অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
শিগগিরই শেয়ারবাজারে সুদিন আসবে, এরকম অসংখ্য প্রতিশ্রুতি শুনেছেন বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু সেই ‘শিগগির’ আর আসে না। শেষ হয়ে যায় বছরের পর বছর। শেষ হয় না অপেক্ষার পালা। ঘটনা এখানে থামলে তেমন সমস্যা ছিল না। দিনদিন উধাও হয়ে যাচ্ছে পুঁজি। পথে বসে যাচ্ছেন লাখো বিনিয়োগকারী। দেখার কেউ নেই। কে শুনবে কথা, কার কাছে বিচার দেবে। একমাত্র উপরওয়ালা ছাড়া বলার মতো কেউ নেই।
এভাবেই শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীরা অসহায়। তবে উপরের এই চিত্রের কোনো কিছুই প্রভাবশালীদের সঙ্গে মেলানো যাবে না। নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে একাকার হয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে তারা হাতিয়ে নিচ্ছেন পুঁজি। বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের এই গল্প বহুদিনের পুরোনো। বাজারে দুর্যোগের জন্য আসছে একের পর এক ইস্যু। করোনা, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, মার্কিন ভিসানীতি, জাতীয় নির্বাচন এবং সর্বশেষ ফিলিস্তিনের ওপর ইসরাইলি আগ্রাসন অন্যতম। এসব অজুহাতে ফ্লোর প্রাইস (নিম্ন সীমা) দিয়ে বাজার আটকে রাখছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। আগামী নির্বাচনের আগে ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাজারের ওপর মানুষের আস্থা নেই। বিনিয়োগকারীদের আগামী নির্বাচন পর্যন্ত ধৈর্য ধারণের পরামর্শ দিয়েছে বিএসইসি।
জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, শেয়ারবাজারে দীর্ঘদিন থেকে বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট চলছে। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক বিভিন্ন সংকট, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং নির্বাচন ও জাতীয় রাজনীতিসহ সবকিছু যোগ হয়েছে। ফলে সবার আগে আস্থা সংকট দূর করতে পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীদের এই নিশ্চয়তা দিতে হবে, কারসাজির মাধ্যমে কেউ তার টাকা হাতিয়ে নিলে বিচার হবে। পাশাপাশি ভালো শেয়ারের সরবরাহ বাড়াতে হবে। এই দুই পদক্ষেপের মাধ্যমে বাজারের সমস্যা দূর করা সম্ভব। তবে একেবারে তা সহজ নয়।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, মোটা দাগে বাজারে দুটি সংকট। চাহিদার দিক থেকে সংকট হলো এই বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট। সরবরাহের দিক থেকে সংকট হলো ভালো কোম্পানির সংখ্যা কম। ফলে কারসাজি ও সিন্ডিকেটের জয়জয়কার অবস্থা। সবকিছু মিলে বর্তমানে দুর্বল অস্তিত্বে টিকে আছে শেয়ারবাজার। আর ক্রমেই অবস্থা আরও দুর্বল হচ্ছে। এখান থেকে উত্তরণ একেবারেই কঠিন। তাদের মতে, শেয়ারবাজার পরিস্থিতি ভয়াবহ। কিন্তু জাতীয় নির্বাচন, জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুর কারণে শেয়ারবাজার পরিস্থিতি সামনে আসছে না। সরকারের কাছেও বাজারের গুরুত্ব হারিয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে যাদের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই, তাদের কাছে শেয়ারবাজার বিরক্তির বিষয়। তাদের ভাবনা এ রকম-শেয়ারবাজার না থাকলে দেশের কোনো সমস্যা হবে না। এসব কারণেই ফ্লোর প্রাইস দিয়ে আগামী জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত বাজার আটকে রাখতে চাইছে সরকার। নির্বাচনের পর বাজার নিয়ে চিন্তা করবে। আর এই সুযোগে নিয়ন্ত্রণ সংস্থার আর্শীবাদপুষ্ট কয়েকটি সিন্ডিকেট বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।
