অর্থকাগজ প্রতিবেদন
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী চামড়াশিল্প আজ গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। একসময় কুরবানির ঈদকে ঘিরে যে শিল্পভিত্তিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম দেশজুড়ে প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি করত, বর্তমানে তা অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে।
মূলধনের তীব্র সংকট, মধ্যস্বত্বভোগী চক্রের আধিপত্য এবং অব্যবস্থাপনার কারণে জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই খাতটি টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত। অথচ ঈদের ঠিক আগ মুহূর্তেও বাজারে সেই পুরোনো কর্মচাঞ্চল্য বা প্রস্তুতির দৃশ্য চোখে পড়ছে না।
চামড়াশিল্প সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুরবানির কাঁচা চামড়ার বাজারে অস্থিতিশীলতার পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে—ব্যাংক ঋণ ও তারল্য সংকট, সাভার চামড়া শিল্পনগরীর কাঙ্ক্ষিত সক্ষমতা অর্জনে ব্যর্থতা, লবণ ও কেমিক্যালের মূল্যবৃদ্ধি, মধ্যস্বত্বভোগীদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিজ্ঞতার অভাব।
বিশেষ করে ব্যাংক ঋণ সংকট এ খাতকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। অধিকাংশ ব্যবসায়ী খেলাপি ঋণের তালিকায় চলে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো নতুন করে অর্থায়নে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ফলে কাঁচা চামড়া কেনার জন্য প্রয়োজনীয় নগদ অর্থের ঘাটতি প্রকট আকার ধারণ করেছে।
সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়াতে সরকার প্রশাসনকে সতর্ক অবস্থানে থাকার নির্দেশ দিয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জেলা প্রশাসক, ইউএনও এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বাজারে কারসাজি ঠেকাতে কঠোর নজরদারির নির্দেশনা দিয়েছে। পাশাপাশি সীমান্তপথে চামড়া পাচার ঠেকাতে বিজিবির তৎপরতা বাড়ানোর কথাও জানানো হয়েছে।
এ বছর ঢাকার মধ্যে গরুর কাঁচা চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সে হিসাবে একটি গরুর চামড়ার মূল্য ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে কয়েক বছর ধরে অধিকাংশ চামড়া ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যেই বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে ছাগলের চামড়ার বাজার প্রায় অচল হয়ে পড়েছে; অনেক ক্ষেত্রে এসব চামড়া সংগ্রহ করতেও আগ্রহ দেখাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা।
বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন দেশের কাঁচা চামড়া সংগ্রহ ও প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রধান সংগঠন হিসেবে কাজ করে। সংগঠনটির সদস্যরাই ঈদকেন্দ্রিক কাঁচা চামড়ার সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং ট্যানারিতে সরবরাহের মূল কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
সংগঠনটির সাবেক সভাপতি আফতাব খান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলাদেশ এখনো প্রয়োজনীয় পরিবেশগত সনদ অর্জন করতে পারেনি। এছাড়া সাভারের ট্যানারিগুলোতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় এবং যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের অনেক ক্রেতা বাংলাদেশি চামড়ার প্রতি আগ্রহ হারিয়েছেন।
প্রতি বছর কুরবানির মৌসুমে বিশেষ ঋণ সুবিধার ঘোষণা দেওয়া হলেও অধিকাংশ ট্যানারি মালিক সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকেন। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি মো. শাখাওয়াত উল্লাহ জানান, খেলাপি ঋণের অজুহাতে ব্যাংকগুলো অর্থ ছাড়ে না। সাভারে স্থানান্তরের পর থেকেই অধিকাংশ ট্যানারি লোকসানের মধ্যে রয়েছে। ফলে আড়তদারদের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও তারা চামড়া কিনতে পারছেন না। এতে ঈদের চামড়ার বাজার আরও অস্থিতিশীল হয়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এ বছর চামড়া সংরক্ষণের জন্য ২২৮ কোটি টাকা ঋণ বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও সংশ্লিষ্টদের ধারণা, শেষ পর্যন্ত বিতরণকৃত অর্থ ১০০ কোটিরও নিচে নেমে আসতে পারে। খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে দেশের সম্ভাবনাময় এই শিল্প আরও গভীর সংকটে নিমজ্জিত হবে।
সর্বশেষ হালনাগাদ 55 minutes আগে

