তারেক আবেদীন ●
দেশের জীবন বীমা কোম্পানির আরেকটি উইকেটের পতন ঘটলো! কয়েকদিন আগে ড. বিশ্বজিৎ কুমার মন্ডলের কারণ দর্শানোর উত্তর নাকচ করে দিয়েছে বীমা খাতের নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। হোমল্যান্ড লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর এই মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তাকে বীমা আইন, ২০১০ ’র ৫০(১) (খ) ধারায় অপসারণ করা হয়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর আইডিআরএ’র নির্বাহী পরিচালক (যুগ্ম সচিব) ড. নাজনীন কাউসার চৌধুরীর স্বাক্ষর করা এক চিঠিতে (স্মারক নং-৫৩.০৩.০০০০.০৩৬,০১.০০১.২৩.৩৬) কোম্পানিটিরর চেয়ারম্যান ও মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ড. বিশ্বজিৎ কুমার মন্ডলকে তা জানিয়ে দেয়া হয়।
কিছুদিন আগে চতুর্থ প্রজন্মের জীবন বীমা কোম্পানি স্বদেশ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইখতিয়ার উদ্দিন শাহীনকে তার পদ থেকে অব্যাহতির পর কম সময়ের ব্যবধানে বীমা কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের শীর্ষ পদে আরেকজন মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার পতন ঘটলো।
অন্যদিকে, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এর কড়া নজরদারি ও সিদ্ধান্ত নিয়ে আতংকে আছে বয়স ও অভিজ্ঞতায় অযোগ্য, সনদ জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাত, অনিয়ম ও প্রতারণার অভিযোগে বেশ ক’জন বিতর্কিত প্রধান নির্বাহী। জানা গেছে, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কর্মসূচিতে শিগগির বীমা কোম্পানির আরও কয়েক জন প্রধান নির্বাহীর উইকেট পড়ে যেতে পারে! হোমল্যান্ড লাইফ ও স্বদেশ লাইফের এমডি অপসারণের ঘটনায় কোম্পানি ২টিতে পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ পরিবর্তন হতে যাচ্ছে। খবর একাধিক সূত্রের।
ড. বিশ্বজিৎ কুমার মন্ডলের অপসারণের চিঠির দীর্ঘ ব্যাখ্যায় আইডিআরএ থেকে ১৩টি বিষয় উত্থাপন করা হয়। এরমধ্যে হোমল্যান্ড লাইফের ২০১৮, ২০১৯ ও ২০২০ সালের বিশেষ নিরীক্ষা কাজে আইডিআরএ নিয়োগকৃত নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান হুসেইন ফরহাদ এন্ড কোম্পানিকে তথ্য ও উপাত্ত দিয়ে সার্বিক সহযোগিতায় নির্দেশনার বিষয়টি উল্লেখযোগ্য। ৩১ আগস্ট বেসরকারি একটি স্যাটেলাইট টেলিভিশনে প্রচারিত এক সংবাদে ৫১টি আইটেমে ৩১৪ পৃষ্ঠা মূল সংযুক্তিসহ নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কাগজ সরবরাহ করেন বলে ড. মন্ডল প্রতিবেদককে জানান। অপরদিকে হোমল্যান্ড লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর প্রসঙ্গে প্রতিবেদকের মুখোমুখি সাক্ষাতে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জয়নুল বারী প্রতিবেদককে বলেন, ওই কোম্পানীর কর্মকর্তা ‘কাগজপত্র লুকিয়ে রেখে আমাকে যদি কাজ করতে না দেয়, তাহলে তো ওই কর্মকর্তাকে অপসারণ করতে হবে। সে ক্ষমতা আমাকে আইনে দেয়া আছে।’ টিভিতে প্রচারিত সে প্রতিবেদনের প্রথম অংশে প্রতিবেদককে ড. মন্ডল নিরীক্ষককে দেয়া কয়েক শ’ পৃষ্ঠার প্রমাণাদি প্রদর্শন করেন, যা ফুটেজে দেখা যায়। প্রতিবেদকের রিপোর্টে আরও বলা হয় নিয়ন্ত্রককে কোন কোম্পানি নথি প্রদান না করলে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাস্তি হিসেবে আর্থিক জরিমানা করার বিধান আছে। তাহলে কি নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিজের আইন নিজেই অমান্য করছে?
