্তুতি
নতুন এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার লক্ষ্যে ডিএসই ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শুরু করেছে। লিস্টিং রেগুলেশন সংশোধনের পর কীভাবে এই আকস্মিক পরিদর্শনগুলো পরিচালিত হবে, তার একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। যদিও পরিদর্শনের জন্য আগাম অনুমতির প্রয়োজন হবে না, তবে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে প্রতিটি পরিদর্শনের পর বিস্তারিত প্রতিবেদন কমিশনে জমা দেওয়া হবে। প্রাথমিকভাবে জরুরি প্রয়োজনগুলোতে কমিশন দ্রুত অনুমোদন দেবে এবং পরবর্তীতে আইন সংশোধনের মাধ্যমে ডিএসইকে পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করা হবে। এ বিষয়ে শীঘ্রই একটি আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা জারি হতে পারে।
ব্রোকারেজ হাউজ তদারকি ও ব্যাংক হিসাব যাচাইয়ের চ্যালেঞ্জ
ডিএসই বর্তমানে ব্রোকারেজ হাউজগুলোতে পূর্বানুমতি ছাড়াই পরিদর্শন করতে পারলেও গ্রাহকের ব্যাংক হিসাব যাচাই করতে না পারা একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ব্রোকার হাউজের বিরুদ্ধে গ্রাহকের অর্থ আত্মসাৎ এবং ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট জমা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই জালিয়াতি রোধে ব্রোকারদের অধীনে থাকা গ্রাহক হিসাবগুলোর ব্যাংক স্টেটমেন্ট সরাসরি যাচাই করার ক্ষমতা চেয়েছে ডিএসই। তবে এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতির প্রয়োজন রয়েছে। ডিএসই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিষয়টি নিয়ে তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাথে আলোচনা করবে যাতে একটি নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মাধ্যমে জালিয়াতি বন্ধ করা যায়।
বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা ও বাজারের স্থিতিশীলতা
বাজার সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ডিএসইর হাতে সরাসরি পরিদর্শনের ক্ষমতা থাকলে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো তাদের আর্থিক প্রতিবেদন এবং কার্যক্রমে আরও সজাগ থাকবে। এটি কেবল জালিয়াতি রোধ করবে না, বরং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাজারের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনবে। নিয়মিত তদারকি এবং তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ তৈরি হলে পুঁজি বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সহজ হবে। তদারকি ব্যবস্থার এই আধুনিকায়ন দীর্ঘমেয়াদে দেশের শেয়ার বাজারকে আরও স্থিতিশীল ও আন্তর্জাতিক মানের দিকে নিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সর্বশেষ হালনাগাদ 10 hours আগে

