অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
চরম দুঃস্বপ্ন থেকে নতুন করে প্রত্যাশার স্বপ্ন দেখছে দেশের পুঁজি বাজারের লাখ লাখ বিনিয়োগকারী। দেশের রাজনৈতিক ও ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর যে স্বপ্ন দেখেছিল, মাস না পেরোতেই তা মাটিয়ে মিশে যায় অব্যাহত পতনের স্রোতে। পুঁজি বাজারের সূচক চার বছর পিছিয়ে যায়। চরম হতাশায় পড়ে বিনিয়োগকারীরা। তবে ২৯ অক্টোবরের বাজার যখন সেঞ্চুরির বেশি পয়েন্ট নিয়ে বেশির ভাগ কোম্পানি দর বৃদ্ধিতে ফিরে আসে তখন একটা স্বস্তির আলো দেখে বিনিয়োগকারীরা। ৩০ অক্টোবরে ১৪৭ পয়েন্টসহ ডিএসইতে পৌনে তিন শ’ পয়েন্ট ফিরেছে প্রধান সূচকে। ৩০ অক্টোবর ডিএসইতে ৯৩.৯৫ শতাংশ কোম্পানি দর বৃদ্ধিতে ছিল। আর ইতিবাচক পথে থাকায় বিক্রির চাপ ছিল ৯৭ শতাংশ। দীর্ঘদিন পর পাঁচ শ’ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে। বাজার মূলধন ডিএসইতে বেড়েছে ১.৮৫ শতাংশ বা ১২ হাজার ২৬ কোটি টাকা।
কয়েক মাসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৩০ অক্টোবর ছিল শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পুঁজি বাজারে চতুর্থ বড় উত্থান। এর আগে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরের দিন ৬ আগস্ট ডিএসইর সূচক বেড়েছিল ১৯২ পয়েন্ট। এরপর ৭ আগস্ট বেড়েছে ১৯৭ পয়েন্ট এবং ৮ আগস্ট বেড়েছে ৩০৬ পয়েন্ট এবং ১১ আগস্ট বেড়েছে ৯১ পয়েন্ট। ওই চার দিনে সূচকের উত্থান হয়েছে ৭৮৬ পয়েন্ট। এরপর ১২ আগস্ট থেকেই শুরু হয় ধারাবাহিক পতন। ১২ আগস্ট থেকে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত আড়াই মাসে সূচকের পতন হয়েছে ১ হাজার ১৪৭ পয়েন্ট। অর্থাৎ শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগের দিন ডিএসইর সূচক ছিল ৫ হাজার ২২৯ পয়েন্ট। ২৮ অক্টোবর সেটি আরো ৩৩১ পয়েন্ট কমে ৪ হাজার ৪৯৮ পয়েন্টে নেমে যায়।
দিনের লেনদেনের তথ্য থেকে বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, শুরু থেকেই পুঁজি বাজার ঊর্ধ্বমুখী পথেই অগ্রসর হচ্ছিল; যা শেষ পর্যন্ত অব্যাহত থাককে। ডিএসইর লেনদেন শুরুর দেড় ঘণ্টায় অর্থাৎ বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ডিএসইর প্রধান সূচক বা ‘ডিএসইএক্স’ ১০২.৭০ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ১২০.০৩ পয়েন্টে চলে আসে। আর শরিয়াহ সূচক বা ‘ডিএসইএস’ ১৮.১১ পয়েন্ট বেড়ে এক হাজার ১৩১ পয়েন্টে এবং ‘ডিএস-৩০’ সূচক ৪১.৭৭ পয়েন্ট বেড়ে এক হাজার ৯০০ পয়েন্টে উঠে আসে। ওই সময়ে ডিএসইতে মোট ১৯২ কোটি ৯২ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে।