ড. নাজনীন কাউসার চৌধুরীর স্বাক্ষর করা এক চিঠিতে (স্মারক নং-৫৩.০৩.০০০০.০৩৬,০১.০০১.২৩.৩৬) ৭ নম্বর ব্যাখ্যায় বলা হয়, হোমল্যান্ড লাইফ ইনস্যুরেন্সের নিরীক্ষাধীন সময়কাল (২০১৮-২০২০)। মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ড. বিশ্বজিৎ কুমার মন্ডলের মেয়াদকালের নয়। তিনি (মন্ডল) নিরীক্ষক ফার্মকে প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও তথ্যাদি প্রদান না করায় কোম্পানির আর্থিক বিষয়াদি-প্রিমিয়াম আয়, ব্যয়, বীমা দাবী পরিশোধ ইত্যাদি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ বীমা আইন, ২০২০ ’র ২৯ ধারা মতে বিশেষ নিরীক্ষার উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়েছে। এর মাধ্যমে তিনি তার পূর্বসূরীদের অনিয়ম গোপন করেছেন। তাঁর উপযুক্ত কার্যকলাপ বীমা আইন, ২০১০ ’র সুস্পষ্ট লংঘন এবং বীমাকারী ও গ্রাহকদের স্বার্থের পরিপন্থি। বীমা আইন, ২০১০ ’র ৫০ (১) (খ) ধারা মতে তাঁর (মন্ডল) আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হলেও তিনি অসত্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছেন। মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ড. বিশ্বজিৎ কুমার মন্ডলের বক্তব্য অসন্তোষজনক ও অগ্রহণযোগ্য। ফলে তিনি আত্মপক্ষ সমর্থনে ব্যর্থ হয়েছেন। এ অবস্থায় হোমল্যান্ড লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর এই মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ড. বিশ্বজিৎ কুমার মন্ডলের উপর্যুক্ত কার্যকলাপ ও আচরণের মাধ্যমে বীমা আইন, ২০১০ লংঘন করায় এবং এর ফলে কোম্পানি ও বীমা গ্রহীতাদের স্বার্থ বিঘ্নিত হয়েছে বিধায় বীমা আইন, ২০১০ ’র ৫০ (১) (খ) ধারা মতে তাঁকে কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার পদ থেকে অপসারণ করা হলো।
এদিকে ২১ আগস্ট, ২০২৩ লিখিত ৩১৪ পাতার সংযুক্তিসহ কারণ দর্শানোর জবাবে হোমল্যান্ড লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ড. বিশ্বজিৎ কুমার মন্ডল জবাবে প্রতিটি বিষয়ে পুংখানুপংখভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি নিয়ন্ত্রককে কারণ দর্শানোর জবাবে জানান, বিশেষ নিরীক্ষার সময়কালে (২০১৮-২০২০) তিনি কোম্পানিটিতে ছিলেন না। তিনি কোম্পানিতে যোগদান করেন ২০২২ সালের ২৪ মে। মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মন্ডল জবাবে জানান, কোম্পানিটিতে তাঁর যোগদানের পর থেকে তিনি গ্রাহকদের ৩৫ কোটি ৯ লাখ টাকার বীমা দাবী পরিশোধ করেছেন। তিনি জানান, নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে তথ্য সরবরাহ এবং নিরীক্ষা কাজ পরিচালনার জন্য ২০২২ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর নিরীক্ষক নিয়োগপত্র অনুমোদন করেন। সে অনুযায়ি নিরীক্ষক ফার্মকে সহযোগিতার জন্য কোম্পানির অর্থ ও হিসাব বিভাগের সহকারী ভাইস প্রেসিডেন্ট আশিষ মালাকারকে দায়িত্ব দেন। নিরীক্ষক ফার্মের চাহিদানুযায়ি ইমেইলে তথ্য সরবরাহ করা হয়। উল্লেখ্য, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২২ নিরীক্ষক নিয়োগের ১ মাস ৩ দিন পর ১৭ অক্টোবর, ২০২২ নিরীক্ষা কাজে যোগ দেন। ২৫ অক্টোবর, ২০২২ থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি অবধি ই মেইলের মাধ্যমে ৫১টি তথ্য সরবরাহ করা হয়। সহকারী ভাইস প্রেসিডেন্ট আশিষ মালাকার ২ জুলাই, ২০২৩ কোম্পানির চাকরি ছেড়ে চলে যান। ব্যক্তিগত কারণে আশিষ মালাকার কোম্পানির সকল কাগজপত্র বুঝিয়ে দিয়ে যাননি। তাছাড়া তিনি ঢাকার বাহিরে অবস্থান করায় নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের শুনানীর দিন (১০ আগস্ট, ২০২৩) সকল কাগজপত্রসহ উপস্থিত থাকা তার সম্ভব হয়নি। ওইদিন পরিচিত পর্বের শুরুতে মৌখিকভাবে আইডিআরকে অবহিত তা করা হয়। কোম্পানির ব্যাংক হিসাব অনিয়ম প্রসঙ্গে জবাবপত্রে ৫টি ব্যাংক হিসাব বিররণী সংযুক্ত করে তিনি বলেন, কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ে স্থান সংকুলান না হওয়ায় শ্যামলী ও দৈনিক বাংলায় কোম্পানির স্টোর রুমে নথিপত্র রাখা হয়। স্টোর রুমে দায়িত্বে যারা ছিলেন তারা অনেকেই এখন কোম্পানিতে নেই।
