অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
দেশের পুঁজি বাজারে ইতিবাচক প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২৩ জুলাই এ বছরের সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছেছে প্রধান পুঁজি বাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) লেনদেন ও সূচক। ৯৩ দশমিক ৩৭ পয়েন্ট উন্নতির ফলে ২৩ জুলাই দিনশেষে পুঁজি বাজারটির প্রধান সূচক ডিএসইএক্স পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৩৬৩ দশমিক ৯৪ পয়েন্টে। এটি চলতি বছরের মধ্যে সূচকটির সর্বোচ্চ অবস্থান। এর আগে ২৫ ফেব্রুয়ারির ৫ হাজার ২৬৭ দশমিক ৮৮ পয়েন্ট ছিল সূচকটির সর্বোচ্চ উন্নতির রেকর্ড। তবে এক দিনে সূচকের সর্বোচ্চ উন্নতির রেকর্ডটি ছিল ৮ মে। ওই দিন ডিএসইর প্রধান সূচকটির উন্নতি রেকর্ড করা হয় ৯৯ পয়েন্টের বেশি।
অপর দিকে, ২৩ জুলাই লেনদেনেও চলতি বছরের সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছে যায় ঢাকা শেয়ার বাজার। ২৩ জুলাই ৯৮৬ কোটি টাকা লেনদেন নিষ্পত্তি করে ডিএসই যা আগের দিন অপেক্ষা ২৬৪ কোটি টাকা বেশি। ২০২৫ সালে আর এ পর্যায়ে পৌঁছেনি ডিএসইর লেনদেন।
সূচক ও লেনদেনের এ উন্নতিকে স্বাভাবিক বলে মনে করছেন পুঁজি বাজার বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, দীর্ঘ পতনের ফলে পুঁজি বাজার যে অবস্থানে পৌঁছে গিয়েছিল সেখান থেকে গত কিছু দিন ধরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। আর এবারের পুঁজি বাজারের ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ভালো কোম্পানি ও শেয়ারের দিকে বিনিয়োগকারীদের ঝোঁক। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট পুঁজি বাজার বিশ্লেষক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, এবার যে বিষয়টি দেখা যাচ্ছে তা হচ্ছে ভালো শেয়ারে বিনিয়োগ বাড়তে শুরু করেছে। আগে বিভিন্ন সময় নানা ধরনের গুজবে প্রভাবিত হয়ে মৌলভিত্তিহীন শেয়ারে বিনিয়োগ করতেন। এর ফলে বাজার যখন সংশোধনে যেত তখন এসব শেয়ার তাদের বিনিয়োগ ফিরিয়ে দিতে ব্যর্থ হতো। ফলে লোকসান গুনতে হতো বিনিয়োগকারীদের।
তিনি অরো বলেন, বাজারে ভালো শেয়ারের সরবরাহ কম। তাই সামান্য দর বাড়লেই মনে হয় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। কিন্তু যতক্ষণ ভালো শেয়ারে বিনিয়োগ করা হবে ততক্ষণ ঝুঁকির কোনো আশঙ্কা নেই। তার মতে, এখন বাজারে যে টার্নওভার তার মধ্যেও রয়েছে স্বচ্ছতা। এটি বিনিয়োগকারীদের স্বতঃস্ফূর্ত বিনিয়োগ এবং একই সাথে তাদের আস্থার বহিঃপ্রকাশ। তবে, তিনি বিনিয়োগকারীদের ভালো শেয়ারে বিনিয়োগের পরামর্শ দেন এবং মৌলভিত্তিহীন কোম্পানিতে বিনিয়োগে সতর্ক করেন।
পূবালী ব্যাংক সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী আহসান উল্যাহ মনে করেন, এখনো বাজারের মূল্যস্তর অনেক নিচে। তিনি বলেন, ডিএসই সূচক যখন ৪ হাজার ৬০০ পয়েন্টের ঘরে নেমে আসে তখন বিনিয়োগকারীদের পুঁজির ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ লোকসানের মধ্যে ছিল। গত এক মাসের মধ্যে এ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে শুরু করেছে। হারানো পুঁজি ফিরে পাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। এভাবে সূচকের যেমন আরো উন্নতি ঘটা স্বাভাবিক, তেমনি