অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
সংশোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হলেও শেষ দিকে এসে আবার ইতিবাচক ধারায় ফেরা দেশের দুই পুঁজি বাজারে গত সপ্তাহে বাজার মূলধনের বড় ধরনের উন্নতি ঘটেছে। পাঁচ কর্ম দিবসে ১৩-১৭ জুলাই দেশের প্রধান পুঁজি বাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজার মূলধন বেড়েছে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা। ১৩ জুলাই ছয় লাখ ৭৬ হাজার ৭৩৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা বাজার নিয়ে সপ্তাহ শুরু করা বাজারটির মূলধন ১৭ জুলাই দাঁড়ায় ছয় লাখ ৮৭ হাজার ৪৯৮ কোটি ২৯ লাখ টাকা, যা আগের সপ্তাহ অপেক্ষা ১ দশমিক ৫৯ শতাংশ বেশি।

গত সপ্তাহের প্রথম তিন কর্মদিবসে পুঁজি বাজারগুলো সংশোধনের শিকার হয়। তবে এ সময় সূচকের বড় কোনো অবনতি ঘটেনি। কিন্তু সংশোধন পরবর্তী শেষ দুই দিনে বাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি উন্নতির ধারায় ফিরে বাজার সূচক। ৫ হাজার ৬৮ দশমিক ০৩ পয়েন্ট থেকে সপ্তাহ শুরু করা ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গত সপ্তাহান্তে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ১৩২ দশমিক ৪৮ পয়েন্টে। ফলে ৬৪ দশমিক ৪৪ পয়েন্ট তথা ১ দশমিক ২৭ শতাংশ উন্নতি রেকর্ড করা হয় সূচকটির। একই সময় বাজারটির অন্য দুই সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ১ দশমিক ৪৭ ও ১ দশমিক ৭১ শতাংশ।

সূচকের পাশাপাশি এ সময়ে উন্নতি ঘটে ডিএসইর লেনদেনেও। গত সপ্তাহে ডিএসইর মোট লেনদেন ছিল তিন হাজার ৪০৮ কোটি ১২ লাখ টাকা, যা আগের সপ্তাহ অপেক্ষা ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ বেশি। আগের সপ্তাহে মোট লেনদেন ছিল দুই হাজার ৫৪৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।

এ দিকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ২০১৩ সালের নভেম্বরের কার্যকর হওয়া ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিমের পর্যালোচনা ও পুনঃমূল্যায়নের দাবি জানিয়েছে ঢাকা পুঁজি বাজারের স্টক ব্রোকারদের সংগঠন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ)।
১৭ জুলাই ডিবিএর প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম স্বারিত একটি চিঠি প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও পুঁজি বাজার উন্নয়ন কমিটির চেয়ারম্যান ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরীর কার্যালয়ে জমা দেয়া হয়। ওই চিঠির অনুলিপি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যানের বরাবরেও প্রদান করা হয়।

চিঠিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিমের অধীন ধারা নং-৪.১ (বি)(আই) উল্লেখ করে এর সংশোধনের জন্য সুপারিশ করা হয়। উল্লিখিত ধারায় ডিএসই পরিচালনা পর্ষদ ১৩ সদস্য বিশিষ্ট রয়েছে, যাদের মধ্যে সাতজন স্বতন্ত্র পরিচালক, চারজন ডিএসই শেয়ার হোল্ডার পরিচালক, একজন কৌশলগত বিনিয়োগকারীর প্রতিনিধিত্বকারী পরিচালক ও একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক এক্স-অফিসিও হিসেবে মনোনীত হওয়ার বিধান রয়েছে এবং পর্ষদ চেয়ারম্যান শুধু সাতজন স্বতন্ত্র পরিচালকদের মধ্য হতে মনোনীত হওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। এ বিধানের অধীনে পর্ষদ গঠনের এই ভারসাম্যহীনতার কারণে পূববর্তী সরকারের আমলে ডিএসইর পর্ষদ চেয়ারম্যানসহ স্বতন্ত্র পরিচালকদের রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেয়া হতো। এই স্বতন্ত্র পরিচালকদের মধ্যে অনেকেই পুঁজি বাজারবহির্ভূত খাত থেকে আসায় পুঁজি বাজার সম্পর্কে তাদের পর্যাপ্ত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা না থাকায় পুঁজি বাজারের উন্নয়নে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে সম হয়নি। এ ছাড়া মালিকানা স্বত্ববিহীন স্বতন্ত্র পরিচালকদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার উপস্থিতি পুঁজি বাজারসহ বাজার অংশীজনদের স্বার্থের পরিপন্থী সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছে।

আইনের এমন বিধান ও অনুশীলন পুঁজি বাজারকে রাজনীতিকরণের মাধ্যমে তৎকালীন সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। এর ফলে পুঁজি বাজারের সার্বিক শৃঙ্খলা নষ্ট হয়েছে। তিগ্রস্ত হয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। ভেঙে পড়েছে ডিএসইর প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি। এ অবস্থায় আমরা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সরকারের শাসনামলে এরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা করছি। এই অবস্থা থেকে পুঁজি বাজারকে এগিয়ে নিতে আমরা ডিএসই ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিমের উল্লিখিত ধারা নং- ৪.১(বি)(আই)-এর নিম্নরূপ সংশোধনের সুপারিশ করছি :
সুপারিশ (১): ডিএসই পরিচালনা পর্ষদ কাঠামোর পুনর্গঠন ও পরিবর্তন।