আইডিআরএ’র অপসারণ পত্রে উল্লেখিত ৭ নম্বর ব্যাখ্যায় একটি উল্লেখযোগ্য অংশের জবাব প্রসঙ্গে ড. বিশ্বজিৎ কুমার মন্ডল অর্থকাগজকে জানান, এটাতো আমার অনিয়ম বা ভুল নয়; সুতরা আমার বিরুদ্ধে পূর্বসূরীদের অনিয়ম গোপনের অভিযোগ থাকতেই পারে না। বরং আমি দিন রাত পরিশ্রম করে নিরীক্ষকদের তথ্য ও উপাত্ত সরবরাহ করেছি।
জানা গেছে, এ মাসেই হোমল্যান্ড লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এ বার্ষিক সাধারণ সভাসহ ৩টি সভা বসছে। সভায় পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক পরিবর্তন আসছে। চেয়ারম্যান হিসেবে দুইজনের নাম শোনা যাচ্ছে এরা হলেন- আবদুর রাজ্জাক ও জামাল উদ্দিন মোকাদ্দেস। এদের মধ্যে সিলেটের একজন পরিচালক যিনি বাইরে থেকে কলকাঠি নেড়ে আসছেন বলে অভিযোগ। যিনি নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের বড় একজন কর্মকর্তার একই বিদ্যালয়ের প্রায় সমমনা শিক্ষার্থী; যে পরিচালকের প্রতি সে কর্মকর্তার সুদৃষ্টি আছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
চতুর্থ প্রজন্মের জীবন বীমা কোম্পানি স্বদেশ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইখতিয়ার উদ্দিন শাহীন কোম্পানি থেকে অপসারণের পর চেয়ারম্যানের মৌখিক নির্দেশে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লাকে এমডির (চলতি দায়িত্ব) দেয়া হয় কিছুদিন আগে। তিনি এখন কাগজপত্র প্রস্তুত করার কাজে ব্যস্ত। নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, স্বদেশ লাইফে তিনিসহ পর্যায়ক্রম অনেক কর্মকর্তাই বিতর্কিত শাহীনের নিয়োগকৃত। অভিযোগ রয়েছে এই দোসররা শাহীনের প্রেতাত্মা! নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এলাকার প্রভাবশালী এক নেতার আর্শীবাদপুষ্ট হয়ে যমুনা লাইফ ইনসিওরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এ কাজ করেন জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা। পরে অনিয়ম ও অর্থ কেলেংকারির অভিযোগে যমুনা লাইফ থেকে অপসারিত (টারমিনেটেড) এ মোল্লা দীর্ঘদিন বীমা পেশা হতে বিরত ছিলেন। শাহীন তাকে স্বদেশ লাইফে পুনর্বাসিত করেন। স্বদেশ লাইফ থেকে শাহীন বিদায় নিলেও বাহির থেকে তিনি কলকাঠি নাড়ছেন বলে জানা গেছে। মে মাস থেকে প্রথম বর্ষ বীমা ব্যবসায় বন্ধ থাকা কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থা এতটাই শোচনীয় যে কুরিয়ার বিলের সামান্যতম খরচ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
স্বদেশ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর সার্বিক অবস্থা জানতে চেয়ারম্যান মাকসুদুর রহমানকে যোগাযোগ করা হয় একাধিকবার। তার সেলফোন (০১৭১১৮১০৩৬৬) বন্ধ পাওয়া যায়। কোম্পানিটির এমডি হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লার সঙ্গে একাধিকবার কথা বলার চেষ্টার পর অবশেষে তিনি তা গ্রহণ করেন। তিনি জানান, অসুস্থ ভাই পিজি হাসপাতালে চিকিৎসার কারণে ফোন ধরেননি। অফিসে গিয়ে কথা বলবেন বলে তিনি আর ফোন করেননি। কোম্পানিটির সাবেক চেয়ারম্যান ও পরিচালক নূর আলম চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোম্পানির বিষয়ে কথা বলতে অসম্মতি প্রকাশ করেন। তবে তিনি অর্থকাগজকে জানান, এরিমধ্যে পর্ষদের কোন সভা অনুষ্ঠিত হয়নি। আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, স্বদেশ লাইফের ব্যবসায় বন্ধে উদ্ভুত পরিস্থিতি নিরসনে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সূত্রটি জানিয়েছে, শিগগির কোম্পানিটিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। ●
অকা/জীবী/বিপ্র/ বিকেল, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 3 years আগে