দিন শেষে ডিএসইর সূচক ‘ডিএসইএক্স’ ১৪৭.৫১ পয়েন্ট বেড়ে বর্তমানে সূচকটি অবস্থান করছে ৫ হাজার ১৬৪.৮৩ পয়েন্টে। ‘ডিএসইএস’ ২২.৫৫ পয়েন্ট বেড়ে এক হাজার ১৩৬.২১ পয়েন্টে এবং ‘ডিএসই-৩০’ সূচক ৫৭.৫৮ পয়েন্ট বেড়ে এক হাজার ৯১৫.৮০ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। ডিএসইতে ২১ কোটি ৫৫ লাখ ৮৩ হাজার ৯৬৪টি শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড হাতবদল হয়েছে মোট ৫১৯ কোটি ৩১ লাখ ২৬ হাজার ৯৯০ টাকা বাজার মূল্যে। যেখানে ২৯ অক্টোবর লেনদেন হয়েছে ৩৪৬ কোটি ৫৮ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। ফলে লেনদেন বেড়েছে ১৭২ কোটি টাকা বেড়েছে। ডিএসইতে মোট ৩৯৭টি কোম্পানি শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। লেনদেনে অংশ নেয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে দর বেড়েছে ৩৭৩টির বা ৯৩.৯৫ শতাংশের, বিপরীতে ১৫টির দর কমেছে। পাশাপাশি ৯টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। আর মিউচুয়াল ফান্ড ৩৭টি লেনদেনে অংশ নেয়। ৩৭টিরই দর বেড়েছে। বাজার মূলধন ১.৮৫ শতাংশ বা ১২ হাজার ২৫ কোটি ৯১ লাখ টাকা বেড়ে এখন ছয় লাখ ৬৩ হাজার ৭২২ কোটি ৬৩ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে।
দর বৃদ্ধিতে শীর্ষ ১০ কোম্পানি : ডিএসইতে ৩০ অক্টোবর সর্বোচ্চ দর বেড়েছে সেন্ট্রাল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের বলে ডিএসইর প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা গেছে। কোম্পানিটির শেয়ার দর ২৯ অক্টোবর থেকে ৩ টাকা ৮০ পয়সা বা ১০ শতাংশ বেড়েছে। যার ফলে ডিএসইর দর বৃদ্ধির শীর্ষ তালিকায় প্রথম স্থান নিয়েছে কোম্পানিটির শেয়ার। দর বৃদ্ধির শীর্ষ তালিকায় থাকা সিএন্ডএ টেক্সটাইলের শেয়ার দর বেড়েছে ৪০ পয়সা বা ১০ শতাংশ। আর ৪ টাকা ১০ পয়সা বা ১০ শতাংশ শেয়ার দর বৃদ্ধি পাওয়ায় তালিকা রয়েছে ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড। এ ছাড়া ডিএসইতে দর বৃদ্ধির শীর্ষ তালিকায় উঠে আসা অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে ফু-ওয়াং ফুডের ১০ শতাংশ, জনতা ইন্স্যুরেন্সের ১০ শতাংশ, মুন্নু ফেব্রিক্সের ১০ শতাংশ, নাভানা ফার্মার ১০ শতাংশ, কুইন সাউথ টেক্সটাইলের ১০ শতাংশ, সোনারবাংলা ইন্স্যুরেন্সের ১০ শতাংশ এবং ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের ১০ শতাংশ দর বেড়েছে।
দরপতনের শীর্ষ ১০ কোম্পানি : ৩০ অক্টোবর ডিএসইতে সবচেয়ে বেশি দর কমেছে মিডল্যান্ড ব্যাংক পিএলসির। ব্যাংকটির শেয়ার দর ২৯ অক্টোবর থেকে ২ টাকা ৪০ পয়সা বা ৭.৯২ শতাংশ কমেছে। যার ফলে ডিএসইর দর পতনের শীর্ষ তালিকায় প্রথম স্থানে স্থান নিয়েছে ব্যাংকটির শেয়ার। আর বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রায়াল ফাইন্যান্সের শেয়ার দর কমেছে আগের দিনের থেকে ৭০ পয়সা বা ৬.০৩ শতাংশ। ৬ টাকা ৭০ পয়সা বা ১২.