অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

দেশের পুঁজি বাজার প্রায় দেড় দশক ধরে কাঠামোগত দুর্বলতা, নীতিগত অস্থিরতা এবং তদারকি ব্যর্থতার এক দীর্ঘ ছায়ার মধ্যে রয়েছে। ২০১০ সালের বড় ধসের পর বাজার ঘুরে দাঁড়াবে—এমন প্রতিশ্রুতি বহুবার এসেছে। কিন্তু বাস্তবে বাজারের ভিত্তি শক্তিশালী হয়নি; বরং অনিয়ম, দুর্বল কোম্পানির আইপিও অনুমোদন, নীতির ঘন ঘন পরিবর্তন এবং শাস্তির অভাবে কারসাজি—সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা গভীর হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের একটি অংশের ভাষ্য, ধারাবাহিক ভুল নীতি ও স্বচ্ছতার ঘাটতি বাজারকে কার্যত ভঙ্গুর করে তুলেছে।

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) নেতারা অভিযোগ করেছেন, ২০১০-পরবর্তী সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্বে কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহির বদলে জটিল বিধিমালা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাজারকে আরও সংকুচিত করা হয়েছে। তাদের দাবি, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)-এর সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম খায়রুল হোসেন-এর আমলে কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায়নি। পরবর্তী সময়ে অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম-এর নেতৃত্বাধীন কমিশন নিয়েও ইনসাইডার ট্রেডিং, প্লেসমেন্ট বাণিজ্য ও বিতর্কিত আইপিও অনুমোদনের অভিযোগ ওঠে। বাজার সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এই সময়গুলোতে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি ছিল প্রকট।

সাম্প্রতিক সময়ে চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ-এর কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পরও কাঙ্ক্ষিত কাঠামোগত সংস্কার দৃশ্যমান হয়নি—এমন সমালোচনা রয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট শেয়ারের মূল্য কার্যত শূন্যে নেমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা বড় ক্ষতির মুখে পড়েন। এ ঘটনায় নিয়ন্ত্রকের সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

ডিবিএ নেতাদের ভাষ্য, গত ১৩–১৪ বছরে বাজারকে “ওলট-পালট” করে দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, অসৎ কর্মকর্তা ও সুবিধাভোগী ব্যবসায়ীদের যোগসাজশে বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে তারা সৎ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বিদেশে বিনিয়োগ আকর্ষণের নামে আয়োজিত বিভিন্ন রোড শোর ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ এবং সম্ভাব্য রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় বা বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের অভিযোগ তদন্ত করে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি তোলা হয়েছে।

সংগঠনটি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে ৩০ দফা প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—বিএসইসির দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের অপসারণ, চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগে সার্চ কমিটি গঠন, দুই স্টক এক্সচেঞ্জ, সিডিবিএল ও সিসিবিএলের পর্ষদ পুনর্গঠন এবং বিতর্কিত কিছু আইন-বিধি সংশোধন বা বাতিল। পাশাপাশি ভবিষ্যতে ফ্লোর প্রাইস আরোপ না করার নীতি, নতুন ট্রেক ইস্যুতে আর্থিক লেনদেন তদন্ত, আইপিও ও রাইট শেয়ারে স্বচ্ছতা জোরদার, দীর্ঘদিন বন্ধ কোম্পানি তালিকাচ্যুত করা এবং কারসাজির প্রমাণ মিললে ফৌজদারি মামলা দায়েরের বিধান প্রণয়নের দাবি জানানো হয়েছে।

বাজারে অনিয়মের চিত্র আরও স্পষ্ট হয় কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউসের ঘটনায়। প্রতারণামূলক সফটওয়্যার ও সমন্বিত গ্রাহক হিসাবের অপব্যবহারের মাধ্যমে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে শতকোটি টাকার ঘাটতি ধরা পড়ে। এর মধ্যে তামহা সিকিউরিটিজ লিমিটেড, বানকো সিকিউরিটিজ লিমিটেড, ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ লিমিটেড এবং শাহ মোহাম্মদ সগির অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড-এর বিরুদ্ধে গ্রাহক অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠে। তদন্তে কোথাও নগদ ও সিকিউরিটিজ মিলিয়ে ৬০–১৩০ কোটির বেশি ঘাটতি ধরা পড়ে। কিছু প্রতিষ্ঠানের ট্রেডিং কার্যক্রম স্থগিত করা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের অর্থ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় আটকে আছে—এমন অভিযোগ রয়েছে।

পুঁজি বাজার স্থিতিশীলকরণ তহবিল গঠনের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, বাজারে সংঘটিত মোট ক্ষতির তুলনায় নিষ্পত্তিকৃত অর্থের পরিমাণ অতি সামান্য। তহবিলের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, ২০২২ থেকে ২০২৪ সময়কালে মোট কয়েক কোটি টাকার নগদ ও স্টক ক্লেইম নিষ্পত্তি হয়েছে। কিন্তু বাজারে যে পরিমাণ লেনদেন ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, তার তুলনায় এই সহায়তা অপ্রতুল—এমন সমালোচনা জোরালো।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যার মূলে রয়েছে তিনটি কাঠামোগত দুর্বলতা—প্রথমত, তালিকাভুক্তির মানদণ্ডে শিথিলতা; দ্বিতীয়ত, নজরদারি ও প্রয়োগক্ষমতার সীমাবদ্ধতা; তৃতীয়ত, নীতির ধারাবাহিকতার অভাব। এর ফলে সেকেন্ডারি বাজার একসময় “আইটেম-নির্ভর” বা নির্দিষ্ট কিছু শেয়ারের কৃত্রিম চাহিদাভিত্তিক হয়ে পড়ে, যা স্বাভাবিক মূল্য আবিষ্কার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে।

সামগ্রিকভাবে, পুঁজি বাজারের বর্তমান সংকট কেবল সাময়িক অস্থিরতা নয়; এটি আস্থার গভীর সংকট। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকর প্রয়োগ ছাড়া স্থিতিশীলতা টেকসই হবে না। বিনিয়োগকারীর আস্থা পুনর্গঠনের জন্য শক্তিশালী তদারকি, নিরপেক্ষ তদন্ত, নীতির ধারাবাহিকতা এবং বাজারবান্ধব সংস্কার—এই চার স্তম্ভের ওপরই ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।

অকা/পুঁবা/ই/সকাল/১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 8 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version