অর্থকাগজ প্রতিবেদন

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ (এসএমই) বোর্ড গত এক বছরে বড় ধরনের পতনের মুখোমুখি হয়েছে। গত সোমবার (১৮ আগস্ট) পর্যন্ত সূচকটি ২৭ শতাংশ বা ৩৪৫ পয়েন্ট কমে ৯৫০ পয়েন্টে নেমে এসেছে, যা সূচক চালুর সময়কার ভিত্তিস্তর ১ হাজার পয়েন্টেরও নিচে। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে যাত্রা শুরু করা এই বোর্ড মাত্র এক বছরের মধ্যে দ্রুত উত্থান দেখলেও, ২০২২ সালের পর থেকে এর অস্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি স্থায়ী হয়নি। ফলে সাম্প্রতিক পতন বাজারে এক ধরনের স্বাভাবিক সংশোধন হিসেবে বিবেচিত হলেও, বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় আঘাত হেনেছে।

মূল কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তালিকাভুক্ত ২০টি এসএমই কোম্পানির মধ্যে ১৫টির শেয়ারের দামে ব্যাপক পতন ঘটেছে। বাজার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এসএমই শেয়ারগুলোর প্রাথমিক দাম বৃদ্ধি ছিল মূলত কৃত্রিম—অর্থাৎ কোম্পানিগুলোর প্রকৃত আয়, মুনাফা বা ব্যবসায়িক কার্যকারিতার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক ছিল না। সীমিত সংখ্যক শেয়ার এবং কম ফ্রি-ফ্লোটের কারণে বাজারে জল্পনামূলক আচরণ ও গুজবের প্রভাবে কিছু কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। ফলে বিনিয়োগকারীরা দ্রুত মুনাফার আশায় ঝুঁকিপূর্ণভাবে বিনিয়োগ করেছিলেন। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি ও কড়াকড়ি বাড়ার পর দাম ধস নেমেছে।

২০২২ সালের আগস্টে এসএমই সূচক এক সময় ২ হাজার ২৪৪ পয়েন্টে পৌঁছায়। কিন্তু গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত এসএমই শেয়ারের দাম ৩% থেকে ৭৬% পর্যন্ত কমেছে। এর প্রভাবে বাজার মূলধন ১০ বিলিয়নের বেশি হ্রাস পেয়ে বর্তমানে ১৯.২৩ বিলিয়ন টাকায় দাঁড়িয়েছে। তুলনামূলকভাবে একই সময়ে ডিএসইর প্রধান বোর্ডের সূচক মাত্র ৬% কমেছে এবং কিছু বড় মূলধনী শেয়ারের উত্থানে বাজার মূলধন ১৫৪ বিলিয়ন টাকা বেড়েছে। অর্থাৎ প্রধান বাজার যেখানে মোটামুটি স্থিতিশীল থেকেছে, এসএমই বোর্ড সেখানে এক বছরের মধ্যে গভীর সংকটে পতিত হয়েছে।

এসএমই বোর্ডের পতনে বিশেষভাবে আলোচিত দুই কোম্পানি হলো ইউসুফ ফ্লাওয়ার ও হিমাদ্রি। ইউসুফ ফ্লাওয়ারের শেয়ারের দাম এক বছরে ৬৭% কমে ৬ হাজার ১৩৭ টাকা থেকে নেমে ২ হাজার ১৮ টাকায় এসেছে। হিমাদ্রির শেয়ারের দামও ৫৩% কমে ১ হাজার ২২ টাকায় দাঁড়িয়েছে। গত বছর এ দুটি কোম্পানির শেয়ারের দাম এমন অস্বাভাবিক পর্যায়ে গিয়েছিল যে, মূল বাজারের ভালো ডিভিডেন্ড প্রদানকারী কোম্পানির শেয়ারও এর তুলনায় সস্তা মনে হচ্ছিল। বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ছিল সরাসরি জল্পনা ও গুজব-নির্ভর মূল্যবৃদ্ধির উদাহরণ।

শুধু তাই নয়, বাজার কারসাজির অভিযোগও প্রমাণিত হয়েছে। গত বছর বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) হিমাদ্রির শেয়ার কারসাজির জন্য চার ব্যক্তি ও তিন প্রতিষ্ঠানকে ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা জরিমানা করে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, এসএমই বোর্ডে শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে প্রকৃত ব্যবসায়িক সাফল্য নয় বরং কৃত্রিম কারসাজি ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর তৎপরতা কার্যকর ছিল।

২০২৩ সালের ১৮ আগস্ট নতুন বিএসইসি চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ দায়িত্ব নেন এবং এরপর থেকেই অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ শুরু হয়। নিয়ন্ত্রকের এই অবস্থান বাজারে আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং যারা শেয়ার কারসাজির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তারা দ্রুত শেয়ার বিক্রি করতে শুরু করেন। ফলে কৃত্রিমভাবে ফোলানো দামের শেয়ারগুলো ভেঙে পড়ে এবং এসএমই বোর্ড সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই পতনকে পুরোপুরি নেতিবাচকভাবে দেখা উচিত নয়। কারণ এসএমই বোর্ডের সূচক ও দাম এখন বাস্তবতার কাছাকাছি চলে আসছে। ভবিষ্যতে যদি কোম্পানিগুলো প্রকৃত মুনাফা অর্জন করতে পারে এবং সুশাসন নিশ্চিত হয়, তবে ধীরে ধীরে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসবে। একইসঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কড়াকড়ি, স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ ও বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে এসএমই বোর্ড আবার টেকসই ভিত্তিতে দাঁড়াতে পারবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এসএমই বোর্ড বাংলাদেশের পুঁজি বাজারে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু এর টেকসই উন্নয়নের জন্য দরকার শক্ত নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছ তথ্যপ্রকাশ এবং কোম্পানিগুলোর প্রকৃত সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে মূল্যায়ন। অন্যথায় বাজার আবারও কারসাজির শিকার হতে পারে, যা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করবে।
অকা/পুঁবা/ই/সকাল/১৯ আগস্ট, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 6 months আগে

Leave A Reply

Exit mobile version