জলি রহমান

কোন নির্দিষ্ট সময়ে একটি দেশের দ্রব্য ও সেবা মূল্যের উর্ধগতিকে মূল্যস্ফীতি বলে। মূল্যস্ফীতির ধারা উর্ধমুখী হলে গরিব ও স্বল্প আয়ের মানুষেরা চাপের মুখে পড়ে কেননা তাদের আয়ের অধিকাংশ চলে যায় নিত্যপণ্য ক্রয়ে। মাছ, মাংস, শাক-সবজি সবকিছুর চড়া মূল্য। অধিকাংশ মানুষের আয় বাড়ছে না। মহামারী করোনার কারণে নতুন করে দেশের আড়াই কোটি মানুষ দারিদ্র্য হয়েছে। অথচ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বাড়ছে। এজন্য গরিব আরও গরিব হচ্ছে। নিম্নবিত্তরা দারিদ্র্যের কাতারে চলে যাচ্ছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সঞ্চয় হ্রাস পাচ্ছে। বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে। সবকিছু চক্রাকারে ঘুরছে। যেমন মামুন সাহেব তার সংসারে মাসে আট লিটার ভোজ্য তেল ক্রয় করতেন নির্দিষ্ট এক মুদি দোকান থেকে। তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন সে পাঁচ লিটার তেল দিয়ে পুরো মাস চালানোর চেষ্টা করবেন। মামুন সাহেবের মতো আরও কিছু মানুষ যদি এমন করে। তবে ঐ দোকানদারের ভোজ্য তেল বিক্রি কমে যাবে এবং পাইকারি বাজারে স্বল্প বিনিয়োগ করবে। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সঞ্চয় কমে গেলে বিনিয়োগ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টির সংখ্যা কমে যায়। মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদার মধ্যে অন্যতম খাদ্য। সেই খাদ্যপণ্য ন্যায্য মূল্যে ক্রয় করার কথা এখন আর ভাবা যায় না। সংবাদপত্রের পাতা উল্টালেই চোখে পড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পাইকারি মূল্য ও চূড়ান্ত বিক্রয় মূল্যের মধ্যে বিস্তর ফারাক। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এরমধ্যে নিজেদের শক্ত অবস্থান পাকাপাকি করে ফেলেছে। তাইতো প্রতিবছরই একই খবর ঘুরেফিরে আসছে। চিনি, ডাল, তেল, পিঁয়াজ, চাল সবকিছুরই মূল্য বৃদ্ধি।

তবে চলতি অর্থবছরের তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে সাধারণ মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ হয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে এই হার ছিল ৫ দশমিক ৯৭ শতাংশ। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০২১-২২ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৩ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন।

মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদ হার বৃদ্ধি করলে পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে। কেননা সুদ হার বাড়লে মানুষ সঞ্চয়ে আগ্রহী হয় এবং বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হয়। আবার মূল্যস্ফীতি বাড়লে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পায়। এতে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে সম্প্রসারণমুখী মুদ্রানীতির সঠিক প্রয়োগ করতে হবে। দেশের হালনাগাদ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৈরি করা এক বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, খাদ্যপনণ্যসহ খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতির হার উর্ধমুখী হয়েছে। সম্প্রতি খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার বেশি বাড়ছে, যা উদ্বেগজনক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ হার সাড়ে পাঁচ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখতে মুদ্রানীতি প্রয়োগে সতর্ক রয়েছে। এছাড়াও প্রতিবেদনে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে চারটি প্রধান ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। সেগুলো হলো-বৈশ্বিক খাতে প্রত্যাশার চেয়ে পুনরুদ্ধারের গতি কম; বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির হারে ঊর্ধ্বগতি; শ্রম বাজারে কর্মের অভাব এবং পণ্য পরিবহন খরচ অস্বাভাবিক বৃদ্ধি।

মূল্যস্ফীতি হল হার, যেখানে পণ্য ও পরিষেবাদির জন্য সাধারণ স্তরের দাম বাড়ে যার কারণ মুদ্রার ক্রয় শক্তি হ্রাস পায়। যদি পণ্যের দামের পাশাপাশি আয় না বাড়ায় তবে প্রত্যেকের ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস পায়, যার ফলস্বরূপ অর্থনীতি ধীরগতির বা অচল হতে পারে।

