অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা, বাজার সংকোচন ও বহুবিধ চ্যালেঞ্জের মধ্যেও তৈরি পোশাক রফতানিতে একক দেশ হিসেবে দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। গত বছর বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের এই অবস্থান অক্ষুণ্ন থাকলেও বাজারের আকার সামান্য সংকুচিত হয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO) প্রকাশিত সর্বশেষ এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
‘World Trade Statistics: Key Insights and Trends in 2024’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০২৩ সালে বৈশ্বিক পণ্য ও সেবা বাণিজ্য ৪ শতাংশ বেড়ে ৩১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। এই বিশাল বাণিজ্য প্রবাহের মধ্যে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানির পরিমাণ ছিল ৩৮ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় মাত্র ০.২১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে। ফলে টানা দুই বছর ধরে—২০২৩ ও ২০২৪ সালে—বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি আয় ৩৮ বিলিয়ন ডলারের ঘরেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
বিশ্ববাজারে শীর্ষ তিনটি দেশের মধ্যে প্রথম অবস্থানে রয়েছে চীন, দ্বিতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ এবং তৃতীয় অবস্থানে ভিয়েতনাম। যদিও রফতানির পরিমাণ স্থিতিশীল থাকলেও বাংলাদেশের বাজার হিস্যা (মার্কেট শেয়ার) কিছুটা কমেছে। ২০২২ সালে যেখানে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানির বিশ্ব বাজার হিস্যা ছিল ৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ, ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৯০ শতাংশে।
বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে মন্দা পরিস্থিতি, অন্যদিকে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি এবং ভোক্তাদের ব্যয় সংকোচনের কারণে পোশাকের মতো অপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের চাহিদা কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ অন্যান্য রফতানিকারক দেশগুলোর ওপর। পাশাপাশি কিছু ক্রেতা কোম্পানির বাংলাদেশ থেকে রফতানি হ্রাস, কাঁচামাল আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি, ও অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত জটিলতার কথাও উঠে এসেছে বাজার শেয়ার কমার অন্যতম কারণ হিসেবে।
তবে চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের এই অবস্থান ধরে রাখাটা রফতানি খাতের সক্ষমতা এবং প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থাপনারই প্রতিফলন বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ও শিল্প সংশ্লিষ্টরা। অনেকেই মনে করেন, শ্রমনির্ভর উৎপাদন কাঠামো, বৈচিত্র্যময় ক্রেতা ভিত্তি, ও দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কই বাংলাদেশের রফতানি সক্ষমতা ধরে রাখার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।
তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের মোট পণ্য রফতানির প্রায় ৮২ শতাংশ জোগান দেয় এবং দেশের প্রায় ৪০ লাখেরও বেশি মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে। তাই বিশ্ববাজারে এই খাতের অবস্থান শুধু বৈদেশিক আয়ের প্রশ্ন নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান অবস্থান ধরে রাখতে হলে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, পরিবেশবান্ধব কারখানার বিস্তার, এবং উচ্চমূল্যের পোশাকের দিকে ধাবিত হওয়া জরুরি। পাশাপাশি নতুন বাজারে প্রবেশ এবং বিদ্যমান বাজারে পণ্যের বৈচিত্র্য আনা এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ভর করছে বহুবিধ কৌশলগত সিদ্ধান্তের ওপর। আগামী বছরগুলোতে বাজার শেয়ারে ঘাটতি পুষিয়ে নিতে হলে রফতানি নীতি, অবকাঠামো, এবং শ্রম দক্ষতায় ব্যাপক সংস্কার দরকার—এমন অভিমতও উঠে আসছে বিভিন্ন মহল থেকে। ●
অকা/তৈপোশি/ই/সকাল/১০ জুলাই, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 8 months আগে