জানতে চাইলে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন শেয়ারবাজারে উত্থান-পতন থাকবে। এটাই বাজারের স্বাভাবিক নিয়ম। তবে বাংলাদেশের বাজার অনেক দিন পর্যন্ত স্থবির। সমস্যা কাটাতে কাজ করছে কমিশন। বিনিয়োগকারীদের ধৈর্যধারণ করতে হবে। এছাড়াও দৈনন্দিন লেনদেনের চিন্তা না করে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করতে হবে। তিনি বলেন, আশা করছি আগামী নির্বাচনের পর বাজারে তারল্য প্রবাহ বাড়বে। এতে বাজার ইতিবাচক হবে।
জানা গেছে, বর্তমানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মূল্যসূচক ৬ হাজার ২শ পয়েন্টে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বিভিন্ন সংস্থা থেকে সরকারের উচ্চ মহলকে জানানো হয়েছে, ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়া হলে সূচক ৪ হাজার পয়েন্টে নেমে আসবে। এতে বিনিয়োগকারীরা পথে বসে যাবে। অনেকের আত্মহত্যার আশঙ্কাও রয়েছে। কারণ এর আগে শেয়ারবাজারে পতনের ঘটনায় আত্মহত্যার নজির রয়েছে। এ ধরনের ঘটনা ঘটলে বিরোধী দলগুলো আন্দোলনের নতুন ইস্যু পাবে। ফলে ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়া ঠিক হবে না। এসব কারণে আগামী নির্বাচনের আগে বাজারের ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
তবে বাজার ব্যবস্থাপকদের বড় অংশই ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়ার পক্ষে। তারা কৃত্রিম সাপোর্টের পরিবর্তে বাজারকে স্বাভাবিকভাবে চলতে দিতে চান। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১০ সালের সঙ্গে বর্তমান বাজারের বেশ কয়েকটি জায়গায় মিল রয়েছে। সে সময় বাজারে মার্জিন ঋণ ছিল সীমাহীন। ভালো কোম্পানির সংখ্যা ছিল কম। কোম্পানির মৌলভিত্তি নয়, বিনিয়োগ ছিল গুজবনির্ভর। সূচকের অস্বাভাবিক উঠানামা। দুর্বল কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছিল। অর্থনীতির অন্যান্য সূচকের সঙ্গে পুঁজিবাজারের উত্থানের মিল ছিল না। বর্তমানে এর সবই বাজারে রয়েছে। উলটো করোনা, বিশ্ব পরিস্থিতি এবং অর্থনৈতিক নেতিবাচক অবস্থায় বর্তমানে বেশ কিছু কোম্পানির আর্থিক অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত আশঙ্কার। এদিকে মন্দা শেয়ারবাজারে আবারও গলার কাঁটা হতে যাচ্ছে মার্জিন ঋণ। ফ্লোর প্রাইসের কারণে বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করতে পারছেন না। কিন্তু ঋণের সুদ বাড়ছে। ফলে যেসব বিনিয়োগকারী ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করছেন, তারা সবচেয়ে বিপদে। সমস্যায় রয়েছে ঋণ দেওয়া মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজগুলোও। অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠান ও ব্যক্তি উভয় পক্ষকেই নিঃস্ব করছে মার্জিন ঋণ। দিনদিন পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে বাজারের জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। সবচেয়ে হাস্যকর বিষয় হলো ফ্লোরপ্রাইস দেওয়া হয়েছে বিনিয়োগকারী নামধারী একটি ভুইঁফোঁড় সংগঠনের কথায়। তবে ফ্লোর প্রাইসে বাজার আটকে থাকলেও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন এমন প্রভাবশালীরা ব্লক মার্কেটে শেয়ার বিক্রি করে বের হয়ে যাচ্ছেন। অর্থাৎ প্রভাবশালীদের জন্য সব দরজা খোলা।
অকা/পুঁবা/ সকাল/২২ অক্টোবর, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 2 years আগে

