অমিত কে বিশ্বাস ●
জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার পথে বাংলাদেশ এরই মধ্যে প্রবেশ করেছে উন্নয়নের মহাসড়কে। আর এই উন্নয়নের ধারায় যে শিল্প খাতটি বিগত বছরগুলোতে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখে চলেছে তৈরি পোশাক শিল্প।
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি উন্নয়নের গতি ধরে রাখতে ও সবচেয়ে বেশি নির্ভরযাগ্য শিল্প খাত হিসেবে সর্বজন স্বীকৃত আমাদের পোশাক শিল্প। এই পোশাক শিল্পই বদলে দিয়েছে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থানকে । যদিও রফতানিমুখী পোশাক শিল্প খাতের উন্নয়নে সরকার ও শিল্প সংশ্লিষ্ট সংগঠন, প্রতিষ্ঠান ও নীতি নির্ধারণী ফোরামের আরো বেশি আন্তরিক এবং সচেষ্ট হওয়া সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ দেশ হিসেবে কৃষিপ্রধান হলেও তৈরি পোশাক শিল্প নির্ভর রফতানি বাণিজ্যের দেশ হিসেবেও বিশ্ব দরবারে অভূতপূর্ব খ্যাতি অর্জন করেছে। রফতানি নির্ভর পোশাক শিল্পখাতের মাধ্যমে বেকার সমস্যা সমাধান, কর্মসংস্থান, নারী কর্মসংস্থান সর্বোপরী অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই শিল্পের অবদান দুর্দান্ত এবং উৎসাহজনক।
বিশ্ব বাজারে বেশ আগে থেকেই বাংলাদেশ পোশাক শিল্পের হাত ধরে ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। অতীতের যে কোনো সময়ের চাইতে নিঃসন্দেহে বর্তমান সরকারের আমলে এই শিল্প খাতের এগিয়ে যাওয়ার গতি অনেক বেশি। গুরুত্বপূর্ণ এই খাতে অভূতপূর্ব অগ্রগতি আর সাফল্যের নেপথ্যে সরকারের আন্তরিক অবদান প্রসারিত দাবি রাখে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প যাত্রা শুরু করে ষাটের দশকে। তবে সত্তরের দশকের শেষের দিকে উন্নয়ন ঘটতে থাকে। বাংলাদেশে পোশাক শিল্পের যাত্রা শুরু ষাট’র দশকে। মুক্তিযুদ্ধের অনেক আগেই গোড়াপত্তন হলেও সার্বভৌমত্ব লাভের পর থেকেই মূলত রফতানিমুখী খাত হিসেবে এই শিল্পের বিকাশ ঘটেছে। স্বাধীনতার চারদশকে পোশাক শিল্প খাতে বিস্ময়কর উত্থান ঘটেছে। বর্তমানে এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রফতানিমুখী শিল্প খাত। দেশে প্রথম পোশাক কারখানা ঢাকার উর্দু রোডের রিয়াজ গার্মেন্টস। শুরুতে রিয়াজ গার্মেন্টস’র উৎপাদিত পোশাক স্থানীয় বাজারেই শুধু বিক্রি হতো। রিয়াজ গার্মেন্টস ছিলো পথ প্রদর্শক, যেটি ঢাকায় রিয়াজ স্টোর নামে ছোট একটি দর্জিও কারখানা হিসেবে ১৯৬০ সালে কাজ শুরু করে। এরকম চারটি ছোট পুরাতন কারখানার নাম রিয়াজ গার্মেন্টস, প্যারিস গার্মেন্টস, জুয়েল গার্মেন্টস এবং বৈশাখী গার্মেন্টস। কিন্তু দেশ গার্মেন্টসকে প্রথম গার্মেন্টস বলা হয়। কেননা দেশ গার্মেন্টস প্রথম ১০০% রফতানিমুখী গার্মেন্টস। রিয়াজ গার্মেন্টস তখন দেশের চাহিদাও মেটাত, সেই সঙ্গে সীমিত পরিসরে বিদেশেও পোশাক রফতানি করত। স্বাধীনতার আগে যাত্রা শুরু হলেও বাংলাদেশে মূলত ৭০’র দশকে অর্থাৎ স্বাধীন বাংলাদেশে তৈরি শিল্প খাতের বিকাশ ঘটে। তৈরি পোশাক রফতানির যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৬-৭৭ অর্থ বছরে। মাত্র ৭ হাজার মার্কিন ডলার রফতানি হয়েছিলো সেই বছর।
সাহসী উদ্যোক্তা এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে পরবর্তী দেড় দশকে খাতটির তেমন অগ্রগতি হয়নি। গার্মেন্টস প্রস্তুতকারক ও গার্মেন্টস রফতানিকারক দেশ হিসেবে প্রকৃতপক্ষে ১৯৮১-৮২ সালে ০.১ বিলিয়ন ডলার তৈরি পোশাক রফতানি করে বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশের পথচলা শুরু হয়।
