অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত শুল্ক আরোপের ফলে বিশ্বের পুঁজি বাজারে যে ধস নেমেছে তার প্রভাব থেকে অনেকটা বেঁচে গেছে দেশের পুঁজি বাজার। ৬ এপ্রিল ঈদ পরবর্তী প্রথম কর্মদিবসের শুরুতে বাজারগুলো বড় ধরনের দরপতনের শিকার হলেও শেষ দিকে দ্রুতই তা সামলে নেয়। দিনশেষে প্রধান পুঁজি বাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সূচকের সামান্য অবনতি ঘটলেও দেশের দ্বিতীয় পুঁজি বাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সব ক’টি সূচকের উন্নতি ঘটে। এ সময় বৃদ্ধি পেয়েছে উভয় পুঁজি বাজারের লেনদেনও।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমদানিযোগ্য পণ্যের ওপর অতিমাত্রায় পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণায় ৩ ও ৪ এপ্রিল খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ এশিয়া ও ইউরোপের পুঁজি বাজারে বড় ধরনের ধস নামে। এ দু’দিনে যুক্তরাষ্ট্রের এস অ্যান্ড পি (স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুউয়রস) ৫ লাখ কোটি ডলারের বেশি বাজার মূলধন হারিয়েছে, যা ২০২০ সালের কোভিডের সময় হারানো বাজার মূলধনের চেয়ে বেশি। সে সময় এ সূচকটি ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলার হারিয়েছিল। এ ছাড়া এ দু’দিনে সূচকটির ২০ শতাংশের বেশি অবনতি রেকর্ড করা হয়।
বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্প ও চামড়া শিল্পের রফতানির একটি বড় অংশের বাজার যুক্তরাষ্ট্রে। ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক আরোপের ফলে এ দেশটিতে বাংলাদেশী পণ্যের মূল্য বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে হ্রাস পেতে পারে রফতানি। দেশের পুঁজি বাজারে তৈরী পোশাক, টেক্সটাইলস ও চামড়া শিল্পের অনেক কোম্পানি তালিকাভুক্ত রয়েছে যাদের রফতানিযোগ্য পণ্যের একটি বড় অংশের গন্তব্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তাই ২ ও ৩ এপ্রিল বিশ্বের পুঁজি বাজারগুলোতে বড় দরপতনের ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্কিত ছিলেন দেশের পুঁজি বাজার সংশ্লিষ্টরা।
তবে এবারের ঘটনায় বিনিয়োগকারীরা অনেকটা পরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছেন। ৬ এপ্রিল দিনের শুরুতে বাজারগুলোতে সূচকের বড় ধরনের পতন ঘটতে দেখা গেলেও বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে বাজার পরিস্থিতি দ্রুতই পাল্টে যায়। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচকটি আগের ৫ হাজার ২১৯ দশমিক ১৬ পয়েন্ট থেকে শুরু করে প্রথম ২০ মিনিটে নেমে আসে ৫ হাজার ১৭৩ পয়েন্টে। এ পর্যায়ে সূচকটির প্রায় ৪৬ পয়েন্ট হারায় বাজারটি। পরে হারানো সূচকের অনেকটাই ফিরে পায় ডিএসই। দিনশেষে প্রধান সূচকটির ১৩ দশমিক ৯৬ পয়েন্ট অবনতি রেকর্ড করা হয়। তবে এ সময় ডিএসইর অন্য দু’টি সূচকের মধ্যে ডিএসই শরিয়াহ সূচকের দশমিক ২৮ পয়েন্ট অবনতি ঘটলেও মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলো দিয়ে গড়া ডিএসই-৩০ সূচকটি ১৪ দশমিক ৬৫ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। অন্য দিকে দেশের দ্বিতীয় পুঁজি বাজার সিএসইতে সূচকের উন্নতি ঘটে। এখানে সিএসই সার্বিক মূল্যসূচক ১৯ দশমিক ৪১ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৮৭ দশমিক ৬২ ও ১১ দশমিক ৬২ পয়েন্ট।
