অর্থকাগজ প্রতিবেদন

রাজধানীর মানিক নগরের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা জহির উদ্দিন (ছদ্মনাম) দীর্ঘদিন ধরে তার পৈতৃক একতলা বাড়িটি পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনা করছেন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তি একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উন্নয়ন চুক্তির মাধ্যমে জমি দিয়ে বহুতল ভবন নির্মাণ করতে চান। বিনিময়ে কয়েকটি ফ্ল্যাট পাওয়ার আশা করছেন, যা তার অবসর জীবনের আর্থিক নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি হতে পারে। তবে আগামী ১ জুলাই থেকে কার্যকর হতে যাওয়া নতুন কর প্রস্তাব তার সেই পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তার ছায়া ফেলেছে। কারণ, নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার আগেই তাকে সম্ভাব্য কোটি টাকার করের হিসাব কষতে হচ্ছে।

জহির উদ্দিনের এই উদ্বেগ এখন শুধু একজন জমির মালিকের ব্যক্তিগত দুশ্চিন্তা নয়; বরং সারা দেশের আবাসন খাতের বহুল আলোচিত একটি ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রস্তাবিত ‘মূলধনি মুনাফা কর’ বা ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স।

নতুন বাজেট প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো জমির মালিক যদি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উন্নয়ন চুক্তিতে অংশ নেন, তাহলে চুক্তির আওতায় পাওয়া নগদ অর্থ (সাইনিং মানি), ফ্ল্যাট, নির্মাণকালীন ভাড়া সুবিধা কিংবা অর্থমূল্যসম্পন্ন অন্য যেকোনো সুবিধাকে ‘মূলধনি মুনাফা’ হিসেবে গণ্য করা হবে। জমির মূল অর্জনমূল্য বাদ দিয়ে অবশিষ্ট মুনাফার ওপর ১৫ শতাংশ হারে কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।

বাংলাদেশের আবাসন খাত মূলত যৌথ উন্নয়ন মডেলের ওপর নির্ভরশীল। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা কিংবা রাজশাহীর মতো শহরগুলোর নগর সম্প্রসারণে এই পদ্ধতি দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর ভূমিকা পালন করে আসছে। এতে জমির মালিককে নির্মাণ ব্যয়ের ঝুঁকি নিতে হয় না, আবার ডেভেলপারকেও জমি কিনতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করতে হয় না। ফলে উভয় পক্ষের জন্য এটি একটি কার্যকর ও লাভজনক ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে নতুন করনীতি কার্যকর হলে এই প্রচলিত কাঠামো বড় ধরনের চাপে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রিহ্যাব সভাপতি ড. আলী আফজালের মতে, কর আরোপের বিষয়টি নয়, বরং করের সময় ও বাস্তবায়ন পদ্ধতিই মূল উদ্বেগের কারণ। তিনি বলেন, একজন জমির মালিক ফ্ল্যাট বুঝে পাওয়ার সময় প্রকৃত অর্থে কোনো নগদ আয় করেন না; তিনি কেবল একটি সম্পদের মালিক হন। সেই সম্পদ ভবিষ্যতে বিক্রি করে লাভ হবে কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়। ফলে সম্পদ হাতে পাওয়ার মুহূর্তেই বড় অঙ্কের কর আরোপ অনেকের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

নতুন বিধান অনুযায়ী, ফ্ল্যাট বা অন্য সম্পদ হস্তান্তরের সময়ই কর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থাকবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো জমির মালিক যদি ৫০ লাখ টাকা সাইনিং মানি এবং দেড় কোটি টাকা মূল্যমানের দুটি ফ্ল্যাট পান, তাহলে মোট প্রাপ্ত সুবিধার মূল্য দাঁড়াবে ২ কোটি টাকা। জমির ক্রয়মূল্য যদি ৮০ লাখ টাকা হয়ে থাকে, তাহলে নিট মুনাফা হবে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। এর ওপর ১৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে ১৮ লাখ টাকা।

আরও বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে করের পরিমাণ কয়েক কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। রিহ্যাবের মতে, এতে অনেক জমির মালিককে কর পরিশোধের জন্য ঋণ নিতে বা প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের একটি অংশ বিক্রি করতে বাধ্য হতে হতে পারে।

অন্যদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) মনে করে, জমির মালিক নগদ অর্থ হাতে না পেলেও তিনি একটি মূল্যবান সম্পদ অর্জন করছেন, যার বাজারমূল্য নির্ধারণ করা সম্ভব। ফলে সেই অর্থনৈতিক সুবিধাকে করের আওতায় আনা আন্তর্জাতিক করনীতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়ার মতে, নতুন বিধানের ফলে জমির মালিকদের করের দায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে নির্মাণকালীন ভাড়া সুবিধা, সাইনিং মানি এবং ফ্ল্যাটের বাজারমূল্য—সবকিছু মিলিয়ে করযোগ্য আয় নির্ধারণ করা হলে করের পরিমাণ অনেক ক্ষেত্রেই বড় অঙ্কে পৌঁছাবে। ভবিষ্যতে ফ্ল্যাট বিক্রির সময় আবারও লাভের ওপর কর দিতে হলে দ্বৈত করের প্রশ্নও সামনে আসতে পারে।

আবাসন উদ্যোক্তারা আশঙ্কা করছেন, এই করব্যবস্থা কার্যকর হলে যৌথ উন্নয়ন প্রকল্পের সংখ্যা কমে যেতে পারে। এতে শুধু আবাসন খাত নয়, বরং রড, সিমেন্ট, সিরামিক, কাচ, অ্যালুমিনিয়াম, লিফট, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, পরিবহন ও আসবাবপত্রসহ প্রায় ২৬৯টি শিল্প ও সেবাখাত নেতিবাচক প্রভাবের মুখে পড়তে পারে। উৎপাদন ও বিনিয়োগ কমে গেলে কর্মসংস্থানেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কর আরোপের নীতিগত যৌক্তিকতা থাকলেও এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি এমন হওয়া উচিত যাতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিরুৎসাহিত না হয়। তাদের পরামর্শ হলো, জমির মালিক যখন ডেভেলপারের কাছ থেকে ফ্ল্যাট বুঝে পাবেন, তখন নয়; বরং ভবিষ্যতে সেই ফ্ল্যাট বিক্রি করে প্রকৃত অর্থে নগদ মুনাফা অর্জনের সময় ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স আরোপ করা অধিক বাস্তবসম্মত হতে পারে। এতে সরকারের রাজস্বও নিশ্চিত হবে, আবার জমির মালিকদেরও আগাম বড় অঙ্কের করের চাপ বহন করতে হবে না।

১ জুলাই যত ঘনিয়ে আসছে, ততই জমির মালিক, আবাসন উদ্যোক্তা এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পখাতের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেকের আশঙ্কা, বাস্তবতা বিবেচনা না করে করনীতি কার্যকর করা হলে আবাসন খাত দীর্ঘমেয়াদি মন্দার মুখে পড়তে পারে। ফলে পরিকল্পিত নগরায়ণ, পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের পুনর্নির্মাণ এবং মধ্যবিত্তের আবাসন স্বপ্ন—সবকিছুই নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে।

 

সর্বশেষ হালনাগাদ 18 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version