ডিএসই পরিচালনা পর্ষদ ১১ (এগারো) সদস্যবিশিষ্ট হবে, যাদের মধ্যে পাঁচজন স্বতন্ত্র পরিচালক, চারজন ডিএসই শেয়ার হোল্ডার পরিচালক, একজন কৌশলগত বিনিয়োগকারীর প্রতিনিধিত্বকারী পরিচালক ও একজন ব্যাবস্থাপনা পরিচালক এক্স-অফিসিও হিসেবে পর্ষদে নিযুক্ত হবেন। সে েেত্র ‘পর্ষদ চেয়ারম্যান’ এক্স-অফিসিও পরিচালক ব্যতিরেকে অন্য সব পরিচালকদের জন্য উন্মূক্ত থাকবে এবং পর্ষদ চেয়ারম্যান নতুন বোর্ড গঠনের পর প্রথম সভায় পর্ষদ সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হবেন। এর ফলে ডিএসইর পর্ষদ কাঠামোয় ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে সব কার্যক্রম ও সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা আসবে এবং পুঁজি বাজারের উন্নয়ন ও অগ্রগতি সাধিত হবে।

সুপারিশ (২) : ব্যবস্থাপনা পরিচালককে প্রধান নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তার (সিআরও) রিপোর্টিং কর্তৃপ হিসেবে মতায়ন।
ডিএসই বোর্ড ও অ্যাডমিনিস্ট্রেশন রেগুলেশন ২০১৩ এর ধারা নং- ১৬(১) ও ডিএসই ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিমের ধারা নং- ৫.২.২(বি) অনুসারে প্রধান নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা (সিআরও) সরাসরি রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স কমিটির (আরএসি) কাছে রিপোর্ট করবেন, তবে সিইওর কাছে প্রশাসনিক রিপোর্টিং থাকবে। ওই রেগুলেশনে এমডি/সিইওর কাছে সিআরওকে তার কার্যক্রম সম্পর্কিত রিপোর্ট প্রদানের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এর ফলে প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে ব্যবস্থাপনা পরিচালক পুঁজি বাজারের রেগুলেটরি বিষয়ে অবহিত থাকেন না। এ ধরনের সমন্বয়হীনতার কারণে রেগুলেটরি বিষয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সাথে বাজার অংশীজনের দূরত্ব সৃষ্টি করে এবং বাজার মধ্যস্থতাকারীদের মাঝে প্রত্যাশার ব্যবধান তৈরি হয়ে বাজারে আস্থাহীনতা বৃদ্ধি পায়।

এ বিষয়ে ডিবিএর সুপারিশ হলো ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রধান নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তার (সিআরও) রিপোর্টিং কর্তৃপ হিসেবে গণ্য হবেন এবং সেই েেত্র রেগুলেটরি সব কার্যক্রম ব্যবস্থাপনা পরিচালকের এখতিয়ারভুক্ত থাকবে। একই সাথে সিআরও ডিএসই রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স কমিটির নিকট তার রিপোর্টং অব্যাহত রাখবেন।

ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ডিএসইর কর্মকাণ্ড, কর্তৃত্ব ও তার এখতিয়ারভুক্ত পুঁজি বাজারের সব বিষয়ের জন্য দায়ী থাকেন ও জবাবদিহি করে থাকেন। তাই রেগুলেটরি বিষয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সম্যক অবগতি বাজার অংশগ্রহণকারীদের সাথে সমন্বয় বৃদ্ধি করবে এবং বাজার মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে আস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে।

সুপারিশ (৩) : ডিএসইসির সাংগঠনিক অর্গানোগ্রাম ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিম থেকে রহিতকরণ।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিমের ৪.৪.৩ (এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা) ধারায় ডিএসইর জন্য সুনির্দিষ্ট ও স্থায়ী একটি সাংগঠনিক অর্গানোগ্রামের রূপরেখা দেয়া আছে, যা এক্সচেঞ্জ পরিচালনায় সাংগঠনিক কাঠামো ও প্রয়োজনীয় পদ পরিবর্তনকে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে।

ডিবিএ মনে করে, সাংগঠনিক অর্গানোগ্রাম সংশোধন করার মতা কেবল ডিএসই পরিচালনা পর্ষদের উপর ন্যস্ত থাকা উচিত, যাতে এক্সচেঞ্জের প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি বিবেচনায় সময়োাপযোগী এবং কার্যকর সিদ্ধান্ত নেয়া যায়। এ জন্য ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিম থেকে উল্লিখিত ধারাটি বাদ দেয়া প্রয়োজন। এটি এক্সচেঞ্জকে মতায়িত করতে এবং একটি স্ব-নিয়ন্ত্রক সংস্থা (এসআরও) হিসাবে কাজ করতে সহায়তা করবে। ●

অকা/পুঁবা/ফর/বিকাল/২০ জুলাই, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 7 months আগে

Leave A Reply

Exit mobile version