অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
ঘুরে দাঁড়িয়েছে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি। অর্থ বছরের প্রথম দুই মাসে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ছিল। সেখান থেকে বিদায়ী সেপ্টেম্বরে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দুই মাসে অর্থাৎ জুলাইয়ে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ঋণাত্মক ৭ দশমিক ১২ শতাংশ। আগস্টে প্রবৃদ্ধি ছিল ঋণাত্মক ১৪ দশমিক ৩০ শতাংশ। ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার রাজস্ব আদায় বাড়াতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করে। এর ফলে সেপ্টেম্বরে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ। সবমিলে তিন মাসে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৭০ হাজার কোটি টাকা। যদিও আগের বছরের প্রথম তিন মাসে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৭৫ হাজার কোটি টাকা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাসভিত্তিক রাজস্ব আদায়ের পরিসংখ্যান থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

এনবিআরের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, জুলাইতে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ২০ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা, পরের মাস আগস্টে এক হাজার কোটি টাকা বেড়ে হয় ২১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বরে আরো ৮ হাজার কোটি টাকা বেড়ে হয়েছে ২৯ হাজার কোটি টাকা। সবমিলে তিন মাসে আদায় হয়েছে ৭০ হাজার ৯০২ কোটি টাকা।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) রাজস্ব আদায় বাড়ানোর অংশ হিসেবে কর ছাড়া রাজস্ব ও নন-এনবিআরÑ এই তিন খাত থেকে আয় বাড়ানোর পদপে নিয়েছে। এরই মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এসব খাতের রাজস্ব আদায় বাড়াতে বিভিন্ন ধরনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি অর্থ উপদেষ্টা সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করে বলেছেন, সাধারণ মানুষের ভোগান্তি হয় এমন কোনো পদপে নেয়া যাবে না। রাজস্ব খাতের বিশ্লেষকরা বলেছেন, করবহির্ভূত ও এনবিআরবহির্ভূত খাত থেকে আদায় বাড়ানো সম্ভব হলে এনবিআরের ওপর চাপ কমবে। তিন খাতের রাজস্ব আদায় বাড়াতেই সময়োপযোগী কৌশল গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়ন করতে হবে।

এনবিআরের তথ্যে দেখা যায় চলতি অর্থ বছরের প্রথম জুলাই মাসে রাজস্ব আদায় হয়েছে ২০ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা, চলতি অর্থ বছরের দ্বিতীয মাস আগস্টে রাজস্ব আদায় হয়েছে ২১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা এবং সেপ্টেম্বর মাসে রাজস্ব আদায় হয়েছে ২৯ হাজার কোটি টাকা।

এনবিআরের তথ্যে দেখা যায় গত ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে তিন লাখ ৮২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছে। এসময় রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পেয়েছে ১৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থ বছরে রাজস্ব আদায় হয়েছে তিন লাখ ৩১ হাজার ৫০২ কোটি টাকা।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় চলতি ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ৭০ হাজার ৯০২ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ হয়েছে। গত অর্থ বছরের একই সময়ে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৭৫ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, সরকারের আয়ের অন্যতম উৎস রাজস্ব। এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি থাকলেও কয়েক বছর থেকে ল্যমাত্রা পূরণ হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে এনবিআরের আদায় বাড়ানোর পাশাপাশি করবহির্ভূত ও এনবিআরবহির্ভূত খাত থেকেও আদায় বাড়াতে গুরুত্ব দিতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার সেই পথেই হাঁটছে বলে তিনি মনে করেন।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘জুলাই ও আগস্টে রাজস্ব আদায় বাধাগ্রস্ত হলেও, এই সময়ে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির কারণে রাজস্ব বৃদ্ধির সুযোগ থাকা উচিত ছিল। তবে, সেপ্টেম্বরে রাজস্ব আদায়ের পরিস্থিতি উন্নত হওয়া কিছুটা স্বস্তির বিষয় বলে তিনি মনে করেন।

তথ্যে দেখা যায় এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের প্রধান তিনটি উৎস হচ্ছেÑ আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) ও আমদানি শুল্ক। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ভ্যাট-কর-শুল্ক না বাড়িয়ে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সারা দেশে নতুন রাজস্ব দফতর স্থাপন করে আরো বেশিসংখ্যক মানুষকে করের আওতায় আনতে বলা হয়েছে। এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সততা নিশ্চিত করতে জোর বাড়াতে এবং সাধারণ করদাতাদের হয়রানি না করার কথা বলা হয়েছে। একসময়ে প্রয়োজন থাকলেও এখন নেই, এমন রাজস্ব অব্যাহতি প্রত্যাহার করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ভ্যাট আদায়ে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়াতে ও মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি-রফতানি বন্ধে পদপে নিতে বলা হয়েছে। রাজস্ব ফাঁকি বন্ধে এবং বকেয়া আদায়ে কঠোরতা আনতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

