অর্থকাগজ প্রতিবেদন

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় অসঙ্গতির কারণে দেশের নিত্যপণ্যের বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, ডিম থেকে শুরু করে মাছ-মাংস ও সবজি—প্রায় সব পণ্যের দামই ঊর্ধ্বমুখী। এতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি, আর দরিদ্র জনগোষ্ঠী দৈনন্দিন খাদ্য জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছে।

সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, এক সপ্তাহের ব্যবধানে চালের দাম কেজিপ্রতি প্রায় ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মোটা চাল (স্বর্ণা) ৫৫–৬০ টাকায়, মাঝারি দানার পাইজাম ৬০–৬৮ টাকায় এবং মিনিকেট চাল প্রায় ৮৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের মতে, জ্বালানির খরচ বাড়লেও বাস্তবে চালের উৎপাদন ব্যয় যে পরিমাণ বাড়ার কথা, তার চেয়ে বেশি হারে বাজারে দাম সমন্বয় করা হয়েছে।

একই প্রবণতা ডালের বাজারেও স্পষ্ট—প্রতি কেজি ডালের দাম ১৬০ টাকার ঘরে পৌঁছেছে। ডিমের দামও বেড়ে ডজনপ্রতি ১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা সপ্তাহখানেক আগেও ১২০ টাকার মধ্যে ছিল।

ভোজ্যতেলের বাজারে পরিস্থিতি আরও জটিল। বোতলজাত সয়াবিন তেল বাজারে প্রায় অনুপস্থিত, ফলে খোলা তেলের দাম বেড়ে লিটারপ্রতি প্রায় ২১০ টাকায় উঠেছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন, বাজারে হাতে গোনা কয়েকটি বড় কোম্পানির আধিপত্য থাকায় সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তারা দাম বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করছে।

সবজির বাজারেও দাম অস্বাভাবিকভাবে চড়া। অধিকাংশ সবজি ৮০–১০০ টাকার ওপরে বিক্রি হচ্ছে। মাছ ও মাংসের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে—ব্রয়লার মুরগি ১৮০ টাকা, সোনালি মুরগি ৩৬০ টাকা, গরুর মাংস ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। মাছের বাজারে পাঙাশ, রুইসহ বিভিন্ন প্রজাতির দাম কেজিপ্রতি ১০–৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ চেইনের বিভিন্ন স্তরে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণই এই মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ। উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পণ্য একাধিক ধাপে হাতবদল হয়, এবং এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই শক্তিশালী গোষ্ঠীগুলো অতিরিক্ত মুনাফা আদায় করে। ফলে বাজারে একটি অঘোষিত সিন্ডিকেটের প্রভাব তৈরি হয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরেই ভাঙা সম্ভব হয়নি।

অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ, বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হলে প্রথমেই এই প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোকে শনাক্ত করতে হবে। আমদানি, উৎপাদন ও বিপণনের প্রতিটি স্তরে খরচ ও মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। শুধু খুচরা পর্যায়ে অভিযান চালিয়ে বা জরিমানা করে স্থায়ী সমাধান আসবে না; বরং বড় পর্যায়ের অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণে নানা উদ্যোগের কথা বললেও বাস্তবে তার প্রতিফলন এখনও দৃশ্যমান নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, নীতিগত সংস্কার, সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং শক্তিশালী তদারকি নিশ্চিত করা না গেলে বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরানো কঠিন হবে।

সর্বশেষ হালনাগাদ 8 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version