লেনদেনেরও আরো উন্নতি ঘটবে। সূচক ৬ হাজারের ঘরে পৌঁছার আগে বাজারে খুব বেশি ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা নেই। তবে তিনিও মনে করেন, বিনিয়োগকারীদের উচিত নিজের কষ্টার্জিত পুঁজি বিনিয়োগে সতর্ক থাকা। কারণ, বাজার যেমন বাড়ছে তেমনি সংশোধনের বিষয়ও মাথায় রাখতে হবে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২৩ জুলাই ৯৩ দশমিক ৩৭ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। ৫ হাজার ২৭০ দশমিক ৫৭ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি ২৩ জুলাই বেলা সাড়ে ১১টায় পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৩৭০ পয়েন্টে। এ পর্যায়ে সূচকের ১০০ পয়েন্ট উন্নতি রেকর্ড করা হয়। তবে এ পর্যায়ে বাজারে সাময়িক বিক্রয়চাপ তৈরি হলে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সূচকটি নেমে আসে ৫ হাজার ৩৩২ পয়েন্টে। বেলা ১টার দিকে ফের ঊর্ধ্বমুখী হয় বাজার সূচক। এ সময় লেনদেনেও নতুন করে গতি ফিরে। এভাবে দিনশেষে সূচকটি ৫ হাজার ৩৬৩ দশমিক ৯৪ পয়েন্টে স্থির হয়। ডিএসইর অন্য দুই সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ এ সময় যথাক্রমে ৫৬ দশমিক ৩১ ও ১৬ দশমিক ৮০ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়।
দেশের দ্বিতীয় পুুঁজি বাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) সব ক’টি সূচকের বড় ধরনের উন্নতি ঘটে ২৩ জুলাই। এখানে সিএসই সার্বিক সূচক ২৫০ দশমিক ৭৯ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। বাজারটির অন্য দু’টি সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ২৮৫ দশমিক ৪০ ও ১৬৫ দশমিক ৮০ পয়েন্ট।
২৩ জুলাই দুই পুঁজি বাজার আচরণ বিশ্লেষণে দেখা যায় লেনদেন ও সূচকের উন্নতির পেছনে বড় অবদান ছিল ব্যাংক , বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের। ২৩ জুলাই দুই বাজারেই লেনদেনও মূল্যবৃদ্ধিতে এ তিন খাতের কোম্পানিগুলো এগিয়ে ছিল। সবচেয়ে বেশি ছিল ব্যাংকিং খাত। সূচকের বড় ধরনের উন্নতির কারণও ছিল ব্যাংকগুলোর মূল্যবৃদ্ধি। ২৩ জুলাই এ খাতের ৩৬টি কোম্পানির মধ্যে দাম বাড়ে ৩৪টির।
ব্যাংক ছাড়াও মৌলভিত্তিসম্পন্ন অন্যান্য কোম্পানিগুলোও বিনিয়োগকারীদের পছন্দের শীর্ষে ছিল ২৩ জুলাই। দিনের লেনদেনে হঠাৎ বহুজাতিক কোম্পানি ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানির উঠে আসা তারই ইঙ্গিত দেয়। এ ছাড়া ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ দশে উঠে আসা অন্যান্য কোম্পানির মধ্যে আরো ছিল ব্যাংকিং খাতের সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, ব্র্যাক ব্যাংক, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, গ্রামীণফোন ও উত্তরা ব্যাংকের মতো মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলো।
মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ কোম্পানির তালিকায়ও ছিল ব্যাংকিং খাতেরই প্রাধান্য। ২৩ জুলাই এ তালিকায় জায়গা করে নেয় ব্যাংক এশিয়া, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, তিতাস গ্যাস ও আইপিডিসি যার বেশির ভাগই এখনো অপেক্ষাকৃত কম মূল্যস্তরে রয়েছে। ●
অকা/পুঁবা/ফর/সন্ধ্যা/২৪ জুলাই, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 7 months আগে
