চৌধুরী মো. শাহেদ

বীমা খাতে প্রধান নির্বাহী পদে দায়িত্ব পালনকারী একাধিক কর্মকর্তার শিক্ষা সনদ জাল ও ভূয়া বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো জানিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বীমা খাতের নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) শিক্ষা সনদ যাচাই করতে গিয়ে তারা তা জাল ও ভূয়া প্রমাণ পেয়েছে। দীর্ঘ সময় বীমা পেশা নিয়েজিত বর্তমানে সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেনের স্নাতকোত্তর শিক্ষা সনদ বিতর্কিত। ব্যবস্থাপনা না বিপনন বিষয়ে তিনি স্নাতকোত্তর পাশ করেছেন তা নিয়ে আছে সংশয়। তাছাড়া উপস্থাপিত তার জীবন বৃত্তান্তে দারুল ইনসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পাশের সাময়িক শিক্ষা সনদের প্রাপ্ত নম্বরে রয়েছে গোঁজামিল! জীবন বৃত্তান্তে উল্লেখ আছে প্রাপ্ত নম্বর সিজিপিএ ৩.৬০, অথচ স্নাতকোত্তর শিক্ষা সনদে প্রাপ্ত নম্বর তার সিজিপিএ ৩.৭৬, সত্যায়নের তারিখ ২০২০ সালের ১৪ জানুয়ারি। তার ওপর পুনঃসত্যায়ন। তাহলো চলতি বছরের ২ এপ্রিলের।
সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেনের স্নাতকোত্তর শিক্ষা সনদে সৃষ্ট এ সমস্যায় সংশয় প্রকাশ করেছে আইডিআরএ। গত ২৫ মে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এর পক্ষ থেকে পরিচালক (উপসচিব) মোহাঃ আব্দুল মজিদ দারুল ইনসান বিশ্ববিদ্যালয়কে এক পত্রে মো. জাকির হোসেনের এমবিএ পাশ সনদ সঠিক/বৈধ এবং সে প্রতিষ্ঠান থেকে দেয়া হয়েছে কিনা তা যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছেন।
সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন এ প্রসঙ্গে অর্থকাগজকে জানান, তার সনদ সঠিক। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ তা যাচাই করে সঠিক তথ্য পেয়েছে বলে তিনি আইডিআরএ’র সংশ্লিষ্ট শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে জেনেছেন। বিষয়টি সম্পূর্ণ আপনার ব্যক্তিগত, তা নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান জানাল না কেন এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন আইডিআরএ তা জানে। অর্থকাগজ জানে কিনা উল্টো প্রশ্ন করেন তিনি। তিনি বলেন, দারুল ইনসান বিশ^বিদ্যালয় এর সনদ ভূয়া হতে পারে না। তখন তাকে সবিনয়ে বলা হয় যদি সনদ সঠিক হতো, তা হলে দারুল ইনসান বিশ্ববিদ্যালয় দেয়া অতি সম্প্রতি ডেল্টা লাইফ ইনসিওরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর প্রস্তাবিত মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার আবেদন নাকচ হতো না! এরপর তিনি বলেন, শুনেছি দারুল ইনসান বিশ্ববিদ্যালয় এ কিছু কিছু সনদ কেনাবেচা হয়!
তিনি বায়রা ও ফারইস্ট ইসলামী লাইফের গ্রাহকরা দাবী না টাকা পাচ্ছে না বিষয়টি তুলে বলেন, গ্রাহকরা যদি জানতো এসব কোম্পানি থেকে টাকা পাবে না, তাহলে এসব কোম্পানিতে বীমা করতেন না। গ্রাহককে এ জন্য দোষ দেয়া যায় না। তেমনি আমাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। ২০১২ সালে যদি জানতাম আমার সনদ প্রশ্নবিদ্ধ হবে, তাহলে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতাম!
সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেনের সন্দেহজনক সনদের ব্যাপারে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এর মুখপাত্র পরিচালক (উপসচিব) মো. জাহাঙ্গীর আলম অর্থকাগজকে জানান, দারুল ইনসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এখনও কোন তথ্য পাননি তারা। উত্তর পেলে তো যার বিষয় তিনি জানবেন এটাই স্বাভাবিক।
১৯৯২ সালের ৫ জুন বীমা নির্বাহী মো. জাকির হোসেন সন্ধানী লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড থেকে জীবন বীমা পেশা শুরু করেন। সে সময়কার সন্ধানী লাইফের ব্যবস্থাপনাা পরিচালক ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও অঞ্চলের মানুষ জাহিদুল আবেদিনের স্নেহভাজন হওয়ায় মো. জাকির হোসেন শুধু এইচ.এস.সি. পাশের সনদ জমা দিয়েই এজেন্সী ম্যানেজার পদের চাকরিতে প্রবেশ করেন। অকৃতজ্ঞ মো. জাকির হোসেন পরে তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। বীমা পাড়ায় জনশ্রুতি আছে মো. জাকির হোসেনের অনিয়ম ও দুর্বিনীত ব্যবহারের কারণেও এমডি জাহিদুল আবেদিনের মৃত্যু ত্বরান্বিত হয়! সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা রশিদ আহমেদকে তিনি শান্তিতে কাজ করতে দেননি। চেয়ারম্যান স্ত্রীর ধর্মপুত্র বলে কথিত ছিলেন মো. জাকির হোসেন! অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে তিনি তখন এমডি রশিদ আহমেদের ওপর ছড়ি ঘোরাতেন। নানা অনিয়ম করতেন! সে বিষয়ে একাধিক প্রতিবেদন অর্থকাগজ এর ছাপা সংস্করণে প্রকাশিত হয়। দীর্ঘ সময় সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্সে তিনি মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ এবং প্রত্যাশিত ব্যবসায়ের ব্যর্থতার দায় মাথায় নিয়ে এ কোম্পানি থেকে বিদায় হন। পরে চতুর্থ প্রজন্মের কোম্পানি স্বদেশ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এ মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু বেশিদিন এখানে থাকতে পারেননি তিনি। পুনরায় কিছুদিন আগে তিনি যোগ দিয়েছেন সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এ। তিনি নিজেও স্বীকার করলেন কোম্পানির দুরাবস্থার কথা। কোম্পানির দায়দেনার পরিমাণ অনেক। দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকদের দাবী, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও অন্যান্যের পাওনা পরিশোধ করতে ব্যর্থ সানফ্লাওয়ার লাইফ। কোম্পানির নতুন ব্যবসাও খুব একটা নেই!
১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ ডিসেম্বর তৃতীয় প্রজন্মের জীবন বীমা কোম্পানি সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে। ব্যাপক অনিয়মের কারণে ২৪ বছরেও কোম্পানিটি পুঁজি বাজারে যেতে সক্ষম হয়নি।
অকা/বীখা/সন্ধ্যা, ১৭ জুন, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 3 years আগে

Leave A Reply

Exit mobile version