অন্য দিকে করবহির্ভূত রাজস্ব যা সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং বিভাগ আদায় করে। যেটাকে সরকার বলে করবহির্ভূত প্রাপ্তি (নন-ট্যাক্স রেভিনিউ)। সংেেপ তা এনটিআর নামে পরিচিত। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে সরকারি বিভিন্ন সেবার ফি ও কর প্রতি তিন বছর পরপর বাড়াতে মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দফকর ও সংস্থাগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও সরকারি কর্মচারীকে দেয়া ঋণের সুদও করবহির্ভূত রাজস্ব হিসেবে গণ্য হয়। সম্প্রতি অনিয়ম প্রতিরোধে ও সময়মতো করবহির্ভূত রাজস্ব আদায়ে সরকারের বিভিন্ন সেবার বিপরীতে অর্থ আদায়ের দিনই সরকারি কোষাগারে জমা দেয়ার কথা বলা হয়েছে।

বিশেষভাবে বিভিন্ন প্রশাসনিক ফি; স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা, করপোরেশন, সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানির নিট মুনাফা থেকে সরকারের অংশ; সরকারের বিভিন্ন পরিষেবা ও পণ্যের মূল্য; সরকারি জমি, খনি এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ ইজারা বা লিজের মাধ্যমে আয়; সরকারি মালিকানাধীন প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের রয়্যালটি; সড়ক ও সেতু থেকে আদায় করা টোল, জরিমানা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত অর্থ করবহির্ভূত রাজস্ব হিসেবে সরকারের কোষাগারে জমা দিতে হবে।

অর্থ বিভাগের পরিপত্রে আরো বলা হয়েছে, ‘করবহির্ভূত ও এনবিআরবহির্ভূত খাত থেকে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর সুযোগ আছে। এ জন্য করবহির্ভূত ও এনবিআরবহির্ভূত রাজস্ব খাত থেকে বাড়তি কর আদায়ের বাস্তবসম্মত ল্যমাত্রা নির্ধারণ, যৌক্তিক ফি ও কর আরোপ, সঠিক খাত চিহ্নিতকরণ, সরকারের প্রাপ্য সুদ ও লভ্যাংশ নিয়মিত আদায় করতে হবে। সব সংস্থাকে যৌক্তিকভাবে কর ও সেবা মাশুল নির্ধারণ করতে হবে।’

চলতি ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের বাজেটে এনবিআরবহির্ভূত কর থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা এবং করবহির্ভূত রাজস্ব থেকে ৪৬ হাজার কোটি টাকা আদায়ের ল্যমাত্রা রয়েছে। চলতি অর্থ বছরের বাজেট বিবরণীর তথ্যানুযায়ী, এনবিআরবহির্ভূত করের মধ্যে মাদকদ্রব্য ও মদ শুল্ক থেকে ৫০০ কোটি টাকা, মোটরযান কর থেকে এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা, ভূমি উন্নয়ন কর থেকে দুই হাজার ২৫০ কোটি টাকা, স্ট্যাম্প (নন-জুডিশিয়াল) বিক্রি থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্য উন্নয়ন, পরিবেশগত নিরাপত্তা ও আইটি উন্নয়ন সারচার্জসহ অন্যান্য সারচার্জ থেকে ৭৫০ কোটি টাকা রয়েছে।

এ ছাড়া করবহির্ভূত রাজস্বের মধ্যে লভ্যাংশ ও মুনাফা থেকে সাত হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা, সুদ থেকে ছয় হাজার ১১৪ কোটি টাকা, প্রশাসনিক ফি থেকে পাঁচ হাজার ৮০২ কোটি টাকা, জরিমানাÑ দণ্ড ও বাজেয়াপ্ত থেকে ৬৪৩ কোটি টাকা, সেবা ফি থেকে ৯ হাজার ১২৬ কোটি টাকা, ভাড়া ও ইজারা থেকে ৭২৬ কোটি টাকা, টোল থেকে এক হাজার ৯১৫ কোটি টাকা, অবাণিজ্যিক বিক্রি থেকে তিন হাজার ৪৬০ কোটি টাকা, ক্যাপিটাল রিসিট থেকে ১০৫ কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাত থেকে ১০ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা আদায়ের ল্যমাত্রা ধরা হয়েছে। ●

অকা/আখা/ফর/রাত/২৩ অক্টোবর, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 1 year আগে

Leave A Reply

Exit mobile version