রুনা হোসেন>
বিশ্ব অর্থনীতির আলোচনায় বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী, বহুজাতিক কোম্পানি কিংবা প্রযুক্তি জায়ান্টদের নামই বেশি উচ্চারিত হয়। অথচ বাস্তবতা হলো, একটি দেশের অর্থনীতির প্রকৃত ভিত্তি গড়ে ওঠে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের হাত ধরে। বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবসা এবং ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কর্মসংস্থান এই খাতের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ অর্থনীতির প্রাণশক্তি লুকিয়ে আছে এমএসএমই খাতে।
তবু সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো, যে খাত অর্থনীতিকে সচল রাখে, সেই খাতই সবচেয়ে বেশি অর্থায়ন সংকটে ভোগে। জাতিসংঘের তথ্য বলছে, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ৪১ শতাংশ এবং মধ্যম আয়ের দেশগুলোর ৩০ শতাংশ উদ্যোক্তা প্রয়োজনীয় ঋণ সুবিধা পান না। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। নতুন উদ্যোক্তাদের বড় একটি অংশ মূলধনের অভাবে ব্যবসা শুরু করতে পারেন না, আবার অনেকে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতেও হিমশিম খান।
বিশ্ব যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন ও ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তখন এমএসএমই খাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলার বিকল্প নেই। প্রযুক্তি অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু প্রযুক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে মানুষকে। কারণ প্রযুক্তি কখনো উদ্যোক্তার সৃজনশীলতা, সাহস কিংবা উদ্ভাবনী চিন্তার বিকল্প হতে পারে না। বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে, যাতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা উৎপাদন, বিপণন, হিসাব ব্যবস্থাপনা ও বাজার সম্প্রসারণে আরও দক্ষ হতে পারেন।
বাংলাদেশে এমএসএমই খাতের গুরুত্ব বহুমাত্রিক। এই খাত শুধু কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে না, গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখে, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রও তৈরি করে। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়লে পারিবারিক আয় যেমন বাড়ে, তেমনি সামাজিক উন্নয়নও ত্বরান্বিত হয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র এখনো আশাব্যঞ্জক নয়। দেশে প্রায় এক কোটি পুরুষ উদ্যোক্তার বিপরীতে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা মাত্র সাত লাখ। এই বৈষম্য দূর করা সময়ের দাবি।
সরকার নতুন বাজেটে এমএসএমই খাতকে গুরুত্ব দিয়েছে। সার্ভিস প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা, ক্লাস্টার ম্যাপিং হালনাগাদ এবং শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে ‘ইয়েস প্রোগ্রাম’ চালুর উদ্যোগ ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে শুধু পরিকল্পনা গ্রহণ করলেই হবে না, তার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। মাঠপর্যায়ে উদ্যোক্তারা যাতে সহজে এসব সুবিধা পান, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো অর্থায়ন। এখনও অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা জামানতের অভাবে ব্যাংকঋণ পান না। আবার যারা ঋণ পান, তাদের অনেককে উচ্চ সুদের চাপ সামলাতে হয়। ফলে ব্যবসা সম্প্রসারণের বদলে তারা টিকে থাকাই বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেন। তাই ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের উচিত ঝুঁকি মূল্যায়নের নতুন পদ্ধতি চালু করা, যাতে সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তারা সহজ শর্তে অর্থায়নের সুযোগ পান। পাশাপাশি বিকল্প অর্থায়নের পথ—যেমন ভেঞ্চার ক্যাপিটাল, ক্রাউডফান্ডিং কিংবা ডিজিটাল ঋণসেবা—আরও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।
এমএসএমই খাতের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ দক্ষতা ও বাজারসংযোগ। অনেক উদ্যোক্তার ভালো পণ্য থাকলেও আধুনিক বিপণন কৌশল, ব্র্যান্ডিং কিংবা রপ্তানি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা নেই। এ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং ডিজিটাল মার্কেটপ্লেসে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো জরুরি।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রায় ৬০ কোটি নতুন কর্মসংস্থানের প্রয়োজন হবে। এর ৭০ শতাংশই আসবে এমএসএমই খাত থেকে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাবিকাঠি এই খাতের হাতেই।
বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের পথে এগোচ্ছে। এই যাত্রায় বড় শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের আরও শক্তিশালী করা অপরিহার্য। কারণ একটি শক্তিশালী এমএসএমই খাত মানেই শক্তিশালী স্থানীয় অর্থনীতি, বিস্তৃত কর্মসংস্থান, নারীর ক্ষমতায়ন এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি।
অর্থনীতির ভবিষ্যৎ কেবল কয়েকটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের হাতে নয়; বরং লাখো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার স্বপ্ন, পরিশ্রম ও উদ্ভাবনী শক্তির ওপর নির্ভর করছে। তাই সময় এসেছে এমএসএমই খাতকে কেবল একটি শিল্পখাত হিসেবে নয়, বরং দেশের টেকসই উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করার।
সর্বশেষ হালনাগাদ 16 hours আগে