পরে ১০ বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি পরিমাণ ১,৪৪৫ মিলিয়ন ইউএস ডলারে উন্নীত হয়। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। দিন দিন বেড়েছে পোশাক রফতানি পরিমাণ। ১৯৮৯-৯০ অর্থবছরে আয় হয়েছিলো মাত্র ৬২ কোটি ডলার। প্রথমে একদল নবীন উদ্যোক্তা এই খাতে বিনিয়োগ শুরু করে। ফলে পরে ৫ বছরে রফতানি আয় বেড়ে যায় কয়েকগুন। ১৯৯৪-৯৫ অর্থ বছরে তৈরি পোশাক রফতানি আয় ২২৩ কোটি ডলারে পৌঁছে।
নব্বই’র দশকে পোশাক শিল্প খাতে শ্রমিক হিসেবে নারীদের অন্তর্ভূক্তিতে বেশ গতিশীল হয়ে ওঠে গার্মেন্টস শিল্প। নারী পোশাক শ্রমিকের কর্মমুখরতায় নব্বই’র দশকে এই শিল্প খাতের সম্প্রসারণ ঘটেছে বার্ষিক প্রায় ২২ শতাংশ হারে। তৈরি পোশাক শিল্প খাত শুধুমাত্র যে জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে, তা নয়। বরং, একই সঙ্গে শিল্পটি যেন টেকসই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিকাশ লাভ করে, সে ব্যাপারেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ, বিকেএমইএ), পোশাক শিল্পের মুখপাত্র সংগঠন, পোশাক খাতে উৎপাদনের পরিবেশগত প্রভাব কমাতে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
বাংলাদেশকে বিশ্বের সর্বোচ্চ সংখ্যক সবুজ কারখানার আবাসস্থল হিসেবে গড়ে তুলতে সবুজ শিল্পায়নে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য বিজিএমইএ ‘২০২১ ইউএসজিবিসি লিডারশীড এ্যাওয়ার্ড’ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছে। বিজিএমইএ জাতিসংঘের জলবায়ুু পরিবর্তন বিষয়ক উদ্যোগ, ‘ফ্যাশন ইন্ডাষ্ট্রি চার্টার ফর ক্লাইমেট একশন’ এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এতে ২০৩০ সালের মধ্যে জিএইচজি (গ্রীন হাউজ গ্যাস) নিঃসরণ ৩০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য রয়েছে।
বিগত বছর করোনাভাইরাস মহামারী শুরু হলে, জননেত্রী শেখ হাসিনা এই পোশাক শিল্পের জন্য সরকারি প্রণোদনা ঘোষণা করেন। সময়োপযোগী এই প্রণোদনা প্রাপ্তির মাধ্যমে গার্মেন্টস মালিকেরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে তাদের গার্মেন্টস খোলা রাখে। যার ধারাবাহিকতায় বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি কার্যক্রম চলমান থাকে এবং বিশ্ব বাজারে ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্ডার বাতিল হয়ে গেলেও, পরে সেই অর্ডারগুলো ধীরে ধীরে আবার দেশে ফেরত আসতে থাকে। বর্তমানে উৎপাদনমুখী পোশাক কারখানাগুলো আশাবাঞ্জকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিসটিকস রিভিউ ২০২১ প্রতিবেদন, ২০২০ সালে বাংলাদেশ ২ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের পোশাক রফতানি করেছে। সেই সঙ্গে ২০২০ সালে বিশ্বে যত পোশাক রফতানি হয়, তার মধ্যে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ ছিল বাংলাদেশি পোশাক। বিজিএমইএ’র তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় সাড়ে চার হাজার কারখানায় কাজ করে। নিত্য নতুন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দুরন্ত গতিতে এগিয়ে যাওয়া পোশাক খাতে সংশ্লিষ্টরা উজ্জল ভবিষ্যৎ দেখছেন। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের এ উজ্জ্বল ভবিষ্যতকে কাজে লাগিয়ে প্রত্যাশিত স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার পথে দৃপ্তপ্রায়ে এগোবে বাংলাদেশ। ●
লেখক প্রকাশক ও সম্পাদক, দ্যা অ্যাপারেল নিউজ
সর্বশেষ হালনাগাদ 4 years আগে
