শিপন হালদার>

বাজারে ঢুকেই একজন সাধারণ মানুষ এখন আর শুধু পকেট হাতড়ে দেখেন না, দীর্ঘশ্বাসও ফেলেন। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, চাল, ডাল, সবজি—যে পণ্যই কিনতে যান, দাম যেন প্রতিদিন নতুন করে বিস্মিত করে। অথচ কৃষকের মুখে সেই বিস্ময়ের কোনো ছাপ নেই। তিনি বলছেন, তিনি তো আগের মতোই কম দামেই বিক্রি করেছেন। তাহলে এই অতিরিক্ত টাকা কার পকেটে যাচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই সম্প্রতি সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) একটি গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গবেষণাটি দেখিয়েছে, উৎপাদক থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে কোনো কোনো খাদ্যপণ্যের দাম ১১৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। অর্থাৎ, একজন কৃষক যে কাঁচা মরিচ ১০০ টাকায় বিক্রি করেন, শহরের একজন ভোক্তাকে সেটি কিনতে হয় ২১৬ টাকায়। মাঝারি মানের চালের দাম প্রায় দ্বিগুণ, পেঁয়াজের দাম ৮৭ শতাংশ, মসুর ডালের ৭৮ শতাংশ এবং বেগুনের ৭২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এ পরিসংখ্যান শুধু মূল্যবৃদ্ধির নয়, আমাদের বাজার ব্যবস্থার গভীর অসুস্থতারও প্রতিচ্ছবি।

বাংলাদেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ে আলোচনা হলেই সাধারণত দুটি যুক্তি সামনে আসে—উৎপাদন কম হয়েছে অথবা আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছে। বাস্তবে এগুলো অবশ্যই প্রভাব ফেলে। কিন্তু সিপিডির গবেষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে—দীর্ঘ ও অদক্ষ সরবরাহ শৃঙ্খল এবং বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম বড় কারণ।

আমাদের কৃষিপণ্যের বাজারে উৎপাদক থেকে ভোক্তার মধ্যে বহু স্তরের মধ্যস্বত্বভোগী রয়েছে। কৃষক বিক্রি করেন স্থানীয় ফড়িয়ার কাছে, ফড়িয়া বিক্রি করেন আড়তদারের কাছে, আড়তদার পাঠান জেলা বা শহরের পাইকারের কাছে, সেখান থেকে যায় আরেক আড়তদার হয়ে খুচরা বিক্রেতার কাছে। প্রতিটি ধাপে যুক্ত হয় পরিবহন ব্যয়, কমিশন, মুনাফা এবং অনেক ক্ষেত্রে অযৌক্তিক মূল্য বৃদ্ধি। ফলে কৃষক যেমন ন্যায্য দাম পান না, তেমনি ভোক্তাও বাধ্য হন অতিরিক্ত দাম দিতে।

এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় বৈপরীত্যটি চালের বাজারে দেখা যায়। গবেষণায় বলা হয়েছে, মাঝারি মানের চালের খুচরা মূল্যের মাত্র ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ পান কৃষক। অর্থাৎ, একজন কৃষক ধান উৎপাদনের সব ঝুঁকি নিলেও শেষ পর্যন্ত ভোক্তার দেওয়া টাকার অর্ধেকও তার হাতে পৌঁছায় না। অন্যদিকে অটো রাইস মিল মালিকরা বাজারে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেন। এর অর্থ, উৎপাদক ও ভোক্তা—দুই পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন; লাভের বড় অংশ চলে যাচ্ছে বাজারের মধ্যবর্তী স্তরে।

অবশ্য সব দোষ মধ্যস্বত্বভোগীদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সিপিডি যথার্থভাবেই বলেছে, শুধু মধ্যস্বত্বভোগীদের দায়ী করা কিংবা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতিকেই সিন্ডিকেটের প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বাস্তবতা আরও জটিল। পর্যাপ্ত হিমাগারের অভাব, কোল্ড-চেইন অবকাঠামোর দুর্বলতা, ফসল-পরবর্তী সংরক্ষণের সীমাবদ্ধতা, পরিবহন ব্যয়ের বৃদ্ধি, দুর্বল বাজার তথ্যব্যবস্থা এবং প্রতিযোগিতার অভাব—সব মিলিয়ে মূল্যবৃদ্ধির একটি জটিল চক্র তৈরি হয়েছে।

তবে এটাও সত্য, বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, মজুতদারি ও অস্বচ্ছ বাণিজ্যিক আচরণের অভিযোগ নতুন নয়। প্রতি বছরই কোনো না কোনো পণ্য নিয়ে একই চিত্র দেখা যায়। কখনো পেঁয়াজ, কখনো আলু, কখনো ডিম, কখনো কাঁচা মরিচ। উৎপাদন যথেষ্ট থাকার পরও বাজারে দাম বাড়ে। পরে দেখা যায়, সরবরাহে বড় কোনো ঘাটতি ছিল না। অর্থাৎ, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং নজরদারির অভাব মূল্যবৃদ্ধিকে আরও উসকে দেয়।

