অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
লুকানো খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র এখন দ্রুত সামনে এসে পড়ছে, কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক পূর্বের মতো ঋণ নিয়মিত দেখানোর সুযোগ আর দিচ্ছে না। বহু বছর ধরে বিভিন্ন নীতিগত ছাড়, রাজনৈতিক প্রভাব এবং বড় গ্রাহকদের বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে ব্যাংকগুলো খারাপ ঋণকে আড়াল করতে পেরেছিল। এখন সেই আড়াল ভেঙে পড়ায় আসল ঝুঁকিগুলো পরিষ্কারভাবে ধরা পড়ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিদেশি অডিট ফার্ম দিয়ে কয়েকটি ব্যাংকের ঋণ পোর্টফোলিও পুনঃমূল্যায়ন করাচ্ছে, যার ফলে আরও গোপন অনাদায়ী ঋণ উন্মোচিত হচ্ছে এবং খেলাপির প্রকৃত অঙ্ক দ্রুত বাড়ছে।
সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৫.৭৩ শতাংশ। তিন মাস আগেও এই পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৮ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা, অর্থাৎ মাত্র একটি ত্রৈমাসিকের মধ্যেই খেলাপি বেড়েছে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা। বিশ্লেষকদের মতে, বহু বছর রাজনৈতিক ও নীতিগত আশ্রয়ে খারাপ ঋণকে লুকিয়ে রাখার সুযোগ ছিল; বড় ঋণগ্রহীতারা নতুন ঋণ নিয়ে পুরনো ঋণের দায় সমন্বয় করতেন, আবার ঋণসীমা বাড়ানোর সুবিধা নিয়ে কাগজে-কলমে নিয়মিত থাকার ভান তৈরি করা হতো। গত বছরের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর এসব সুবিধা বন্ধ হয়ে যায়। একই সাথে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে দ্রুত মেয়াদোত্তীর্ণ হিসেবে শ্রেণীকরণ করার নিয়ম চালু হওয়ায় ব্যাংকগুলোর ব্যালান্স শিটে লুকানো ঝুঁকি একে একে প্রকাশ্যে আসছে।
অন্যদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যবসায়িক মন্দা ও বড় উদ্যোক্তাদের অনেকে গ্রেপ্তার বা পলাতক থাকায় বিভিন্ন খাতের ব্যবসা–বাণিজ্য স্থবির। ফলে ব্যাংকগুলোর প্রত্যাশিত ঋণ আদায় ব্যাহত হচ্ছে। সব মিলিয়ে ব্যাংকিং খাত এখন এক সংকুচিত পর্যায়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে খারাপ ঋণ আদায়ের বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা কমে গেছে কিন্তু পুনঃশ্রেণীকরণে আসল ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, কঠোরতার পাশাপাশি প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যাতে অযথা ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। খেলাপি ঋণ নিয়মিত করতে মাত্র ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্টের সুযোগ রাখা হয়েছে, যা ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। একই সাথে অবলোপনের শর্ত শিথিল করে খেলাপি হওয়ার পরই ঋণকে আর্থিক বিবরণী থেকে পৃথক করার নিয়ম সহজ করা হয়েছে, যদিও অবলোপনের আগে ব্যাংকগুলোকে শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক। ভুয়া বা অন্য নামে নেওয়া ঋণের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় নেই, ফলে এই ক্যাটাগরিগুলো নিয়মিত করার হার খুবই কম।
খেলাপি বৃদ্ধির গতিবেগ বোঝার জন্য সময়রেখায় তাকানো প্রয়োজন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে সেই অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকার ওপরে—অর্থাৎ বৃদ্ধি হয়েছে ৩ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকা, যা প্রায় দ্বিগুণ। মাত্র ৯ মাসে বৃদ্ধি ২ লাখ ৯৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। দীর্ঘমেয়াদে তুলনা করলে চিত্র আরও স্পষ্ট—২০০৯ সালে খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা, সেখান থেকে বহু গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে মূলত নীতিগত শিথিলতা ও অনিয়ন্ত্রিত পুনঃতফসিলের কারণে।
ব্যাংক খাতের প্রকৃত ঝুঁকি বোঝার জন্য ‘দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ’ হিসাব আরও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে খেলাপি ছাড়াও পুনঃতফসিল করা অনাদায়ী ঋণ এবং অবলোপনকৃত ঋণ যোগ হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল শেষে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৫৭ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৪৪.২৬ শতাংশ। মাত্র এক বছরে এই অঙ্ক বেড়েছে ২ লাখ ৫৯ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা বা ৫২ শতাংশ। এর মধ্যে পুনঃতফসিল করা ঋণ ৩ লাখ ৪৮ হাজার কোটি, নিয়মিত খেলাপি ৩ লাখ ৪৬ হাজার কোটি এবং অবলোপনকৃত ঋণের স্থিতি ৬২ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা। অতীতে যেসব ঋণ নানাভাবে নিয়মিত দেখানো হতো, এখন সেগুলো একের পর এক খেলাপিতে পরিণত হওয়ায় খারাপ ঋণের বিস্ফোরণ স্পষ্ট হচ্ছে।
ড. আহসান এইচ মনসুর গভর্নর হওয়ার পর ব্যাংকিং খাতের নৈতিক ঝুঁকি কমানো এবং স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। প্রভিশন ঘাটতি রেখে ব্যাংকগুলোকে লভ্যাংশ দিতে না দেওয়ার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত তারই অংশ। আগামী বছর থেকে কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের বেশি হলে, মুনাফা যতই হোক লভ্যাংশ দেওয়া যাবে না—এ নীতি খাতকে আরও শৃঙ্খলিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, বহু বছর ধরে চাপা থাকা অনাদায়ী ঋণ এখন সামনে এসে পড়ায় ব্যাংক খাতের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার কঠোর বাস্তবতা পরিষ্কার হচ্ছে। স্বল্পমেয়াদে এটি ব্যাংকগুলোকে চাপে ফেললেও দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক খাতকে সুস্থ ও স্বচ্ছ ভিত্তিতে দাঁড় করানোর পথে এটি প্রয়োজনীয় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ●
অকা/ব্যাংখা/ই/সকাল/২৭ নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 3 days আগে

