অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
দেশের পুঁজিবাজারের ব্যাংক খাতের বেশিরভাগ কোম্পানি সর্বশেষ ২০২২ হিসাব বছরে বিগত বছরের থেকে ভালো লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এছাড়া অনেক কোম্পানি বোনাসের সঙ্গে নগদ লভ্যাংশও দিয়েছে। এতে দেখা গেছে, গত বছরের লভ্যাংশ দেয়ার বিপরীতে ব্যাংক খাতের কোনো কোম্পানির লভ্যাংশ ফলন বা ডিভিডেন্ড ইল্ড ১০ শতাংশ হয়নি। বেশিরভাগ কোম্পানির ডিভিডেন্ড ইল্ড ৫ শতাংশের নিচে। আর ৯ শতাংশ ছাড়িয়েছে মাত্র তিনটি কোম্পানির। এদিকে সবচেয়ে কম ডিভিডেন্ড ইল্ড পাঁচ ব্যাংকের। যাদের শেয়ার দামের বিপরীতে লভ্যাংশ দেয়ার হার তিন শতাংশের নিচে।
ডিভিডেন্ড ইল্ড হচ্ছে কোনো শেয়ারের দামের বিপরীতে কোম্পানি যে নগদ লভ্যাংশ দেয় তার শতকরা হার। সে হিসাবে বলা চলে আলোচিত পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের আয় কম হয়েছে। সে পাঁচটি ব্যাংক হচ্ছেÑব্র্যাক ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক এবং ট্রাস্ট ব্যাংক। গত বছর নগদ লভ্যাংশ দেয়নি ছয়টি ব্যাংক। সেগুলো হচ্ছেÑএবি ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, মিডল্যাংন্ড ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক ও রূপালী ব্যাংক।
তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর গত বছরের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ব্র্যাক ব্যাংক গত হিসাব বছরে শেয়ারহোল্ডারদের ১৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে; যা ১০ টাকার শেয়ারের বিপরীতে ১ টাকা ৫০ পয়সা। এ সময় ব্যাংকটির রেকর্ড ডেট অনুসারে শেয়ারের দর ছিল ৩৮ টাকা ৫০ পয়সা। সে হিসাবে ২০২২ সালে ব্যাংকটির শেয়ারে আয় হয়েছে ১ দশমিক ৯ শতাংশ। ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ২০২২ সালে শেয়ারহোল্ডারদের ১৭ দশমিক ৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে; যা ১০ টাকার শেয়ারের বিপরীতে ১ টাকা ৭৫ পয়সা। ব্যাংকটির রেকর্ড ডেট অনুসারে শেয়ারের দর ছিল ৬৩ টাকা ৫০ পয়সা। সে হিসাবে গত বছর আলোচ্য ব্যাংকটির শেয়ারে আয় দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৮০ শতাংশ। এরপর আইএফআইসি ব্যাংক গত বছর শেয়ারহোল্ডারদের ২ দশমিক ৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে; যা ১০ টাকা শেয়ারের বিপরীতে মাত্র ২৫ পয়সা। রেকর্ড ডেট অনুসারে ব্যাংকটির শেয়ারের দর ছিল ১১ টাকা ৫০ পয়সা। সে হিসাবে ২ দশমিক ২০ শতাংশ আয় দাঁড়ায় ব্যাংকটির শেয়ারে।
এছাড়া স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ২০২২ সালে শেয়ারহোল্ডারদের ২ দশমিক ৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে; যা ১০ টাকা শেয়ারের বিপরীতে ২৫ পয়সা। ব্যাংকটির রেকর্ড ডেট অনুসারে শেয়ারের দর ছিল ৮ টাকা ৮০ পয়সা। সে হিসাবে ব্যাংকটির শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের আয় দাঁড়ায় ২ দশমিক ৮০ শতাংশ। গত বছর ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ শেয়ারহোল্ডারদের দেয় ট্রাস্ট ব্যাংক; যা ১০ টাকার শেয়ারের বিপরীতে ১ টাকা। রেকর্ড ডেট অনুসারে ব্যাংকটির শেয়ারের দর ছিল ৩৪ টাকা ৯০ পয়সা। সে হিসাবে ২ দশমিক ৯০ শতাংশ আয় হয়েছে ব্যাংকটির