অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হবে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি জানিয়েছেন, কয়েক মাসের মধ্যে দৃশ্যমানভাবে জিনিসপত্রের দাম কমে আসবে, এমনটাই দেখতে পারবেন।
৫ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে নিজ দপ্তরে বায়িং হাউজের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
পাচারের অর্থ ফেরত আনতে টাস্কফোর্স গঠনের কথা বললেও এ নিয়ে বিশদ কিছু জানাননি অর্থ উপদেষ্টা। তবে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী সপ্তাহে এ টাস্কফোর্স গঠন করা হবে। এতে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), দুর্নীতি দমন কমিশন, অর্থ বিভাগ, এনবিআর, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ইত্যাদি সংস্থার প্রতিনিধিরা থাকবেন।
উপদেষ্টা বলেন, ‘আলু, পেঁয়াজের শুল্ক কমিয়ে দিয়েছি, এগুলো যাতে নিশ্চিত করে সেটার নির্দেশও দেয়া হয়েছে। এছাড়া মাছ, মাংস, ডিমের বিষয়ে কথা বলেছি, বাজার মনিটরিংয়ের কথা বলেছি।’ কতদিনের মধ্যে দাম কমার বিষয় দৃশ্যমান হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অলরেডি টাস্কফোর্স হচ্ছে তো।’
বায়িং হাউজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কী আলোচনা হয়েছে জানতে চাইলে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘তারা বলেছেন ডিরেক্টর ছাড়া বায়িং হাউজের মাধ্যমে অনেক সময় অর্ডার দেয়া হয়। রফতানির েেত্রও সহায়তা করে। এমন কিছু ব্যাপার রয়েছে। যেমন ইপিবির রেজিস্ট্রেশন, ব্যাংক, অর্ডারের বিষয়ে সমস্যা সমাধান করলে রফতানি বাড়বে। আমরা বলেছি রফতানি আরো বেড়ে ৫০ বিলিয়ন হবে, তারা বলেছেন ১০০ বিলিয়ন ছাড়িয়ে যাবে। আমি বলেছি এটা আমরা দেখব, যেটা ভালো হয় সেটা করব।’
এছাড়া সচিবালয়ে আজ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন সংস্থার প্রধানদের সঙ্গেও একটি বৈঠক করেন উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি ওই মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা। বৈঠকে তিনি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে আরো ডলার চাওয়া হবে। পাওয়া গেলে এ অর্থের যেন অপচয় না হয়, সেদিকে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।’
উপদেষ্টা বলেন, ‘দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞান গবেষণার আউটপুট কাজে না লাগলে উন্নয়ন অর্থবহ হবে না। গবেষণা ও গবেষণার প্রয়োগের ফলেই দেশের প্রাণী ও মৎস্যসম্পদের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে।’ এ সময় তিনি আরো বলেন, ‘মানুষ অনুভব করুক যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নামের একটি মন্ত্রণালয় আছে। শুধু রূপপুর (রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র প্রকল্প) দিয়ে মন্ত্রণালয়ের কাজ শেষ না। নিজেদের কাজ দিয়ে প্রমাণ করতে হবে।’
এর আগে ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে বাংলাদেশ থেকে ৪ হাজার ৯৬৫ কোটি ডলার পাচার হয়। বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ সোয়া ৪ লাখ কোটি টাকা।‘বিদ্যুত ও জ্বালানি খাতের বিশেষ আইন’ হিসেবে ২০১০ সালে বিদ্যুত ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি আইন পাস করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। আইনটি পরিচিত। ওই সময়ের পর এ আইনের আওতায় করা চুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুত ও জ্বালানি খাতের মেগা প্রকল্পসহ অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। চলমান রয়েছে আরো কয়েকটি। বর্তমানে এ আইনের আওতায় সম্পাদিত চুক্তিগুলো পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
এজন্য হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি জাতীয় কমিটি করা হয়েছে। এ নিয়ে ৫ সেপ্টেম্বর একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বিদ্যুত, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। পরে মন্ত্রণালয় থেকে এ-সংক্রান্ত একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিও পাঠানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরীকে জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। কমিটির অন্য চার সদস্য হলেন বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবদুল হাসিব চৌধুরী, কেপিএমজি বাংলাদেশের সাবেক সিওও আলী আশরাফ, বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন এবং ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের ফ্যাকাল্টি অব ল অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান।
কমিটির কার্যপরিধি সম্পর্কে মন্ত্রণালয়ের প থেকে বলা হয়েছে, জাতীয় কমিটি যেকোনো সূত্র থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় যেকোনো নথি নিরীা করতে পারবে। কমিটি সংশ্লিষ্ট যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে শুনানিতে আহ্বান করতে পারবে। বিদ্যুত ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি আইন ২০১০ (সংশোধিত ২০২১)-এর আওতায় এরই মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিগুলোয় সরকারের স্বার্থ সংরতি হয়েছে কিনা তা নিরীা করবে। এ নিরীার ভিত্তিতে পরবর্তী কার্যক্রমের বিষয়ে সুপারিশ প্রণয়ন করা হবে। কমিটিকে সাচিবিক ও আনুষঙ্গিক সহায়তা দেবে বিদ্যুত, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।