এই মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে নির্মম প্রভাব পড়ে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর। সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ভোক্তা মূল্যসূচকের ঝুড়িতে খাদ্যের অংশ ৫৯ শতাংশ। দেশের ৬০ শতাংশের বেশি পরিবার তাদের মোট আয়ের অন্তত অর্ধেক খাদ্য কেনার পেছনে ব্যয় করে। সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ পরিবার তাদের মোট ব্যয়ের প্রায় ৬০ শতাংশই খাদ্যের জন্য খরচ করে। অর্থাৎ, খাদ্যের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে একজন দরিদ্র পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় যে অভিঘাতের মুখে পড়ে, তা উচ্চ আয়ের পরিবারের সঙ্গে তুলনাই চলে না।

উচ্চ মূল্যস্ফীতির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবও এখন স্পষ্ট। মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে, সঞ্চয় ভাঙছে, ঋণ বাড়ছে, পুষ্টিকর খাবার কমে যাচ্ছে। বহু পরিবার মাছ, মাংস বা ফল কিনতে পারছে না। অনেকেই খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। এই বাস্তবতা শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, মানবসম্পদ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও বড় উদ্বেগের বিষয়।

প্রশ্ন হলো, সমাধান কোথায়?

প্রথমত, কৃষিপণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল ছোট করতে হবে। কৃষক থেকে ভোক্তার সরাসরি সংযোগ বাড়াতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, কৃষক বাজার এবং সমবায়ভিত্তিক বিপণন ব্যবস্থার সম্প্রসারণ জরুরি।

দ্বিতীয়ত, দেশে আধুনিক হিমাগার ও কোল্ড-চেইন অবকাঠামোয় বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। এখনো বিপুল পরিমাণ সবজি, ফল ও কৃষিপণ্য সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়। উৎপাদনের মৌসুমে কৃষক কম দাম পান, আবার কয়েক মাস পর ভোক্তাকে কয়েক গুণ বেশি দামে সেই পণ্য কিনতে হয়। এই বৈপরীত্য দূর করতে সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন অপরিহার্য।

তৃতীয়ত, বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে হবে। কোনো একটি বা কয়েকটি গোষ্ঠীর হাতে সরবরাহ ও পাইকারি বাজারের নিয়ন্ত্রণ চলে গেলে স্বাভাবিকভাবেই মূল্য নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে। বাজারে নতুন উদ্যোক্তা প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি এবং প্রতিযোগিতা কমিশনকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।

চতুর্থত, সরকারকে শুধু অভিযাননির্ভর বাজার নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ভ্রাম্যমাণ আদালত বা জরিমানা তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বাজারকে স্বচ্ছ করে না। প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক বাজার ব্যবস্থাপনা, যেখানে প্রতিদিন উৎপাদক, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের দাম প্রকাশ করা হবে এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি দ্রুত শনাক্ত করা যাবে।

পঞ্চমত, কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমাতে সারের সহজলভ্যতা, সেচ, উন্নত বীজ এবং স্বল্প সুদে কৃষিঋণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবহন ব্যয় কমাতে সড়ক ও লজিস্টিক ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন।

সবশেষে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম শুধু অর্থনীতির কোনো পরিসংখ্যান নয়; এটি কোটি মানুষের প্রতিদিনের জীবনসংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। যখন একজন দিনমজুর আধা কেজি ডাল কিনতে গিয়ে দ্বিধায় পড়েন, যখন একজন মধ্যবিত্ত বাবা সন্তানকে ফল কিনে দিতে পারেন না, তখন মূল্যস্ফীতি কেবল একটি অর্থনৈতিক সূচক থাকে না—তা সামাজিক অস্থিরতা ও বৈষম্যের কারণ হয়ে ওঠে।

সরকার মূল্যস্ফীতি কমাতে মুদ্রানীতিতে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। কিন্তু খাদ্যপণ্যের বাজারে কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া শুধু সুদের হার পরিবর্তন বা প্রশাসনিক অভিযান দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে সুফল পাওয়া কঠিন। কৃষক যেন ন্যায্য মূল্য পান, ভোক্তা যেন সহনীয় দামে খাদ্য কিনতে পারেন এবং মধ্যবর্তী স্তরে অস্বাভাবিক মুনাফার সুযোগ কমে—এমন একটি বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

 

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, অর্থকাগজ।

সর্বশেষ হালনাগাদ 5 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version