অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●

দেশে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী ধারা আবারও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। টানা তিন মাস ধরে বাড়তে বাড়তে চলতি বছরের জানুয়ারিতে সাধারণ মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৮.৫৮ শতাংশে, যা গত বছরের মে মাসের পর সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যে এই চিত্র উঠে এসেছে।

বিবিএসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.১৭ শতাংশ। এরপর নভেম্বর মাসে তা বেড়ে হয় ৮.২৯ শতাংশ এবং ডিসেম্বরে দাঁড়ায় ৮.৪৯ শতাংশে। সেই ধারাবাহিকতায় জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে ৮.৫৮ শতাংশে পৌঁছেছে। যদিও এক বছর আগে, অর্থাৎ ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতির হার ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি—৯.৯৪ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাজারে নগদ অর্থের প্রবাহ বেড়ে যাওয়াই মূল্যস্ফীতির এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার প্রধান কারণ।

খাদ্য বনাম খাদ্যবহির্ভূত মূল্যচাপ

সর্বশেষ তথ্যে দেখা যাচ্ছে, জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে খাদ্যপণ্যের দাম। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.২৯ শতাংশে, যেখানে আগের মাস ডিসেম্বরে তা ছিল ৭.৭১ শতাংশ। তবে এক বছর আগে, অর্থাৎ ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ছিল আরও বেশি—১০.৭২ শতাংশ।

অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে। জানুয়ারিতে নন-ফুড মূল্যস্ফীতি নেমে এসেছে ৮.৮১ শতাংশে, যা ডিসেম্বরে ছিল ৯.১৩ শতাংশ। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এই হার ছিল ৯.৩২ শতাংশ।

বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা বড় চ্যালেঞ্জ

ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইএনএম)-এর নির্বাহী পরিচালক মোস্তফা কে. মুজেরির মতে, মূল্যস্ফীতি কমাতে নেওয়া নীতিগত উদ্যোগগুলোর কার্যকর ফল এখনো দৃশ্যমান নয়। তিনি বলেন, সামনে নির্বাচন থাকায় সরকারি নির্বাচনি ব্যয়, প্রার্থীদের প্রচারণা ব্যয় এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ মিলিয়ে বাজারে নগদ অর্থের সরবরাহ বেড়েছে। এতে সামগ্রিক চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার চাপ পড়ছে বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের বাজারে।

তবে চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ ব্যবস্থা ও বিপণন কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। ফলে কৃষক ন্যায্য দাম না পেলেও ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম কমছে না। তাঁর মতে, এই মধ্যস্বত্বভোগী নির্ভর বাজার কাঠামোর সংস্কার ছাড়া খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।

রমজান সামনে থাকায় খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। কিছু পণ্যে শুল্ক কমানো হলেও বাস্তবে বাজারে তার প্রভাব তেমনভাবে পড়েনি। মোস্তফা কে. মুজেরির মতে, শুধু নীতিসুদ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; বাজার ব্যবস্থাপনা, আমদানি নীতি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলায় কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। নতুন সরকারের উচিত উৎপাদন বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাজার তদারকি জোরদার করা—না হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাবে।

গ্রাম ও শহর—দুই জায়গাতেই চাপ

বিবিএসের তথ্যে দেখা যায়, জানুয়ারিতে গ্রামীণ এলাকায় সাধারণ মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৮.৬৩ শতাংশ, যা ডিসেম্বরে ছিল ৮.৪৮ শতাংশ। এক বছর আগে গ্রামে এই হার ছিল ১০.১৮ শতাংশ। গ্রামীণ এলাকায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.১৮ শতাংশে এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯.০৪ শতাংশ।

শহরাঞ্চলেও পরিস্থিতি খুব একটা আলাদা নয়। জানুয়ারিতে শহরে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৫৭ শতাংশ, যা ডিসেম্বরে ছিল ৮.৫৫ শতাংশ। শহরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৮.৬১ শতাংশ, তবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮.৫৪ শতাংশে নেমেছে।

মজুরি বাড়লেও প্রকৃত আয় কমছে

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মজুরি বৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৮.০৮ শতাংশে, যা আগের মাসের তুলনায় সামান্য বেশি। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, টানা ৪৮ মাস ধরে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির নিচে অবস্থান করছে। খাতভিত্তিক হিসাবে কৃষিতে মজুরি বেড়েছে ৮.১২ শতাংশ, শিল্পে ৭.৯৮ শতাংশ এবং সেবা খাতে ৮.২৪ শতাংশ।

মোস্তফা কে. মুজেরির মতে, দীর্ঘদিন ধরে মজুরি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল না মেলায় শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের গতি মন্থর থাকায় শ্রমের চাহিদা বাড়ছে না, ফলে মজুরি বৃদ্ধিও সীমিত থাকছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে নিম্ন ও স্থির আয়ের মানুষের ওপর, যাদের ভোগক্ষমতা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

সামগ্রিক চিত্রে কী বলছেন অর্থনীতিবিদরা

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি এখনো খাদ্য মূল্যস্ফীতি। যদিও খাদ্যবহির্ভূত খাতে বড় ধরনের লাফ দেখা যায়নি, তবে হাউজিং, গ্যাস, বিনোদন ও সংস্কৃতি এবং অন্যান্য বিবিধ খাতে মূল্যচাপ স্পষ্ট।

তিনি জানান, জানুয়ারিতে এলপিজি ও গ্যাস সংকট সরবরাহ ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে নির্বাচনী ব্যয়ের কারণে চাহিদাপক্ষ থেকেও মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে। তবে ইতিবাচক দিক হলো, এ সময় বিনিময় হার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল এবং সরকারি ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়েনি।

ড. জাহিদ হোসেনের মতে, যেহেতু মূল্যস্ফীতি কমার সুস্পষ্ট সংকেত এখনো পাওয়া যাচ্ছে না, তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত নীতিসুদ বর্তমান অবস্থানে ধরে রাখা এবং বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার কৌশল অব্যাহত রাখা।

অকা/প্র/ই/সকাল/৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 22 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version