রুনা হোসেন> 

বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একসময় যেখানে প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের প্রধান মাধ্যম ছিল টেলিভিশন, সংবাদপত্র কিংবা বিলবোর্ড, সেখানে এখন বিজ্ঞাপনের বড় অংশ চলে যাচ্ছে ফেসবুক, গুগল, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকের মতো আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। কোটি কোটি টাকার এই বাজার গত এক দশকে বিস্তৃত হলেও কার্যকর কোনো নিয়ন্ত্রক কাঠামো ছিল না। 

এই প্রেক্ষাপটে প্রথমবারের মতো ‘ক্রস-বর্ডার ডিজিটাল বাণিজ্য নীতিমালা, ২০২৬’-এর খসড়া প্রকাশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। নীতিমালায় বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের জন্য নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা, ভ্যাট ও কর পরিশোধ নিশ্চিত করা, সীমান্ত-পার অনলাইন বাণিজ্যে ভোক্তা সুরক্ষা জোরদার করা এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ সহজ করার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

বিদেশি প্ল্যাটফর্মকে নিবন্ধন ছাড়া ব্যবসা নয়

খসড়া অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিজ্ঞাপন প্রচার কিংবা অনলাইনে পণ্য ও সেবা বিক্রি করতে চাইলে বিদেশি ডিজিটাল প্রতিষ্ঠানকে আগে ডিজিটাল বিজনেস আইডেন্টিটি (ডিবিআইডি) নিবন্ধন নিতে হবে।

অর্থাৎ মেটা (ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম), গুগল, ইউটিউব, টিকটক কিংবা ভবিষ্যতে বাংলাদেশে ব্যবসা করতে আগ্রহী অন্য যেকোনো আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে দেশের আইনি কাঠামোর আওতায় আসতে হবে। নিবন্ধনের পর তাদের ভ্যাট, আয়করসহ প্রযোজ্য সব কর পরিশোধ করতে হবে এবং বাংলাদেশের প্রচলিত আইন মেনেই ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে।

এতদিন এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ লেনদেন সীমান্তের বাইরে সম্পন্ন হওয়ায় সরকারের পক্ষে প্রকৃত ব্যবসার পরিমাণ নির্ধারণ বা কর আদায় করা কঠিন ছিল। নতুন নীতিমালার মাধ্যমে সেই অবস্থার পরিবর্তন আনতে চায় সরকার।

কেন এ নীতিমালা জরুরি হয়ে উঠল?

বাংলাদেশে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের বাজার প্রতিবছর দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ক্রমেই প্রচলিত গণমাধ্যমের পরিবর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সার্চ ইঞ্জিনভিত্তিক বিজ্ঞাপনে বেশি বিনিয়োগ করছে।

কিন্তু এসব বিজ্ঞাপনের অর্থের বড় অংশ বিদেশে চলে গেলেও তার সুনির্দিষ্ট তথ্য সরকারের কাছে নেই। ফলে প্রকৃত বাজারের আকার, কর আদায় কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার বহিঃপ্রবাহ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এই নীতিমালা কার্যকর হলে ডিজিটাল অর্থনীতিকে প্রথমবারের মতো একটি সমন্বিত নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মধ্যে আনা সম্ভব হবে।

সরকারের রাজস্ব আয়ে নতুন সম্ভাবনা

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমানে বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পরিচালিত বিজ্ঞাপনের উল্লেখযোগ্য অংশ থেকেই সরকার প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় করতে পারছে না।

নিবন্ধন বাধ্যতামূলক হলে—

  • বিজ্ঞাপন বিক্রির নির্ভুল তথ্য সরকারের কাছে থাকবে।
  • ভ্যাট ও আয়কর আদায় আরও কার্যকর হবে।
  • অনিয়ন্ত্রিত অর্থপ্রবাহ ও সম্ভাব্য রাজস্ব ফাঁকি কমবে।
  • ডিজিটাল বিজ্ঞাপন বাজারের প্রকৃত আকার নির্ধারণ করা সহজ হবে।

ফলে সরকারের রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আন্তর্জাতিক ই-কমার্সেও নতুন নিয়ম

