অর্থকাগজ প্রতিবেদন
বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হয়ে আসা বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এখন ভয়াবহ অবস্থায় উপনীত হয়েছে। রাজনৈতিক সুবিধাভোগী ও প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের অনৈতিক সুবিধা দিতে গিয়ে জামানতহীন, পরিচিতি নির্ভর, এমনকি ভূয়া নামে দেওয়া বিপুল পরিমাণ ঋণ এখন আর ফেরত আসছে না। ২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানে সরকারের পতনের পর পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪.২ লাখ কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অঙ্ক আগামী ছয় মাসে বেড়ে ৮ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে—যা বর্তমানে বিতরণকৃত মোট ঋণের প্রায় অর্ধেক। এদের মধ্যে ৮১ শতাংশই ‘মন্দ ও লোকসানি’ ঋণ; অর্থাৎ, বছরের পর বছর ধরে কোনো কিস্তিই পরিশোধ হয়নি। ফলে ব্যাংকগুলো ভয়াবহ তারল্য সংকটে পড়েছে, আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতেও অনেকে হিমশিম খাচ্ছে। দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে অন্তত ১৬টি মারাত্মক ঝুঁকিতে, যাদের কাছে রয়েছে মোট খেলাপি ঋণের ৭৭ শতাংশ বা ৩.২৫ লাখ কোটি টাকা।
অনেক খেলাপি ঋণ দেওয়া হয়েছে জামানত ছাড়াই, শুধু পরিচিতি, রাজনৈতিক সংযোগ বা অনানুষ্ঠানিক প্রভাবের ভিত্তিতে। আবার, যেসব ঋণ জামানতের বিপরীতে দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর জমি বা সম্পদের দাম ইচ্ছাকৃতভাবে অতিমূল্যায়ন করা হয়েছে। একই সম্পত্তি একাধিক ব্যাংকে বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে, যার ফলে ঋণ আদায়ে এখন আইনি ও পদ্ধতিগত জটিলতা তৈরি হয়েছে।
অধিকতর ভয়াবহ চিত্র পাওয়া যায়, যখন দেখা যায় বড় পরিসরে ঋণ দেওয়া হয়েছে একাধিক ব্যাংক মিলে 'সিন্ডিকেট' পদ্ধতিতে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি ঋণে জড়িত ছিল ১৫টির বেশি ব্যাংক। এই খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য এখন যৌথ ও সময়সাপেক্ষ পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে।
এস আলম গ্রুপ এবং বেক্সিমকোর মতো শিল্পগোষ্ঠী ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপ বিভিন্ন নামে ১০টি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ২.২৫ লাখ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। বেক্সিমকোর খেলাপি ঋণ ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি, যার বড় একটি অংশ বিদেশে পাচার হয়ে গেছে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের পূর্ণাঙ্গ চিত্র উন্মোচনে কাজ শুরু করে। নতুন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে বড় ঋণ পুনর্গঠনের জন্য আবেদন গ্রহণ শুরু করে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে গঠিত এই কমিটির কাছে জমা পড়ে ১,২৫৩টি আবেদন। কিন্তু একটিও নিষ্পত্তি হয়নি। কারণ, অধিকাংশ আবেদনকারী প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত নন; বরং রাজনৈতিক ও অবৈধ প্রভাবে ঋণ নিয়ে এখন তা পুনর্গঠনের নামে বৈধতা পেতে চাইছেন।
এ অবস্থায় সংকটাপন্ন পাঁচটি ব্যাংক—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী, ইউনিয়ন, সোশ্যাল ইসলামী ও এক্সিম ব্যাংককে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যদিও অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে দিয়েছেন, একীভূতকরণ করলেই যে সমস্যার সমাধান হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং এসব ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে বড় আকারের পুনঃমূলধন বা ‘রিক্যাপিটালাইজেশন’ প্রয়োজন হবে, যা জনগণের করের টাকায় করতে হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR) ব্যবস্থার মাধ্যমে খেলাপি ঋণ আদায়ে আদালতের বাইরে সমঝোতার পথ খুঁজছে। তবে এতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে এবং বড় খেলাপিদের থেকে সম্পূর্ণ অর্থ আদায়ের সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মতো দেশে খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর সামাজিক ও আইনি ব্যবস্থা না থাকায় তারা ঋণ ফেরত দিতে আগ্রহী নয়।
অর্থঋণ আদালতের ধীর গতির কারণে বর্তমানে ১৫-২০ বছর ধরে ঝুলে থাকা হাজার হাজার মামলা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠন করলেও তারা কার্যকর হতে পারবে না, যদি না আদালতের সক্ষমতা বাড়ানো হয়।
এছাড়া বর্তমানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মন্থর হওয়ায় বন্ধক রাখা জমি বা সম্পত্তি বিক্রি করেও ব্যাংকগুলো ঋণের অর্থ ফেরত পাচ্ছে না। জনগণের হাতে টাকা কম, ফলে নিলামে ক্রেতাও পাওয়া যাচ্ছে না।
অবস্থা এতটাই সংকটাপন্ন যে, সরকার ইতোমধ্যে সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে সহায়তা দিতে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি ছেপেছে। ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণ আদায় না হলে সরকারকে আরও টাকা ছাপাতে হতে পারে—যা মূল্যস্ফীতির নতুন ঢেউ ডেকে আনবে। ফলে খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংকিং খাত নয়, এখন বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনীতির অন্যতম বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতে প্রতি বছর গড়ে ১.৪৫ লাখ কোটি টাকা নতুন আমানত যোগ হয়। কিন্তু আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার ব্যাংক খাত থেকেই ১.০৪ লাখ কোটি টাকা ঋণ নেবে। এর অর্থ, নতুন আমানতের প্রায় পুরোটাই চলে যাবে সরকারি খাতে, ফলে বেসরকারি খাতে ঋণদানের সক্ষমতা হ্রাস পাবে। আর বেসরকারি খাতে ঋণের ঘাটতি উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে ব্যাহত করবে, যা দেশের সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে হুমকির মুখে ফেলবে।
এ সংকট থেকে উত্তরণে এখনই শক্ত হাতে খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, কার্যকর আইনি কাঠামো, ব্যাংকের স্বাধীনতা ও সুশাসন নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই। খেলাপি ঋণ এখন আর কেবল আর্থিক হিসাবের বিষয় নয়—এটি বাংলাদেশ অর্থনীতির ভবিষ্যৎ টিকে থাকার প্রশ্নে এক গভীর চ্যালেঞ্জ।
অকা/ব্যাংখা/ই/সকাল/২২ জুন, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 9 months আগে

Leave A Reply

Exit mobile version