অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

চলতি অর্থবছরের অক্টোবর–ডিসেম্বর প্রান্তিকে দেশের শীর্ষস্থানীয় টেক্সটাইল ও স্পিনিং কোম্পানিগুলোর ব্যবসায় বড় ধরনের মন্দা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশ্ববাজারে সুতোর দর ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়া, বৈশ্বিক পোশাক চাহিদার দুর্বলতা এবং একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় খাতটির বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজস্ব ও মুনাফা দুটোই উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে। শেয়ারবাজারে প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অধিকাংশ বড় স্পিনিং ও টেক্সটাইল মিলের আয় গত বছরের তুলনায় নিম্নমুখী প্রবণতায় রয়েছে।

আয়ের হিসাবে মালেক স্পিনিং মিলসের রাজস্ব প্রায় ৬ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৬৭৩ কোটি টাকায়। স্কয়ার টেক্সটাইলসের ক্ষেত্রে পতন আরও গভীর—কোম্পানিটির আয় ১৪ শতাংশ কমে ৫৮০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। একই সময়ে এনভয় টেক্সটাইলসের রাজস্ব ১০ শতাংশ হ্রাস পেয়ে হয়েছে ৪১২ কোটি টাকা এবং শাশা ডেনিমসের আয় কমেছে ৪ শতাংশ, যা দাঁড়িয়েছে ৩২৮ কোটি টাকায়। এই পরিসংখ্যানগুলোই ইঙ্গিত দেয় যে, বাজারে বিক্রয় চাপের মুখে প্রায় সব বড় প্রতিষ্ঠানই পড়েছে।

তবে আয়ের তুলনায় মুনাফার চিত্র আরও বেশি উদ্বেগজনক। সুতোর দাম দ্রুত কমে যাওয়ায় প্রফিট মার্জিন মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে। মালেক স্পিনিংয়ের নিট মুনাফা ৩৭ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩১ কোটি ৮৫ লাখ টাকায়। সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে স্কয়ার টেক্সটাইলস—তাদের মুনাফা প্রায় ৯৩ শতাংশ কমে মাত্র ২ কোটি ৭৭ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। শাশা ডেনিমসের মুনাফা কমেছে ৬৫ শতাংশ, যা দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। একই সময়ে মতিন স্পিনিংয়ের মুনাফা ৩৬ শতাংশ কমে ৯ কোটি ৯১ লাখ টাকায় নেমেছে। পরিস্থিতির সবচেয়ে করুণ দৃষ্টান্ত ফারইস্ট নিটিং, যাদের মুনাফা ৯৯ শতাংশ হ্রাস পেয়ে মাত্র ১০ লাখ টাকায় এসে ঠেকেছে। এর বিপরীতে তুলনামূলক ব্যতিক্রমী পারফরম্যান্স দেখিয়েছে এনভয় টেক্সটাইলস, যারা কঠিন বাজার পরিস্থিতির মধ্যেও প্রায় ৩৫ কোটি টাকার মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।

কোম্পানিগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, সুতোর বাজারদর কাঁচামালের প্রকৃত উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক দ্রুত হ্রাস পাওয়ায় লাভ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। স্কয়ার টেক্সটাইলস জানিয়েছে, সুতোর দরপতনের পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ ব্যয় তাদের নিট মুনাফাকে আরও চাপের মুখে ফেলেছে। মালেক স্পিনিংয়ের মতে, কারখানার ওভারহেড খরচ বেড়ে গেলেও রপ্তানি চাহিদা দুর্বল থাকায় কম দামে সুতো বিক্রি করতে হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে আয়ের ওপর।

কিছু প্রতিষ্ঠান কৌশলগত পরিবর্তনের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। এনভয় টেক্সটাইলস সুতো রপ্তানি কমিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে কাপড় উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা তাদের তুলনামূলক ভালো ফল আনতে সহায়তা করেছে। অন্যদিকে মতিন স্পিনিং বেশি পরিমাণে সুতো বিক্রি করলেও প্রতি কেজির গড় বিক্রয়মূল্য ৩ দশমিক ৬৮ ডলার থেকে কমে ৩ দশমিক ৪৭ ডলারে নেমে আসায় মোট রাজস্বে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু সুতোর দামের ওঠানামাই নয়, গত দুই বছরে গ্যাস ও বিদ্যুতের উচ্চমূল্য এবং শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধির ফলে উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এতে দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো আমদানিকৃত সুতোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে সরকারি নগদ প্রণোদনা কমে যাওয়া এবং তা সময়মতো না পাওয়ায় পোশাক রপ্তানিকারকদের দেশি সুতো ব্যবহারে আগ্রহ কমছে।

এই সংকটের প্রেক্ষাপটে সরকার সুতা আমদানিতে শুল্ক বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে। তবে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, উৎপাদন ব্যয় কমানোর কার্যকর উদ্যোগ এবং ব্যাংক ঋণের শর্তে শিথিলতা না এলে আগামী মাসগুলোতেও টেক্সটাইল ও স্পিনিং খাতের কোম্পানিগুলোর আয় ও মুনাফা চাপের মধ্যেই থাকবে।

অকা/শিখা/ই/সকাল/২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 2 days আগে

Leave A Reply

Exit mobile version