গোলাম মোস্তফা ●
সিন্ডিকেট শব্দটি এই মুহূর্তে আমাদের কর্ণকুহরে বহু প্রবেশ করা একটি শব্দ। বাজারে জিনিসপত্রের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেলেই এটা সিন্ডিকেটের কারসাজি বলে সব মহল প্রচার করে থাকে। সরকারের কর্ণধারদের এটা বিরোধী দলের লোকজনের কারসাজি বলে তাদের দায় এড়ানোর অজুহাত খোঁজার অপচেষ্টায় লিপ্ত হতে দেখা যায়। বিরোধী দলও সরকারি দলের লোকজনের সিন্ডিকেট বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে জনগণের পকেট কাটছে বলে প্রচার করতে কসুর করে না। তারা একে অপরের পিঠ চুলকানোর কাজটা বেশ সুচারুভাবেই সম্পন্ন করে থাকে!
আসলে সরকার এবং বিরোধী দলের দায় এড়ানো এবং অপরের ঘাড়ে দোষ চাপানোর এ নিষ্ঠুর খেলায় দেশের সাধারণ জনগণ ধোঁয়াশায় পড়ে হাবুডুবু খায়। তারা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভোগে। বাজার কারসাজির নাটের গুরু কে বা কারা– তারা খুঁজে পায় না। রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে এ রকম ধোঁয়াশা সৃষ্টি করে রাখাই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের রক্তচোষাদের এখন মূল কাজ। এই ধোঁয়াশার কারণেই ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে দেশে বিদেশে গাড়ি বাড়ি করতে তাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না। ধোঁয়াশা সৃষ্টি করে রাখাই যদি এই রক্তচোষাদের মূল কাজ না হবে— তবে আজ পর্যন্ত রাষ্ট্রের কর্ণধাররা কোনো সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছে? তাদের কোনো বিচারের সম্মুখীন করতে পেরেছে? স্বাধীনতার ৫০ বছরেও এসব সিন্ডিকেটের কেশাগ্র তারা স্পর্শ করতে পারেনি। বর্তমান রাষ্ট্র কাঠামোয় আর কোনোদিন তাদের কিছু করতে পারবে বলে কেউ বিশ্বাস করে না। এ কারণেই সরকার এবং বিরোধী দল জনগণের মাঝে ধোঁয়াশার প্রাচীল তুলে রেখেছে জনগণ যাতে সঠিক পথ খুঁজে না পায়।
অবাধ লুটপাটের সুবিধার্থেই আমাদের বাজার ব্যবস্থা একটা নিয়মশৃঙ্খলার ওপর আজও দাঁড়ায়নি বা দাঁড়াতে দেওয়া হয়নি। যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ ছাড়াই আমাদের দেশে হুটহাট করে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। সরকারের হাজারো কসরত করা সত্ত্বেও কিছুতেই সে দাম আর কমে না। প্রতি কেজি আলু পেঁয়াজের দাম সাধারণের ক্রয়ক্ষমতা ছাড়িয়ে গেলেও ফাঁসির আসামিকে উকিলের অভয় দানের মতো আমাদের সরকার আলু পেঁয়াজের চড়া দামে আতঙ্কিত না হওয়ার জন্য জনগণকে একের পর এক আশ্বাসবাণী শুনিয়ে থাকেন। তাতে কাজের কাজ কিছুই হয় না। ব্যবসায়ী নামধারী এই লুটপাটকারীরা জনগণের পকেট ঠিকই ফাঁকা করে। নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একটি স্বাধীন দেশের সরকারের অসহায়ত্ব এর চেয়ে আর কী হতে পারে? আমরা সাধারণ জনগণের শুধু ‘চেয়ে চেয়ে দেখলাম তুমি চলে গেলে’ বলা ছাড়া কিছুই করার থাকে না!
জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার কারণেই স্বাধীনতার পর পণ্যদ্রব্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ছিল কনজ্যুমার সাপ্লাই করপোরেশন (কসকর), সমবায় মার্কেটিং সোসাইটি এবং সর্বশেষ ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। কিন্তু মুক্তবাজার অর্থনীতির ডামাঢোলে ভেস্তে গেছে সেসব ফলদায়ক উদ্যোগ। মুক্তবাজার অর্থনীতির মোড়লদের নির্দেশনায় সরকার বাজার ব্যবস্থার অনেক কিছুই এখন দেখেও না দেখার ভান করে। কিন্তু স্বাধীনতার পরে দেশের ইউনিয়ন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল সরকারের হাত। ইচ্ছা করলেই ব্যবসায়ীদের কোনো পণ্যের দাম বাড়ানো সম্ভব ছিল না। তখন ডিলারের মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায় পণ্যদ্রব্য পৌঁছে দিত সরকার। কিন্তু এখন বাজারে নিত্যদিন সংকট বিরাজ করলেও নিধিরাম সর্দারের মতো টিসিবির একমাত্র ট্রাকসেল ছাড়া সরকারের বিকল্প কোনো পণ্যের সরবরাহের ব্যবস্থা নেই।
মুক্তবাজার অর্থনীতি চালুর পর রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সরবরাহ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে; পাশাপাশি ‘সরকার ব্যবসা করবে না’ এমন ধারণা থেকে ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়েছে বিকল্প বাজার ব্যবস্থা। যার সুযোগ ঠিকভাবেই কাজে লাগাচ্ছে এ দেশের কতিপয় ব্যবসায়ী নামধারী লুটপাটকারী। রাষ্ট্র ক্ষমতার চারপাশে ঘুরঘুর করা কতিপয় ব্যক্তি সিন্ডিকেট গড়ে তুলে গাছের উপরেরটাও খাচ্ছে, তলারটাও নির্দ্বিধায় কুড়াচ্ছে।
এসব সিন্ডিকেটের দানবে পরিণত হওয়ার মূল বীজ আসলে আমাদের রাষ্ট্র দর্শনের মধ্যেই নিহিত। আমাদের রাষ্ট্রের দর্শন পুঁজিবাদী দর্শন। এই পুঁজিবাদী দর্শনের মূলমন্ত্রই হলো-- একের শ্রমে অপরের দেহের পরিপুষ্টি লাভ। হাজার হাজার মানুষের শ্রমের ফসলে কতিপয়ের গোলা ভরা। উপরতলার মানুষের পেট ভরার পর চুইয়ে যদি কিছু নিচতলার মানুষের পাতে আসে আসতেও পারে, আবার নাও আসতে পারে! এর সবটাই নির্ভর করে ব্যবসায়ী নামধারী পুঁজিপতিদের দয়ার ওপর। শ্রমিকের বেঁচে থাকাটা আজ এসব মালিকের দয়া-দাক্ষিণ্যের ওপর করছে বলেই দেশে হু হু করে জিনিসপত্রের দাম বাড়ার পরও শ্রমিকের মজুরি বাড়ার কোনো নামগন্ধ নেই।
পুঁজিবাদী দর্শনের মূল বিষয়ই হলো অবিরাম মুনাফা (লাভ) অর্জন করা। অবিরাম মুনাফা অর্জন ছাড়া এ দর্শন এক মুহূর্তও টিকে থাকতে পারে না। তাই মুনাফা অর্জনের জন্য মানুষ মরে সাফ হয়ে গেলেও তাতে এ দর্শনের লালন-পালনকারীদের কোনো মাথাব্যথা নেই। গরীব ও শ্রমিকবান্ধব বলে যে বা যারা মুখে যতই ফেনা তুলে ফেলুক না কেন বিষয়টি আমরা চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করলাম মহামারি করোনার সময়।
পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে পণ্য উৎপাদনে শ্রমিকের শ্রম ছাড়া অন্য সব উপাদানই কারখানার মালিককে বাজার থেকে বাজার মূল্যেই কিনে নিতে হয়। শুধু শ্রমিকের শ্রমের মূল্য কম দিতে পারলেই প্রতিযোগিতামূলক বাজারে মালিকের মুনাফা অর্জিত হয়। শ্রমের মূল্য যত কম দিতে পারে- তত মালিকের লাভ। শ্রমিকরা অসংগঠিত (শ্রমিকদের অসংগঠিত করে রাখার যত রকম কৌশল আছে— পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা তার সবকিছু জারি রাখে) বলেই মালিকরা শ্রমিকের শ্রমের মূল্য কম দিতে পারে। মালিকরা সংগঠিত এবং রাষ্ট্রের নীতীনির্ধারণে তাদের লোক থাকে বলে পণ্যদ্রব্য চড়া দামে বিক্রি করে অঢেল পয়সা হস্তগত করে; আবার শ্রমিকের শ্রমমূল্যও কম দিয়ে রাতারাতি কলাগাছে পরিণত হয়। উভয় দিক দিয়েই সোনায় সোহাগা বলে বাংলাদেশ কোটিপতি সৃষ্টিতে বিশ্বে শীর্ষস্থান দখল করতে পেরেছে!
এ কারণেই বাজারে পণ্যদ্রব্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে সরকার এবং বিরোধী দল সিন্ডিকেটের কারসাজি সিন্ডিকেটের কারসাজি বলে চিৎকার করলেও সিন্ডিকেট নামক দেও-দানব তারা কোথাও খুঁজে পায় না। তারা খুঁজে পাবে ক্যামনে? তারাই যে এসব সিন্ডিকেটের মূলহোতা! কাক কি কখনও কাকের মাংস ভক্ষণ করে?
যতদিন না আমাদের রাষ্ট্রের শোষণমূলক পুঁজিবাদী দর্শনের পরিবর্তন না হবে, যতদিন না রাষ্ট্রদর্শনে মুনাফা বা পয়সা মুখ্য না হয়ে মানুষের জীবন মুখ্য হবে— ততদিন বাজারে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, বাজারে গিয়ে বাঁধা আয়ের মানুষের বোবাকান্না আমরা এ দেশে দেখেই যেতে থাকব। ●
অকা/নিলে/সকাল, ২ এপ্রিল, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
লেখক সাংবাদিক ও নিয়মিত লেখক
ornabmostafa1968@gmail.com
সর্বশেষ হালনাগাদ 4 years আগে