নীতিমালাটি শুধু ডিজিটাল বিজ্ঞাপনেই সীমাবদ্ধ নয়। বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠান যদি বাংলাদেশে অনলাইনের মাধ্যমে পণ্য বা সেবা বিক্রি করতে চায়, তাহলেও তাকে ডিবিআইডি নিবন্ধন নিতে হবে।

এর ফলে আন্তর্জাতিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোকে বাংলাদেশের করনীতি, ভোক্তা অধিকার আইন এবং ব্যবসায়িক বিধি মেনেই কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর মাধ্যমে বিদেশি ও দেশীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রও আরও ভারসাম্যপূর্ণ হবে।

ক্রেতার অর্থ থাকবে নিরাপদ

আন্তর্জাতিক অনলাইন কেনাকাটায় প্রতারণা কমাতে নীতিমালায় ক্রস-বর্ডার এসক্রো সেবা চালুর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই ব্যবস্থায় ক্রেতার অর্থ সরাসরি বিক্রেতার কাছে যাবে না। পণ্য বা সেবা যথাযথভাবে সরবরাহ হওয়ার পরই অর্থ বিক্রেতার কাছে হস্তান্তর করা হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে অনলাইন কেনাকাটায় আস্থা বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনে ভোক্তার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।

বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপনে কঠোর অবস্থান

খসড়া নীতিমালায় নকল ও ভেজাল পণ্যের বিজ্ঞাপন, প্রতারণামূলক প্রচারণা, বিভ্রান্তিকর দাবি, অনলাইন জুয়া, বেটিং, লটারি এবং আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ পণ্য ও সেবার ডিজিটাল বিপণনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।

এছাড়া বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ভোক্তাকে বিভ্রান্ত করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে।

ভোক্তা সুরক্ষায় নতুন বাধ্যবাধকতা

যদি কোনো পণ্য নকল, ত্রুটিপূর্ণ, চুক্তির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বা মেয়াদোত্তীর্ণ হয়, তাহলে বিক্রেতাকে তা ফেরত নিতে হবে এবং একই পেমেন্ট মাধ্যম ব্যবহার করে সম্পূর্ণ অর্থ ফেরত দিতে হবে।

পাশাপাশি ওয়ারেন্টি, গ্যারান্টি, বিক্রয়োত্তর সেবা ও রিফান্ড নীতিও আগেই স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বৈশ্বিক বাজারের দুয়ার

নীতিমালার অন্যতম ইতিবাচক দিক হলো ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ সহজ করার উদ্যোগ।

এ জন্য পার্সেলভিত্তিক রপ্তানি সহজ করা, আন্তর্জাতিক বাজার সম্পর্কে তথ্য সহায়তা, ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী পণ্য উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধি, সম্ভাব্য রপ্তানি প্রণোদনা এবং বিদেশে প্রসেসিং সেন্টার ও ওয়্যারহাউস স্থাপনে নীতিগত সহায়তার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও আন্তর্জাতিক ডিজিটাল বাণিজ্যে আরও শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে পারবেন।

বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

যদিও নীতিমালার উদ্দেশ্য অত্যন্ত ইতিবাচক, তবে বাস্তবায়নকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশেরই বাংলাদেশে স্থায়ী কার্যালয় নেই। ফলে তাদের নিবন্ধন, তথ্য সরবরাহ, কর পরিশোধ এবং আইনের আওতায় আনা সহজ হবে না।

এ জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ ব্যাংক, বিটিআরসি, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতসংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য হবে।

জনমত শেষে চূড়ান্ত হবে নীতিমালা

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আগামী ৬ আগস্ট পর্যন্ত খসড়া নীতিমালার ওপর জনমত গ্রহণ করবে। অংশীজনদের মতামত পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন শেষে এটি চূড়ান্ত করা হবে।

ডিজিটাল অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় সীমান্ত পেরিয়ে বিজ্ঞাপন ও বাণিজ্য এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং নিয়মে পরিণত হয়েছে। সেই বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশও প্রথমবারের মতো একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিগত কাঠামো গড়ে তুলতে যাচ্ছে।

নীতিমালাটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে, বিদেশি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত হবে, ভোক্তার সুরক্ষা জোরদার হবে এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য বৈশ্বিক ডিজিটাল বাজারে প্রবেশের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

লেখিকা : গণমাধ্যমকর্মী

 

Leave A Reply

Exit mobile version