অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি আবাসন বা রিয়েল এস্টেট খাত বর্তমানে এক গভীর ও নজিরবিহীন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত কয়েক বছরের মধ্যে এই খাতটি এখন সবচেয়ে বড় মন্দার মুখোমুখি। বিশেষ করে ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে আবাসন ব্যবসায় ধস নামতে শুরু করেছে। একদিকে নির্মাণ সামগ্রীর আকাশচুম্বী দাম, অন্যদিকে উচ্চ সুদের হার এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে এই খাতের খেলাপি ঋণের হার প্রায় ২৭ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আবাসন শিল্পের ওপর নির্ভরশীল কয়েকশ সহযোগী শিল্পও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।
বুকিং বাতিলের হিড়িক ও বিনিয়োগকারীদের পিছুটান
আবাসন ব্যবসায়ীদের মতে, বর্তমান সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হলো গণহারে বুকিং বাতিল। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অনেক উচ্চবিত্ত ক্রেতা ও বিনিয়োগকারী দেশ ছেড়ে চলে গেছেন অথবা বর্তমান পরিস্থিতিতে টাকা বিনিয়োগ না করে 'অপেক্ষা করো এবং দেখো' নীতি গ্রহণ করেছেন। এর ফলে ডেভেলপারদের কাছে থাকা অগ্রিম অর্থের প্রবাহ হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেছে। সাধারণত অধিকাংশ ডেভেলপার ক্রেতাদের দেওয়া কিস্তির ওপর ভিত্তি করেই প্রকল্পের কাজ পরিচালনা করেন। কিন্তু এখন কিস্তি আসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং নতুন বুকিং না থাকায় প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন থমকে গেছে। ঢাকার বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের বাজার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যেখানে বিক্রি প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
আর্থিক সংকট ও খেলাপি ঋণের উদ্বেগজনক চিত্র
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য এই খাতের আর্থিক খাদের গভীরতা স্পষ্ট করে তুলেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রিয়েল এস্টেট খাতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক ৭০ শতাংশে, যা মাত্র তিন বছর আগে ২০২২ সালেও ছিল মাত্র ৮ শতাংশের আশেপাশে। এই বিশাল অংকের খেলাপি ঋণ প্রমাণ করে যে, ছোট-বড় সব ধরনের প্রতিষ্ঠানই এখন ব্যাংক ঋণ পরিশোধে চরম হিমশিম খাচ্ছে। বিশেষ করে তারল্য সংকটের কারণে ব্যাংকগুলো এখন নতুন করে ঋণ দিতে যেমন অনিচ্ছুক, তেমনি বিদ্যমান ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় ডেভেলপারদের ওপর ঋণের বোঝা পাহাড়সম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নির্মাণ সামগ্রীর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও ব্যয় সংকোচন
বৈশ্বিক অস্থিরতা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলসহ রড ও সিমেন্টের মতো প্রধান নির্মাণ উপকরণের দাম কয়েক দফায় বেড়েছে। বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতি টন রডের দাম ৮০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৮ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। সিমেন্টের দামেও প্রতি ব্যাগে ৪০ থেকে ৫০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। নির্মাণ ব্যয় গড়ে প্রায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে অনেক ডেভেলপার নির্ধারিত দামে ক্রেতাদের ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দিতে পারছেন না। অনেক ক্ষেত্রে মূলধনী সংকটের কারণে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের চলমান প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের হাতে শত শত ফ্ল্যাট অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে, যা বাজারে নগদ অর্থের প্রবাহকে স্থবির করে দিয়েছে।
শিল্পের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা
আবাসন খাতের এই মন্দা কেবল ফ্ল্যাট বিক্রিতেই সীমাবদ্ধ নেই, এর প্রভাব পড়ছে দেশের জিডিপিতেও। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের জিডিপিতে এই খাতের অবদান প্রায় ৮ শতাংশ এবং এর সাথে প্রায় ৩৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। ইস্পাত ও সিমেন্ট শিল্পের মতো প্রায় ২৫০টি সহযোগী শিল্প এখন চাহিদার অভাবে লোকসান গুনছে। অনেক সিমেন্ট কারখানা তাদের সক্ষমতার নিচে উৎপাদন করছে অথবা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এই স্থবিরতা বজায় থাকলে ভবিষ্যতে আবাসন খাতে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে, কারণ ব্যবসায়ীরা এখন নতুন কোনো প্রকল্পে হাত দিতে সাহস পাচ্ছেন না।
উত্তরণের পথ ও নীতি সহায়তার আহ্বান
বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণে সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ নীতি সহায়তার দাবি জানিয়েছে আবাসন খাতের সংগঠন রিহ্যাব। ব্যবসায়ীরা জরুরি ভিত্তিতে ৩ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন, যাতে মাঝপথে আটকে থাকা প্রকল্পগুলো শেষ করা সম্ভব হয়। এছাড়া মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের বাজারে ফিরিয়ে আনতে স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণের ব্যবস্থা করা এবং ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার দাবি জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের মতে, আবাসন খাতকে বাঁচাতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এর নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘ মেয়াদে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে স্থায়ী ক্ষত তৈরি করতে পারে। ●
অকা/আখা/ই/সকাল/১৬ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 2 hours আগে