পুঁজি বাজার সংশ্লিষ্টরা দিনের বাজার আচরণে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ৬ এপ্রিল বিভিন্ন ব্রোকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীর সাথে বাজার পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে তারা বলেন, বিশ্ব অর্থনীতির অতীতের অনেক ঘটনাবলি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আমাদের পুঁজি বাজারের সাথে তা খুব বেশি সম্পর্কিত নয়। এ প্রসঙ্গে তারা ২০০৮-২০০৯ সালের বিশ্বমন্দার কথা উল্লেখ করে বলেন, ওই দুর্যোগপূর্ণ সময়ে বাংলাদেশের পুঁজি বাজারে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটেছিল। এখনো যদি বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত না হয়ে নিজেদের পরিপক্বতার পরিচয় দেন তাহলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হবেনা। তা ছাড়া এখন দেশের পুঁজি বাজারের মূল্যস্তর অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে কম। তাই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মনোভাব নিয়ে যারা এগিয়ে আসবেন তারাই ভালো করবেন।
৬ এপ্রিল দুই পুঁজি বাজারে দিনের শুরুতে কিছুটা নেতিবাচক প্রবণতা বিরাজ করলেও শেষ দিকে বেশ কিছু কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডকে দিনের মূল্যবৃদ্ধির সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে যেতে দেখা যায়। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ফার্মাসিউটিক্যাল খাত। এ খাতের বেশ কয়েকটি কোম্পানি দিনশেষে মূল্যবৃদ্ধির সর্বোচ্চ সীমায় লেনদেন হচ্ছিল। মিউচুয়াল ফন্ডের অনেক এ তালিকায় ছিল।
৬ এপ্রিল ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ তালিকার প্রথম স্থানটি দখলে রাখে বেক্সিমকো গ্রুপের ওষুধ খাতের কোম্পানি বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস। এদিন ৩০ কোটি ৭৩ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ২৯ লাখ ৯১ হাজার শেয়ার হাতবদল হয়। দিনের দ্বিতীয় অবস্থানটিও ছিল একই গ্রুপের কোম্পানি শাইন পুকুর সিরামিকসের। ১৮ কোটি ২৭ লাখ টাকায় ৬৬ লাখ ৬৩ হাজার শেয়ার বেচাকেনা হয় কোম্পানিটির। ডিএসইর লেনদেনে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে বিচ হ্যাচারি, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস, ইস্টার্ন হাউজিং, আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, উত্তরা ব্যাংক ও এবি ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড। চট্টগ্রাম শেয়ার বাজারেও লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় ছিল এ কোম্পানিগুলো।
দুই বাজারেই দিনের মূল্যবৃদ্ধির তালিকার শীর্ষে উঠে আসে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস। ঢাকায় ৯ দশমিক ৭৮ ও চট্টগ্রামে ১০ শতাংশ দাম বাড়ে কোম্পানিটির। দিনের মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ তালিকায় জায়গা করে নেয়া অন্য কোম্পানিগুলো ছিল যথাক্রমে এনসিসিবি ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, শাইন পুকুর সিরামিকস, আইসিবি এএমসিএল সেকেন্ড এনআরবি ফান্ড, মার্কেন্টাইল ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস, পিএইচপি ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, আইএফআইসি ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, পপুলার লাইফ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ও জনতা ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড।
দিনের দরপতনের তালিকায় প্রথমেই ছিল বিচ হ্যাচারিজ। ৬ এপ্রিল ৯ দশমিক ২৭ শতাংশ দর হারায় কোম্পানিটি। এ ছাড়া অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে হাক্বানি পেপার অ্যান্ড পাল্প ৮ দশমিক ১৬, হামিদ ফেব্রিক্স ৭ দশমিক ৪৩, সিমটেক্স ৭ দশমিক ৩১ শতাংশ দর হারায়। এ তালিকায় আরো ছিল যথাক্রমে নিউলাইন টেক্সটাইলস, মেট্রো স্পিনিং, ড্রাগন সোয়েটার অ্যান্ড স্পিনিং, আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ, ভিএসএফ থ্রেড ও মুন্নু ফেব্রিক্স লিমিটেড। ●
অকা/পুঁবা/ফর/রাত/৬ এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 11 months আগে
