অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
চলতি বছরের জানুয়ারিতে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৩.২ শতাংশে—সাম্প্রতিক মাসগুলোর মধ্যে যা সর্বনিম্ন। এই হার কেবল একটি পরিসংখ্যানগত পতন নয়; বরং এটি বাণিজ্য প্রবাহের অস্থিরতা, আমদানি গতির মন্থরতা এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদার দুর্বলতার স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করছে। অর্থবছরের শুরুর দিকের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তুলনা করলে জানুয়ারির চিত্রটি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে।
অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) মাসভিত্তিক রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ছিল ১৮ থেকে ২৫ শতাংশের মধ্যে। প্রথমার্ধের বেশিরভাগ সময়ই প্রবৃদ্ধি দুই অঙ্কে অবস্থান করছিল। সেই ধারার বিপরীতে জানুয়ারিতে আকস্মিক এই ধস প্রশ্ন তুলেছে—অর্থনীতিতে যে পুনরুদ্ধারের আভাস দেখা যাচ্ছিল, তা কি টেকসই ছিল? জানুয়ারি মাসেই লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছে, যা সামষ্টিক অর্থ ব্যবস্থাপনায় বড় চাপ তৈরি করছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এর ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) রাজস্ব ঘাটতি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৬০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এই সময়ে প্রবৃদ্ধি প্রায় ১৩ শতাংশ হলেও ২ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ২ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে ঘাটতির চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
গত বাজেটের পর একটি অস্বাভাবিক সিদ্ধান্তে অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা আরও ৫৪ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ৫ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, গত সাত মাসে গড়ে মাসিক রাজস্ব আদায় ৩২ হাজার কোটি টাকারও কম। পুনর্নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে বাকি মাসগুলোতে গড়ে প্রতি মাসে ৬৬ হাজার কোটি টাকার বেশি আদায় করতে হবে—যা বর্তমান প্রবণতায় কার্যত অসম্ভব বলেই মনে করছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা।
রাজস্ব কাঠামোর উপাদান বিশ্লেষণ করলে মন্থরতার উৎস আরও স্পষ্ট হয়। জানুয়ারিতে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় আমদানি শুল্ক আদায় ১.৩১ শতাংশ কমেছে। মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আদায়ে প্রবৃদ্ধি মাত্র ২.৫৭ শতাংশ। আয়কর খাতে তুলনামূলক ভালো প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও সেটি মাত্র ৭ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ আমদানি ও ভোগ—দুই ক্ষেত্রেই গতি কমেছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে শ্লথতার প্রতিফলন।
আমদানি শুল্কের প্রায় ৯০ শতাংশ আদায় হয় চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজ-এর মাধ্যমে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জানুয়ারিতে ওই কাস্টমস হাউজে প্রায় ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তাহলে সামগ্রিক চিত্রে নিম্ন প্রবৃদ্ধি কেন—সে প্রশ্নের স্পষ্ট ব্যাখ্যা এখনো মেলেনি। এতে বোঝা যায়, অন্যান্য কাস্টমস স্টেশন বা অভ্যন্তরীণ ভ্যাট ও আয়কর প্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধিতে ধীরগতি রাজস্ব আদায়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের গতি কম, শিল্প উৎপাদনে সম্প্রসারণ সীমিত, এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ভোক্তা চাহিদা সংকুচিত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কর প্রশাসনের সক্ষমতার ঘাটতি—করজাল সম্প্রসারণ, করফাঁকি রোধ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা জোরদারে অগ্রগতি সীমিত। ফলে রাজস্ব কাঠামোতে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার কার্যকর হয়নি।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সরকার নির্বাচনি অঙ্গীকারে ফ্যামিলি কার্ড সম্প্রসারণ, কৃষি ঋণ মওকুফসহ বিভিন্ন সামাজিক ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রত্যাশিত রাজস্ব প্রবাহ নিশ্চিত না হলে বাজেট ঘাটতি বাড়বে, ঋণনির্ভরতা বৃদ্ধি পাবে এবং ব্যাংকিং খাতে চাপ তৈরি হবে। এতে সুদের হার, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ এবং সামষ্টিক স্থিতিশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সার্বিকভাবে জানুয়ারির নিম্ন প্রবৃদ্ধি একটি সতর্ক সংকেত। অর্থনীতিতে টেকসই গতি না এলে এবং রাজস্ব প্রশাসনে কাঠামোগত সংস্কার না ঘটলে চলতি অর্থবছর বড় ঘাটতি নিয়েই শেষ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রাজস্ব সংগ্রহ কেবল লক্ষ্যমাত্রা পূরণের বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও নীতিগত কার্যকারিতার প্রতিফলন। বর্তমান প্রবণতা বলছে, সামনে সরকারকে ব্যয়সংকোচন, অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাস এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় দ্রুত সংস্কারের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। ●
অকা/রা/ই/সকাল/২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 19 hours আগে