৯৩ শতাংশ দর কমে যাওয়ায় পতনের শীর্ষ তালিকায় রয়েছে নিউলাইন কোথিংস লিমিটেড। এ ছাড়া ডিএসইতে দর পতনের শীর্ষ তালিকায় থাকা অন্যান্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ২.১৮ শতাংশ, অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের ১.৬৬ শতাংশ, ডেসকোর ১.৪৩ শতাংশ, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ১.৪২ শতাংশ, খান ব্রাদার্সের ১.২৫ শতাংশ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ১.১৭ শতাংশ এবং ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির শেয়ার দর ১.১৬ শতাংশ কমেছে।
ব্লক মার্কেটে ৫ কোম্পানির ১৫.৩৪ কোটি টাকার ট্রেড : ডিএসইর ব্লক মার্কেটে ৩০ অক্টোবর ২৮টি কোম্পানির ৭৩ লাখ ৭১ হাজার ২৬৪টি শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড মোট ২০ কোটি ১৪ লাখ ৪২ হাজার টাকায় হাতবদল হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ কোম্পানির সবচেয়ে বেশি লেনদেন হতে দেখা গেছে। কোম্পানিগুলো হলোÑ লাভেলো আইসক্রিম, ওরিয়ন ইনফিউশন, বেক্সিমকো, ব্যাংক এশিয়া ও সাইহাম কটন মিলস লিমিটেড। এই পাঁচ প্রতিষ্ঠানের মোট শেয়ার লেনদেন হয়েছে ১৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকারও বেশি। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে লাভেলো আইসক্রিমের। কোম্পানিটির চার কোটি ৯৫ হাজার টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। ওরিয়ন ইনফিউশিনের দুই কোটি ৮৯ লাখ ৬৯ হাজার টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। আর দুই কোটি ৭২ লাখ ৭১ হাজার টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে বেক্সিমকোর। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ব্যাংক এশিয়ার এক কোটি ৮৬ লাখ টাকার এবং সাইহাম কটন মিলস লিমিটেডের এক কোটি ৮৫ লাখ ৬০ হাজার টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে।
চট্টগ্রাম স্টকে ৮০.৬৪ শতাংশের দর বৃদ্ধি : দেশের অন্যতম পুঁজি বাজার চট্টগ্রাম স্টকে দু’টি সূচক গড়ে তিন সেঞ্চুরির পয়েন্ট হাঁকিয়ে সূচক বেড়েছে। আরেকটি প্রায় দুই সেঞ্চুরিকে স্পর্শ করেছে। ৮০.৬৪ শতাংশ কোম্পানি দর বৃদ্ধিতে ছিল। সিএএসপিআই ৩৩০.২৭ পয়েন্ট, সিএসই-৩০ সূচক ৩৩১.৯১ পয়েন্ট, সিএসসিএক্স ১৯২.৮২ পয়েন্ট এবং সিএসই-৫০ সূচক ২২.৪৪ পয়েন্ট বেড়েছে। ২১৭টি কোম্পানি লেনদেনে অংশ নেয়। দর বেড়েছে ১৭৫টির, কমেছে ২৯টির এবং দর অপরিবর্তিত ১৩টি কোম্পানির। ২৫ লাখ ৭৯ হাজার ১১৬টি শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড হাতবদল হয়েছে মোট ছয় কোটি ৯০ লাখ ৩৩ হাজার ২২৭ টাকা বাজারমূল্যে। তবে এই লেনদেন মঙ্গলবারের থেকে এক কোটি টাকার বেশি কম। ওই দিন ১০ কোটি আট লাখ টাকার লেনদেন হয়। ●
অকা/পুঁবা/ফর/রাত/৩০ অক্টোবর, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 1 year আগে