অস্থির পিঁয়াজের বাজার। সরবরাহে ঘাটতি নেই। আমদানি মূল্য একই আছে তবে কেন এই অস্থিরতা। বাংলাদেশ ফেডারেশন অব চেম্বারস অব কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এফবিসিসিআই) এর সভাপতি মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেছেন, ‘হঠাৎ করেই পিঁয়াজের দাম বাড়া শুরু হয়। ৫০ টাকার পিঁয়াজ ৮৫ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। তিনি আরও বলেছেন, ‘যখন সরকার আমদানি শুল্ক ছাড় দেয়ার ঘোষণা দিল তার একদিন পরেই পিঁয়াজের দাম ১৫ টাকা কমে যাওয়ার বিষয়টি ব্যবসায়ীদের সম্মানকে ক্ষুণ্ণ করেছে। এতে প্রমাণিত হলো দাম বাড়ানোর পেছনে একটি সিন্ডিকেটের কারসাজি ছিল। সম্প্রতি এফবিসিসিআই-এর সভাপতি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর মজুদ, আমদানি, সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেছেন। ব্যবসায়ীরা সম্মানের সঙ্গে ব্যবসা করবেন এবং লাভ করবেন বলে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন। সুযোগ পেলেই ভোক্তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত মুনাফা করবেন এমনটা মেনে নেওয়া হবে না।

তিনি আরও বলেছেন, ব্যবসায়ীদের সম্মানের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে, কোন কারসাজির প্রশ্রয় দেয়া হবে না। কারও যদি কোন সমস্যা থেকে থাকে তবে তা এফবিসিসিআইকে জানানোর অনুরোধ করে বলেছেন, ‘প্রয়োজনে সরকারের সঙ্গে আলোচনার করে এ সকল সমস্যার সমাধান করা হবে।’

নিত্যপণ্যের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে ভোক্তা সাধারণের সংগঠন কনজিউমারস এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সহসভাপতি এস এম নাজের হোসেন বলেছেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে নিত্যপণ্যের দাম লাগামহীনভাবে বাড়তে থাকায় মধ্য ও নিম্নবিত্তের মানুষের জীবন যাত্রার ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। গত চার-পাঁচ বছর যাবত নিত্যপণ্যের বাজার মূল্যে যে অস্থিরতা চলছে তার ফলে পণ্যের দাম বেড়ে এখন তা অস্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

তিনি অভিযোগ করে বলেছেন, ‘কখনও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি, আবার কখনও সরবরাহ সঙ্কটের অজুহাত দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে নিত্য-পণ্যের দাম বাড়িয়ে চলেছেন মিল ও মোকাম মালিক এবং আমদানি কারকরা। করোনা মহামারীর প্রভাবে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের আয়-রোজগার ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে বলে উল্লেখ করে নাজের হোসেন বলেছেন বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার ফলে তাঁদের ক্রয় ক্ষমতা এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশের মানুষকে এসকল অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের হাত থেকে রক্ষা করতে সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।

মধ্যস্বত্বভোগী বা সক্রিয় সিন্ডিকেট চক্র যাই বলি না কেন এদের দৌরাত্ম্য প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এসব অরাজকতার লাগাম টেনে ধরতে সরকারী ও বেসরকারীভাবে প্রতিরোধ করতে হবে। জনগণের ভোগ্যপণ্যের চাহিদা কমে গেলে বাজারে স্থবিরতা চলে আসবে। যা অর্থনীতিতে অচলাবস্থার সৃষ্টি করে। আমরা বৈষম্যহীন ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ চাই। এক্ষেত্রে সরকারকারীভাবে কৃষকের উৎপাদিত পণ্য চূড়ান্ত পর্যায়ে বিক্রয়ের ব্যবস্থা করলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব বলে আশা করি।

#

সর্বশেষ হালনাগাদ 4 years আগে

Leave A Reply

Exit mobile version