অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব এবার সরাসরি বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজে পড়তে পারে—এমনই সতর্কবার্তা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরে দেশে নতুন করে প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে থেকে যেতে পারেন, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগজনক।
৮ এপ্রিল প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়, বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাবে দেশের নিম্নআয়ের মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, দিনে তিন ডলারের কম আয়কারী ব্যক্তিদের দরিদ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মূল্যস্ফীতির চাপে এই শ্রেণির মানুষের বাস্তব ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, ফলে তারা দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করতে পারছেন না।
প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা জানান, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁর মতে, যুদ্ধ না হলে চলতি বছরে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে পারতেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সংখ্যা কমে প্রায় ৫ লাখে নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ প্রায় ১২ লাখ মানুষ প্রত্যাশিত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হবেন।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে দারিদ্র্যের হার ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বমুখী। ২০২২ সালে যেখানে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮.৭ শতাংশ, তা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১.৪ শতাংশে। শুধু ২০২৫ সালেই নতুন করে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ দরিদ্র শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে দারিদ্র্য হ্রাসের গতি আরও মন্থর হয়ে পড়তে পারে।
এছাড়া, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধিও কমে প্রায় ৩.৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় বেশ কম এবং অর্থনীতির ওপর চাপের ইঙ্গিত বহন করে।
দারিদ্র্য বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—উচ্চ মূল্যস্ফীতি, শ্রমবাজারে কম মজুরি, এবং কর্মসংস্থানের ধীরগতি। একই সঙ্গে আয় বৈষম্যও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দারিদ্র্য হ্রাসের হার কমে গিয়ে বছরে মাত্র ০.৭ শতাংশে নেমে আসতে পারে, যেখানে সাধারণত এটি ১ শতাংশের বেশি থাকে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান অঞ্চলের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যঁ পেম বলেন, দেশের রাজস্ব আদায় কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে না পৌঁছানো এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতির পরিবর্তন অর্থনীতিকে চাপে ফেলছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি এবং বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা রপ্তানিতে প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁর মতে, টেকসই উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করা জরুরি।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, পূর্বে শুরু হওয়া অর্থনৈতিক সংস্কারগুলো অব্যাহত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যদিও তা বাস্তবায়ন করা সহজ নয়। বর্তমান বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় দ্রুত এবং কার্যকর স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশের অন্তত ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রভাব ফেলতে পারে। প্রথমত, আমদানি-রপ্তানি, প্রবাসী আয় এবং মুদ্রার বিনিময় হার প্রভাবিত হয়ে চলতি হিসাবের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। দ্বিতীয়ত, ভোগব্যয় ও বিনিয়োগ কমে গিয়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তৃতীয়ত, জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার ফলে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যেতে পারে। চতুর্থত, নতুন করে বিপুলসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারেন। পঞ্চমত, ভর্তুকি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারের আর্থিক চাপ বাড়তে পারে। এবং ষষ্ঠত, আয় বৈষম্য বৃদ্ধি পেতে পারে—যা সামাজিক ভারসাম্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক সংঘাতের প্রভাব শুধু আন্তর্জাতিক অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে সঠিক নীতি গ্রহণ, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং ঝুঁকি মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়াই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ●
অকা/প্র/ই/দুপুর/৯ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 12 hours আগে

