অর্থকাগজ প্রতিবেদন>
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, উন্নয়ন প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন, প্রশাসনিক ধীরগতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতার প্রভাব এবার স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে দেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার নেমে এসেছে মাত্র ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশে, যা বাংলাদেশের উন্নয়ন ইতিহাসে সর্বনিম্ন। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই উদ্বেগজনক চিত্র।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংশোধিত এডিপির মোট বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকার নিজস্ব অর্থায়নে ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা, বৈদেশিক সহায়তা থেকে ৭২ হাজার কোটি টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নে ৮ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। কিন্তু অর্থবছর শেষে ব্যয় করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৪১ হাজার ৭১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অর্থাৎ, বরাদ্দের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অর্থ অব্যয়িত থেকে গেছে।
উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে স্থবিরতার প্রভাব
২০২৪ সালের জুলাইয়ের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। ক্ষমতা গ্রহণের পর আওয়ামী লীগ সরকারের নেওয়া বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত হয়। প্রকল্প অনুমোদন, অর্থ ছাড় এবং বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে ধীরগতি তৈরি হওয়ায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। সংশ্লিষ্টরা আশা করেছিলেন, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই জট কাটবে। কিন্তু আইএমইডির সর্বশেষ তথ্য বলছে, বাস্তবায়নের গতি বাড়ার পরিবর্তে আরও কমেছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূল এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। পরে জানুয়ারিতে সংশোধনের মাধ্যমে তা কমিয়ে ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকায় নামানো হয়। আকার কমানোর পরও নির্ধারিত অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয়নি।
আগের বছরের তুলনায়ও পিছিয়ে
আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৬৮ দশমিক ১৮ শতাংশ। রাজনৈতিক অস্থিরতার সেই বছরেও বাস্তবায়নের হার বর্তমান অর্থবছরের চেয়ে বেশি ছিল।
এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাস্তবায়নের হার ছিল ৮০ দশমিক ৬৩ শতাংশ, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৮৫ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ৯২ দশমিক ৭৪ শতাংশ। অর্থাৎ, মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে বাস্তবায়নের হার ৯০ শতাংশের ঘর থেকে নেমে এসেছে ৬৭ শতাংশে।
আইএমইডির দীর্ঘমেয়াদি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৪-০৫ অর্থবছর থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত কোনো বছরেই এডিপি বাস্তবায়নের হার ৮০ শতাংশের নিচে নামেনি। এমনকি করোনা মহামারির সময় ২০১৯-২০ অর্থবছরেও বাস্তবায়নের হার ছিল ৮০ দশমিক ৩৯ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৯৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৯৪ দশমিক ২ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়িত হয়েছিল।
সে হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশ বাস্তবায়ন হার শুধু গত কয়েক বছরের নয়, অন্তত দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে নিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
বছরের শেষে ব্যয়ের হিড়িক
আইএমইডির প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১ লাখ ৭৬৩ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। অথচ শেষ মাস জুনেই এককভাবে ব্যয় করা হয়েছে ৪০ হাজার ৩০৮ কোটি ১২ লাখ টাকা, যা পুরো বরাদ্দের প্রায় ১৯ দশমিক ২৯ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বছরের অধিকাংশ সময় প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি থাকলেও শেষ মাসে হঠাৎ বিপুল অর্থ ব্যয়ের এই প্রবণতা বহুদিনের সমস্যা। 'জুন ক্লোজিং' নামে পরিচিত এই সংস্কৃতিতে প্রকল্পের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি অনিয়ম, অপচয় ও দুর্নীতির ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
ব্যয়ের পরিমাণও কমেছে
শুধু বাস্তবায়নের হার নয়, মোট ব্যয়ের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এডিপির আওতায় ব্যয় হয়েছিল ১ লাখ ৫৪ হাজার ১৮৯ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। সেখানে সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা কম।
গত পাঁচ অর্থবছরে এডিপিতে গড়ে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি ব্যয় হলেও এবার সেই ধারা ভেঙে ব্যয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মত
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু এডিপির আকার বাড়ালেই উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয় না। প্রকল্প অনুমোদন, অর্থ ছাড়, দরপত্র প্রক্রিয়া, ভূমি অধিগ্রহণ এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের দুর্বলতা দূর না করলে বাস্তবায়নের হার বাড়ানো সম্ভব নয়।
তাদের মতে, প্রকল্প গ্রহণে অগ্রাধিকার নির্ধারণ, সময়মতো অর্থ ছাড়, দক্ষ প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতি ও অপচয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে অর্থবছরের শেষ দিকে তড়িঘড়ি ব্যয়ের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে সারা বছর সমান গতিতে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে উন্নয়ন ব্যয়ের পরিমাণ নয়, বরং প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও সুশাসনই এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। উন্নয়ন কর্মসূচিকে কার্যকর করতে হলে প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে সময়ানুবর্তিতা প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই।
সর্বশেষ হালনাগাদ 2 hours আগে

