অর্থকাগজ প্রতিবেদন
দেশে খুচরা ঋণ (রিটেইল লেন্ডিং) সম্প্রসারণ এবং সাধারণ মানুষের জন্য ব্যাংকঋণ আরও সহজলভ্য করতে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যক্তিগত ঋণ (পার্সোনাল লোন) পরিশোধের সর্বোচ্চ মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে আট বছর করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভোক্তা ঋণের (কনজিউমার ফাইন্যান্সিং) প্রবৃদ্ধির ওপর দীর্ঘদিনের একটি সীমাবদ্ধতাও তুলে নেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে সম্প্রতি দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের (সিইও) কাছে একটি সার্কুলার জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সংশোধিত নীতিমালার ফলে এখন ব্যাংকগুলো তাদের মোট ঋণ প্রবৃদ্ধির তুলনায় বেশি হারে ভোক্তা ঋণের পোর্টফোলিও সম্প্রসারণ করতে পারবে। আগে ব্যাংকের সামগ্রিক ঋণ বৃদ্ধির হার অতিক্রম করে ভোক্তা ঋণ বাড়ানোর সুযোগ ছিল না, ফলে অনেক ব্যাংক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও এ খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণে বাধার মুখে পড়ত।

ব্যাংকিং খাতের কর্মকর্তাদের মতে, ব্যক্তিগত ঋণের পরিশোধকাল তিন বছর বাড়ানোয় মাসিক কিস্তির (ইএমআই) চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। এতে মধ্যবিত্ত ও বেতনভোগী গ্রাহকদের জন্য ব্যক্তিগত ঋণ গ্রহণ আরও সহজ হবে। তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, যথাযথ ঝুঁকি মূল্যায়ন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বিতরণ বাড়লে ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

ভোক্তা ঋণের প্রবৃদ্ধির ওপর আরোপিত সীমা প্রত্যাহারের ফলে ব্যাংকগুলো এই খাতে আরও সক্রিয়ভাবে বিনিয়োগ করতে পারবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে ব্যক্তিগত ও খুচরা ঋণের ক্রমবর্ধমান বাজারচাহিদা পূরণ সহজ হবে এবং রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রমও নতুন গতি পাবে।

একটি বেসরকারি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আগে কোনো ব্যাংকের ভোক্তা ঋণের প্রবৃদ্ধি সামগ্রিক ঋণ বৃদ্ধির হার ছাড়িয়ে গেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তার ব্যাখ্যা দিতে হতো। ফলে অনেক ব্যাংক ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ভোক্তা ঋণ সম্প্রসারণে সংযত অবস্থান নেয়। নতুন সিদ্ধান্ত সেই সীমাবদ্ধতা দূর করেছে, যা ব্যাংকিং খাতের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ঢাকা ব্যাংকের রিটেইল বিজনেস প্রধান এইচ এম মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, দেশের দ্রুত সম্প্রসারিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির আর্থিক চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এই নীতিগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। তিনি বলেন, ব্যক্তিগত ঋণের মেয়াদ বৃদ্ধি, ভোক্তা ঋণের প্রবৃদ্ধির সীমা প্রত্যাহার এবং বৈদ্যুতিক, হাইব্রিড ও দেশীয়ভাবে উৎপাদিত গাড়ির ক্ষেত্রে অটো লোনের সর্বোচ্চ সীমা ৮০ লাখ টাকায় উন্নীত করার মতো পদক্ষেপগুলো সম্মিলিতভাবে রিটেইল ব্যাংকিং খাতকে আরও গতিশীল করবে।

তার ভাষ্য, দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পরিশোধের সুযোগ গ্রাহকদের মাসিক কিস্তির চাপ কমাবে, ফলে বাড়ি সংস্কার, শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা গাড়ি কেনার মতো বড় ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর জন্যও রিটেইল ঋণের বাজার সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন নীতিমালা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে একদিকে যেমন ভোক্তা ব্যয় ও ব্যক্তিগত বিনিয়োগ বাড়বে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ চাহিদাভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও আরও শক্তিশালী হবে। তবে এ সুবিধা টেকসই করতে হলে ব্যাংকগুলোকে অবশ্যই দায়িত্বশীল ঋণ বিতরণ, আয় যাচাই এবং কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ওপর সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

সর্বশেষ হালনাগাদ 16 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version