অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

নন-লাইফ বীমা খাতে এজেন্ট কমিশন বাতিলের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এই নীতি কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে নন-লাইফ বীমা কোম্পানিগুলোর সব এজেন্ট লাইসেন্স স্থগিত করার প্রস্তুতিও চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই পরিবর্তন আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করতে শিগগিরই একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে, যেখানে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া, নির্দেশনা এবং সময়সীমা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে। পাশাপাশি গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃত্বের মাধ্যমেও কমিশন বাতিলের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার করা হবে।

এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ)-এর আবেদনের ভিত্তিতে ২৫ নভেম্বর আইডিআরএ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে। বৈঠকে খাতের প্রধান নির্বাহীরা, বিআইএ সভাপতি, আইডিআরএর সদস্য ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনার পর তারা সমঝোতায় পৌঁছান যে নন-লাইফ বীমা ব্যবসায় এজেন্ট কমিশন বাতিল করা হলে বাজারে স্বচ্ছতা বাড়বে, অনিয়ম কমবে এবং খাতে দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলা কাটিয়ে একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হবে। সভায় উপস্থিত সব প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কমিশন ছাড়া ব্যবসা পরিচালনার অঙ্গীকারও দেন।

তবে পরিবর্তিত নীতির ফলে নতুন বাস্তবতা সামনে আসায় কিছু ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। আলোচনায় অংশ নেওয়া একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, এজেন্ট কমিশন বন্ধ হলেও প্রয়োজনে নন-লাইফ বীমা কোম্পানিগুলো উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে পারবে। কিন্তু এই উন্নয়ন কর্মকর্তারা প্রিমিয়াম আদায়ে আর্থিক সুবিধা পেলে তা আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠতে পারে—কারণ বর্তমান বীমা আইন ২০১০-এর ৫৮(১) ধারা এবং এজেন্ট নিয়োগ-নিবন্ধন প্রবিধানমালা ২০২১ অনুসারে, প্রিমিয়ামের বিপরীতে কমিশন বা পারিশ্রমিক পাওয়ার বৈধ অধিকার কেবল নিবন্ধিত এজেন্ট বা ব্রোকারেরই রয়েছে। ফলে এজেন্ট কমিশন শূন্য করা হলেও আইন সংশোধন ছাড়া নতুন কাঠামো বাস্তবায়ন করলে নীতিগত জটিলতায় পড়তে পারে কর্তৃপক্ষ।

আইডিআরএ ও বিআইএ মিলে কমিশন বাতিল-পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে দুটি ভিজিল্যান্স টিম গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যারা বিশেষ করে অনিয়ম, গোপন কমিশন প্রদান বা ব্যাংক কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ আছে কি না—তা নজরে রাখবে। ব্যাংকিং চ্যানেলে কমিশন গ্রহণ বা ব্যবহারের অভিযোগ থামাতে বিআইএ সভাপতি ও আইডিআরএ চেয়ারম্যান শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলেও জানা গেছে।

বৈঠক শেষে আইডিআরএর অফিসিয়াল প্ল্যাটফর্মে দেয়া বার্তায় জানানো হয়, নন-লাইফ বীমা খাতে কমিশন বাতিলের বিষয়ে অংশীজনদের বিস্তৃত আলোচনার পর নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছে, এবং নির্দেশনা চূড়ান্ত করে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে তা কার্যকর করা হবে।

অন্যদিকে বিশ্লেষকদের মতে, কমিশন শূন্য করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বিদ্যমান আইন ও প্রবিধানমালার সীমাবদ্ধতা। আইন হালনাগাদ ছাড়া কমিশন তুলে দিলে ২০২১ সালের মতো ব্যবসায়িক বৈষম্য তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ কমিশন বাতিল করলে বীমা বিক্রয়ের প্রচলিত মডেল পুরোপুরি বদলে যাবে—প্রতিযোগিতার ধরন, ব্যবসা সংগ্রহের পদ্ধতি এবং বীমা প্রতিনিধিদের ভূমিকা নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার প্রয়োজন দেখা দেবে। ফলস্বরূপ, একটি নতুন নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রণয়ন করা ছাড়া কমিশন শূন্যকরণ স্থায়ীভাবে কার্যকর করা কঠিন হতে পারে।

সামগ্রিকভাবে, আইডিআরএর এই উদ্যোগকে খাতের দীর্ঘদিনের অনিয়ম দূরীকরণের সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হলেও সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করবে আইন সংশোধন, তদারকি ব্যবস্থার শক্তিশালীকরণ এবং কমিশন-নির্ভর বীমা কাঠামো থেকে বাজারকে ধীরে ধীরে একটি স্বচ্ছ, আধুনিক ও গ্রাহক-কেন্দ্রিক মডেলে রূপান্তরের ওপর।
অকা/বীখা/ই/সকাল/২৬ নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 2 months আগে

Leave A Reply

Exit mobile version