অর্থকাগজ প্রতিবেদন
শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে অধিক হারে লভ্যাংশ বিতরণে উৎসাহিত করতে নতুন করনীতি প্রবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত ব্যবস্থার আওতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে কোনো কোম্পানি কর-পরবর্তী নিট মুনাফার ৩০ শতাংশের কম লভ্যাংশ বিতরণ করলে ঘাটতি অংশের ওপর ১০ শতাংশ হারে অতিরিক্ত কর আরোপ করা হতে পারে।
একই সঙ্গে নগদ (ক্যাশ) লভ্যাংশের তুলনায় বেশি পরিমাণ স্টক ডিভিডেন্ড ঘোষণা করা হলে অথবা শুধুমাত্র স্টক ডিভিডেন্ড দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ কর পরিশোধ করতে হবে। তবে ব্যাংক, বিমা, লিজিং ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে এই নতুন কর ব্যবস্থার বাইরে রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে আয়কর আইনের সংশোধনের মাধ্যমে এ বিধান অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হতে যাওয়া বাজেটে এ বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন এই নীতি কার্যকর হলে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ বিতরণ নীতিতে পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে মুনাফার বড় অংশ সংরক্ষণ করে তুলনামূলক কম নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে, তারা শেয়ারহোল্ডারদের প্রতি আরও ইতিবাচক অবস্থান নিতে বাধ্য হতে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত স্টক ডিভিডেন্ড ঘোষণার প্রবণতাও কমতে পারে।
প্রস্তাবিত বিধান অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি কর-পরবর্তী নিট মুনাফার ৩০ শতাংশের কম লভ্যাংশ বিতরণ করলে নির্ধারিত সীমা ও প্রকৃত বিতরণকৃত লভ্যাংশের মধ্যে যে ঘাটতি থাকবে, সেই অংশের ওপর ১০ শতাংশ হারে অতিরিক্ত কর আরোপ করা হবে। নির্ধারিত সময়ে কর পরিশোধ না হলে উপকর কমিশনার নোটিশ জারি ও শুনানির সুযোগ দেওয়ার পর কর নির্ধারণ করতে পারবেন।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো কোম্পানির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ১০০ কোটি টাকা হলে অন্তত ৩০ কোটি টাকা লভ্যাংশ বিতরণ প্রত্যাশিত হবে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি যদি ২০ কোটি টাকা লভ্যাংশ দেয়, তাহলে অবশিষ্ট ১০ কোটি টাকার ওপর ১০ শতাংশ হারে অতিরিক্ত কর দিতে হবে।
বর্তমানে প্রচলিত বিধান অনুযায়ী, কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানি আগের বছরের কর-পরিশোধিত নিট আয়ের ৭০ শতাংশের বেশি অর্থ সংরক্ষিত আয়, রিজার্ভ বা উদ্বৃত্ত হিসেবে স্থানান্তর করলে সেই স্থানান্তরিত অর্থের ওপর ১০ শতাংশ কর আরোপ করা হয়। নতুন প্রস্তাবে মুনাফা সংরক্ষণের পরিমাণের পরিবর্তে লভ্যাংশ বিতরণের হারকে কর নির্ধারণের প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
স্টক ডিভিডেন্ডের ক্ষেত্রেও কিছু পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ক্যাশ ডিভিডেন্ডের তুলনায় বেশি স্টক ডিভিডেন্ড ঘোষণা করা হলে অথবা শুধুমাত্র স্টক ডিভিডেন্ড দেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে ১০ শতাংশ কর দিতে হয়। নতুন প্রস্তাবে ব্যাংক, বিমা, লিজিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই কর থেকে অব্যাহতি দেওয়ার কথা থাকলেও অন্যান্য তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের জন্য বিদ্যমান করহার বহাল থাকবে।
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এ উদ্যোগ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় সহায়ক হতে পারে। কারণ দেশের অধিকাংশ বিনিয়োগকারী এখনও লভ্যাংশকে বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনা করেন। ফলে কোম্পানিগুলো যদি মুনাফার একটি যুক্তিসঙ্গত অংশ শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে বিতরণ করে, তাহলে বিনিয়োগকারীরা সরাসরি তার সুফল পাবেন এবং বাজারে আস্থাও বাড়তে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের মত হলো, আন্তর্জাতিকভাবে কোনো কোম্পানিকে নির্দিষ্ট হারে লভ্যাংশ দিতে বাধ্য করা খুব বেশি প্রচলিত নয়। দ্রুত সম্প্রসারণশীল ও উচ্চ প্রবৃদ্ধির কোম্পানিগুলো প্রায়ই মুনাফার বড় অংশ পুনর্বিনিয়োগ করে থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসার বিকাশে সহায়ক হতে পারে। তবুও বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বর্তমান বাস্তবতায় কম লভ্যাংশ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপের প্রস্তাবকে অনেকেই বিনিয়োগকারীস্বার্থবান্ধব পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
সর্বশেষ হালনাগাদ 5 hours আগে

