অর্থকাগজ প্রতিবেদন
নির্মাণসামগ্রীর লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাবে দেশের আবাসন খাত দীর্ঘমেয়াদি মন্দার মুখে পড়েছে। ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা ও বিনিয়োগ-আস্থা কমে যাওয়ার পাশাপাশি নির্মাণ ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় নতুন ফ্ল্যাটের চাহিদা কমছে, স্থবির হয়ে পড়ছে নির্মাণকাজ এবং কমে যাচ্ছে নতুন প্রকল্পের সংখ্যা। এর প্রভাব এখন সরকারি নিবন্ধন তথ্যেও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।
নিবন্ধন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সারাদেশে মাত্র ৪১ হাজার ৮০৪টি ফ্ল্যাটের দলিল নিবন্ধিত হয়েছে। এসব ফ্ল্যাটের ঘোষিত মূল্য প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকাতেই নিবন্ধিত হয়েছে ২৯ হাজার ৯১৩টি ফ্ল্যাট, যা মোট নিবন্ধনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের প্রথমার্ধের তুলনায় চলতি বছরের একই সময়ে ফ্ল্যাট নিবন্ধন কমেছে ১৯ দশমিক ৬১ শতাংশ। ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় এই পতনের হার ২৫ দশমিক ৩৫ শতাংশ এবং ২০২৩ সালের তুলনায় ৪২ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে আবাসন বাজারের লেনদেন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
বার্ষিক তথ্যও একই চিত্র তুলে ধরে। ২০২৩ সালে সারাদেশে প্রায় ১ লাখ ৪৬ হাজার ফ্ল্যাট নিবন্ধিত হয়েছিল, যার ঘোষিত মূল্য ছিল প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে নিবন্ধনের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ১২ হাজারে, আর ঘোষিত মূল্য নেমে আসে প্রায় ৭৯ হাজার কোটি টাকায়। ২০২৫ সালে নিবন্ধন আরও কমে ১ লাখ ৪ হাজারে নেমে আসে। ফলে সম্পত্তি নিবন্ধন খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয়েও উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি হয়েছে।
আবাসন খাতের এই স্থবিরতা শুধু ফ্ল্যাট বিক্রির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; নতুন প্রকল্প গ্রহণের গতিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। যৌথ উন্নয়ন (জয়েন্ট ভেঞ্চার) চুক্তির সংখ্যা কমছে, আবার অনেক ক্ষেত্রে আর্থিক অযোগ্যতার কারণে বিদ্যমান চুক্তিও বাতিল হচ্ছে। রিহ্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রায় এক হাজার যৌথ উন্নয়ন চুক্তি বাতিল হয়েছিল। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই শুধু ঢাকায় আরও প্রায় ৪৫০টি চুক্তি বাতিল হয়েছে। একই সময়ে ফ্ল্যাট বুঝে না পাওয়া নিয়ে রিহ্যাবের কাছে প্রায় ১ হাজার ৬০০টি অভিযোগ অমীমাংসিত অবস্থায় রয়েছে।
মন্দার অন্যতম প্রধান কারণ নির্মাণ ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি। কোভিড-১৯ মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে কাঁচামাল আমদানি ব্যয় ও পরিবহন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত কয়েক বছরে প্রধান নির্মাণসামগ্রীর দাম গড়ে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে; কিছু ক্ষেত্রে এ বৃদ্ধি ১০০ শতাংশেরও বেশি। বর্তমানে প্রতি ব্যাগ সিমেন্ট ৫৪০ থেকে ৫৮০ টাকা এবং প্রতি টন এমএস রড ৮৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। নতুন বাজেটে নির্মাণসামগ্রীর ওপর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রক শুল্ক আরোপের ফলে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়েছে।
নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিক্রি কমে যাওয়ার কারণে ছোট ও মাঝারি ডেভেলপাররা সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন। পর্যাপ্ত ফ্ল্যাট বিক্রি না হওয়ায় অনেক প্রকল্প মাঝপথে থেমে যাচ্ছে। ফলে একদিকে ডেভেলপাররা তহবিল সংকটে পড়ছেন, অন্যদিকে অর্থ পরিশোধের পরও অনেক ক্রেতাকে নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে ফ্ল্যাট বুঝে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে আবাসন বাজারে ক্রেতাদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অন্যদিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের বিভিন্ন কর ও শুল্ক ব্যবস্থাও আবাসন বাজারে নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। ফ্ল্যাটের সরকার-নির্ধারিত মূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ মূলধনি মুনাফা কর (ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স), রড ও সিমেন্টের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক এবং অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত করার ফলে ফ্ল্যাট কেনাবেচার ব্যয় আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে নতুন বিনিয়োগের প্রবণতা আরও কমতে পারে।
এরই মধ্যে বাজারে বুকিং বাতিলের প্রবণতা বেড়েছে এবং নতুন ফ্ল্যাট বিক্রিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন প্রকল্প শুরু না করে চলমান প্রকল্প শেষ করার দিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। আগে যেখানে প্রতিবছর একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হতো, এখন অনেক ডেভেলপার কয়েক বছরেও নতুন প্রকল্প হাতে নিতে পারছেন না।
তুলনামূলকভাবে বড় আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তির কারণে এখনো পরিস্থিতি সামাল দিতে পারলেও তারাও চাপের বাইরে নয়। আবাসিক ফ্ল্যাটের বিক্রি কমে যাওয়ায় বাণিজ্যিক প্রকল্পের আয় দিয়ে তারা ব্যবসার ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে। তবে বাজারে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা অব্যাহত থাকলে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে দেশের আবাসন খাত এখন একটি কাঠামোগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি, উচ্চ সুদের হার, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ-আস্থার ঘাটতি এবং কর-শুল্কের অতিরিক্ত চাপ—সব মিলিয়ে বাজারে চাহিদা ও সরবরাহ উভয়ই সংকুচিত হচ্ছে। দ্রুত নীতিগত সহায়তা, অর্থায়নের সুযোগ বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা না গেলে এই মন্দা আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যার প্রভাব শুধু আবাসন শিল্পেই নয়, নির্মাণসামগ্রী, ব্যাংকিং, সিমেন্ট, রড এবং সংশ্লিষ্ট অসংখ্য খাতেও পড়বে।
সর্বশেষ হালনাগাদ 6 hours আগে