কমিটির এক সদস্য নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বলেন, ‘সবেমাত্র কমিটি হয়েছে। এখন কাজের পরিধির আওতায় কী কী থাকবে সেই বিষয় নিয়ে কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন। তখনই সরকারের দিক থেকে বিশেষ কোনো নির্দেশনা আছে কিনা, সেসব বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে। এখনই এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলা সম্ভব না।’
বিশেষ এ আইন প্রণয়নের সময় বলা হয়েছিল, দেশে বিদ্যুত ও জ্বালানি সংকট কাটাতে এটি করা হচ্ছে। যদিও সে সময় থেকেই আইনটি নিয়ে তীব্র সমালোচনা চলছে। দুই বছরের জন্য করা এ আইনের মেয়াদ তিন দফা বাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ২০২৬ সাল পর্যন্ত। এতে বিদ্যুত ও জ্বালানি খাতের কেনাকাটা ও অবকাঠামো নির্মাণে কোনো অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে আদালতে যাওয়ার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। যে কারণে এটিকে এ খাতের দায়মুক্তি আইন হিসেবে অভিহিত করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, এ আইনের আওতায় বিদ্যুত ও জ্বালানি খাতে অনেকগুলো অন্যায্য চুক্তি সম্পাদন হয়েছে, যার সুবিধা নিয়েছেন আওয়ামী লীগ সরকারসংশ্লিষ্ট ও মতাঘনিষ্ঠ অনেকেই। তারা বিপুল পরিমাণ অর্থ মুনাফা করলেও তিগ্রস্ত হয়েছে দেশের বিদ্যুত ও জ্বালানি খাত। যদিও আইনটির সুবাদে সংশ্লিষ্ট কাউকেই এতদিন জবাবদিহিতার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।
আইনটির আওতায় গৃহীত প্রকল্পগুলোর চুক্তি পর্যালোচনায় জাতীয় কমিটি গঠনকে স্বাগত জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্যমতে, এটি এখন সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। কারণ বিদ্যুত ও জ্বালানি খাতের এসব চুক্তিতে কী ছিল সেটি জানার অধিকার জনগণের রয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এসব চুক্তি পর্যালোচনার জন্য সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, সেটি অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। কারণ এটি না করলে আমরা আসলে বুঝতে পারছি না চুক্তিগুলোয় কী হয়েছে।’
বিদ্যুতের নীতি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন বিদ্যুত কেন্দ্র আছে ১৫২টি। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শাসনামলে নির্মাণ হয়েছে ১২৫টি। এগুলোর মধ্যে বিশেষ আইনের আওতায় নির্মাণ হয়েছে ৯১টি।
এ আইনের আওতায়ই ২০১০ সালের দিকে দেশে ব্যাপক মাত্রায় কুইক রেন্টাল বিদ্যুত কেন্দ্র অনুমোদন দেয়া হয়। তিন থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি এসব বিদ্যুত কেন্দ্র চালু রাখা হয় ১০ থেকে ১৫ বছর। এমনকি গত দেড় দশকে বেসরকারি খাতে এ আইনের আওতায় কোনো ধরনের প্রতিযোগিতা ছাড়াই বেসরকারি বিদ্যুত উদ্যোক্তাদের প্রকল্প দেয়া হয়েছে। এতে বিদ্যুতের উৎপাদন সমতা বাড়লেও বছরের পর বছর আর্থিকভাবে মারাত্মক তিগ্রস্ত হয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।
বিদ্যুত খাত নিয়ে ২০২২ সালের আগস্টে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এতে দেখানো হয়, বেসরকারি বিদ্যুত কেন্দ্রের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে উচ্চ মূল্যে বিদ্যুত কেনায় প্রতি বছর রাষ্ট্রের আর্থিক তি হয় প্রায় ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলার।
২০০৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ৫৮টি বেসরকারি বিদ্যুত কেন্দ্র থেকে কেনা বিদ্যুতের মূল্য পর্যালোচনার ভিত্তিতে ওই গবেষণায় আরো বলা হয়, কিছু বেসরকারি বিদ্যুত কেন্দ্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক চুক্তি না করায় বিদ্যুত খাতে ব্যয় বেড়েছে বিপুল পরিমাণে। এসব বিদ্যুত কেন্দ্রকে ভর্তুকি হিসেবে শুধু সরকারি জমি ইজারা দেয়ার কারণেই বিদ্যুতের দাম ১৫ শতাংশ বেড়ে যায় বলে উল্লেখ করা হয়। ব্যয়বহুল রেন্টাল বিদ্যুত কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে সরকারের চুক্তি অনুযায়ী তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনের আদেশ না থাকলেও ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে উৎপাদন সমতার ৬০ শতাংশ ধরে পরিশোধ করতে হয়। ক্যাপাসিটি চার্জের সুবিধা থাকায় বিদ্যুত উৎপাদন না করলেই বরং তাদের মুনাফা বেশি হয়।
জ্বালানি খাতে বিশেষ আইনের আওতায় বিভিন্ন সময় এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ, গ্যাসের কূপ খনন, পাইপলাইন নির্মাণ, যন্ত্রাংশ ক্রয়সহ বিভিন্ন প্রকল্প নেয়া হয়েছে। তবে এর মোট সংখ্যা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য জানা যায়নি। এর মধ্যে গ্যাস কূপ খননের প্রকল্প আছে ৪৬টি। অভিযোগ আছে, এসব প্রকল্পে চীন-রাশিয়ার বিভিন্ন কোম্পানিকে উচ্চ দামে গ্যাসকূপ খননের কাজ দেয়া হয়েছে।
১৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার মতায় এসে বিদ্যুত ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি বিশেষ বিধান স্থগিত করে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন ৩৪ (ক) বিলুপ্ত করে অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এর মধ্য দিয়ে গণশুনানির মাধ্যমে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের মতা ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। ●
অকা/আখা/বিকাল/ফর/৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 1 year আগে