শেয়ারে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিনিয়ত খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি ও নানা অনিয়মের ফলে ব্যাংক খাতের ওপর মানুষের অনাস্থা বেড়েই চলেছে। এতে মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখা কমিয়ে দিচ্ছে বলে জানা গেছে। দেখা গেছে, ব্যাংকে আমানত আহরণের থেকে ঋণ বিতরণ হার বেশি। সেই সঙ্গে প্রতি বছরেই খেলাপি ঋণ বেড়ে চলেছে। যার লাগাম নানা সুবিধা দিয়েও কোনোভাবেই টেনে ধরা সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থায় ব্যাংকে তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। এতে ব্যবসা কম হচ্ছে ব্যাংকগুলোর।
তারা বলেন, ব্যাংকগুলোর সুদ থেকে আয় বৃদ্ধি পেলেও পরিচালন ও সার্বিক খরচ শেষে মুনাফার হার কমে যাচ্ছে। এছাড়া ব্যাংকগুলোর পরিশোধিত মূলধন বেশি হওয়ায় শেয়ার সংখ্যাও বেশি। ফলে ব্যাংকগুলোর বছর শেষে শেয়ারপ্রতি খুব বেশি আয় হচ্ছে না। যে কারণে ব্যাংকগুলো খুব বেশি নগদ লভ্যাংশ দিতে পারছে না। এতে শেয়ারপ্রতি ১০ শতাংশ বা কিছুটা বেশি নগদ লভ্যাংশ দিলেও শেয়ারের দামের তুলনায় তা ১০ শতাংশ থেকে কম হচ্ছে। যেখানে অন্যান্য খাতের অনেক কোম্পানির শেয়ারের দামের বিপরীতে এই হার ১০ শতাংশের বেশি হয়। এদিকে ব্যাংকগুলোর শেয়ারের দামও খুব বেশি বৃদ্ধি পায় না। এ খাতের অধিকাংশ শেয়ারের দাম ৫০ টাকার নিচে এবং বর্তমানে বেশিরভাগ শেয়ার ফ্লোর প্রাইসে দিনের পর দিন আটকে থাকছে। কিন্তু এরপরও শেয়ারপ্রতি ১০ শতাংশ আয় করতে পারছেন না বিনিয়োগকারীরা। যদি এই খাতের শেয়ারে আয় ভালো হতো, তবে শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের চাহিদার সঙ্গে দামও বৃদ্ধি পেত। তাই খেলাপি ঋণ কমিয়ে এবং অনিয়ম দূর করে ব্যাংক খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরাতে হবে। তবে ব্যাংক খাতে তারল্য বৃদ্ধি পাবে এবং ব্যাংকের ব্যবসা ভালো হবে। সেই সঙ্গে বছর শেষে ভালো লভ্যাংশের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আয় বাড়বে বলে জানান তারা।
প্রসঙ্গত, বর্তমানে দেশের ব্যাংকগুলোর গড় সুদহার সাড়ে চার শতাংশেরও কম। তবে জুন শেষে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির তুলনায় সুদহার কম হওয়ায় প্রকৃতপক্ষে আমানতের মূল্য বছর শেষে কমে যাবে। তবে ইল্ড কম হওয়ায় কিছু ব্যাংকের শেয়ারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও স্বস্তি নেই বিনিয়োগকারীদের।
ডিভিডেন্ড ইল্ড নিয়ে ইয়াহু ফাইন্যান্সের ভাষ্যমতে, কোনো কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের আয়ের যে অংশ দেয় তা হলো লভ্যাংশ। এটি সাধারণত শেয়ারপ্রতি আয় প্রকাশ করে। তবে বিভিন্ন কোম্পানির লভ্যাংশের হারের মধ্যে তুলনায় ব্যবহার করা হয় ইয়েল্ড বা প্রকৃত মুনাফা। এক্ষেত্রে লভ্যাংশকে শেয়ার মূল্য দিয়ে ভাগ করে প্রকৃত মুনাফা নির্ণয় করা হয়।
ইয়েল্ডের গ্রহণযোগ্য কোনো হার না থাকলেও বাজারের অন্যান্য কোম্পানির সঙ্গে তুলনাকে গুরুত্ব দিচ্ছে ইয়াহু বিজনেস। তবে মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংক সুদের হারের চেয়ে বেশি ইয়েল্ডকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অকা/পুঁবা/সকাল, ২২ জুলাই, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 3 years আগে
