অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
শেয়ার বাজার সংস্কার টাস্কফোর্সের সুপারিশ অনুযায়ী, প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও)-এর বরাদ্দনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। সর্বশেষ সংশোধনী অনুযায়ী, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য আইপিও শেয়ারের বরাদ্দ ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬০ শতাংশ করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাবে এবং বাজারে তাদের আস্থা আরো সুদৃঢ় হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একইসঙ্গে, যোগ্য বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য বরাদ্দ ১০ শতাংশ কমিয়ে ৪০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের ভারসাম্য রক্ষা পাবে এবং শেয়ার বাজারের স্বচ্ছতা ও বৈচিত্র্য আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
টাস্কফোর্স বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)-এর কাছে এই সংশোধিত প্রস্তাব জমা দিয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের মার্চ মাসে প্রস্তাবিত খসড়া প্রকাশ করা হয়, যেখানে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কোটা ৫০ শতাংশ ছিল। জনমত যাচাইয়ের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সংশোধনী প্রস্তুত করা হয় এবং তা বিএসইসির অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।
টাস্কফোর্সের এক সদস্য জানান, “প্রথমে আমরা সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য সমান বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব দিয়েছিলাম, যাতে খুচরা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি হ্রাস পায় এবং প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণও জোরদার হয়। তবে, ৬০০ জনের বেশি বিনিয়োগকারীর প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে দেখা যায়, অধিকাংশ সাধারণ বিনিয়োগকারী তাদের জন্য বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “বেশ কিছু উত্তরদাতা চমকপ্রদভাবে অনুরোধ করেছেন যে আগামী তিন বছর যেন নতুন কোনো আইপিও অনুমোদন না দেওয়া হয়। কেউ কেউ এমনকি পরামর্শ দিয়েছেন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ৭,০০০ পয়েন্টে না পৌঁছানো পর্যন্ত আইপিও স্থগিত রাখা হোক। যদিও এসব প্রস্তাব আইনি কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, তবুও এতে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ ও আগ্রহের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।”
বিএসইসি সূত্র জানায়, অতীতে বিভিন্ন সময়ে আইপিও বরাদ্দনীতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। খায়রুল হোসেনের নেতৃত্বাধীন কমিশনে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য বরাদ্দ ৩০ শতাংশ এবং প্রাতিষ্ঠানিকদের জন্য ৭০ শতাংশ ছিল। পরে শিবলী রুবাইয়াতের নেতৃত্বে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কোটা বাড়িয়ে ৭৫ শতাংশ করা হয়, যার ফলে কিছু আইপিও, যেমন মিডল্যান্ড ব্যাংকের, পাবলিক ক্যাটাগরিতে আন্ডারসাবস্ক্রাইব হয় এবং আন্ডাররাইটারদের দ্বারা তা পূরণ করতে হয়। টাস্কফোর্সের সুপারিশে আইপিও প্রক্রিয়া উন্নত করার লক্ষ্যে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন প্রস্তাব করা হয়েছে:
-
বিডিং সীমার পরিবর্তন: বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের জন্য বিডিং সীমা ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হবে, যাতে অধিক সংখ্যক বিনিয়োগকারী অংশ নিতে পারেন।
-
তালিকাভুক্তির পর নিয়ন্ত্রণ: আইপিওর পর প্রথম তিন দিনে ১০ শতাংশ সার্কিট ব্রেকার প্রযোজ্য হবে না, যাতে শেয়ারের মূল্য অস্বাভাবিক ওঠানামা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
-
কাট-অফ মূল্যে ছাড় না দেওয়ার সিদ্ধান্ত: ইস্যুকারী কোম্পানিগুলোর ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে কাট-অফ মূল্যে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
-
নিম্ন বিনিয়োগ বাধ্যবাধকতা অপসারণ: বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে আইপিও আবেদনের জন্য ৫০ হাজার টাকার ন্যূনতম বিনিয়োগের বাধ্যবাধকতা বাতিল করা হবে।
-
সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ: ১,০০০ কোটি টাকার বেশি টার্নওভারবিশিষ্ট বহুজাতিক কোম্পানি ও বৃহৎ কর্পোরেশনগুলোর জন্য সরাসরি তালিকাভুক্তির অনুমতি দেওয়া হবে। এতে তাদের শেয়ার অফলোডের বাধ্যবাধকতা ১০ শতাংশ হ্রাস পাবে, যা বাজারে লিকুইডিটি বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
-
ঋণগ্রস্ত কোম্পানির তালিকাভুক্তি বাধ্যতামূলক: ১,০০০ কোটি টাকার বেশি ঋণগ্রস্ত বৃহৎ কর্পোরেশনগুলোকে তালিকাভুক্ত করার নির্দেশনা দেওয়া হবে, যাতে বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ে।
-
আইপিওর ন্যূনতম মূলধন বৃদ্ধি: স্থির মূল্যের প্রস্তাবের ক্ষেত্রে ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ৩০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ কোটি টাকা করা হবে। বুক বিল্ডিং পদ্ধতির ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে।
এই প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো দেশের পুঁজি বাজারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা, এবং বাজারে পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এসব সংস্কার বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনবে এবং গুণগত মানসম্পন্ন কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ বাড়িয়ে বাজারকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করে তুলবে বলে আশা করা হচ্ছে। ●
অকা/পুঁবা/ই/সকাল/২১ মে,২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 9 months আগে

