শহীদুল্লাহ খান>

বাংলাদেশের অর্থনীতির গল্পে যুক্তরাষ্ট্রের নাম বারবার ফিরে আসে। কারণ, দেশের সবচেয়ে বড় একক রপ্তানি বাজার এটি। লাখো শ্রমিকের ঘাম, হাজারো কারখানার উৎপাদন আর বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্গে এই বাজারের সম্পর্ক গভীর।

তাই যুক্তরাষ্ট্র যখন বাংলাদেশের কিছু পণ্যের ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে, তখন বিষয়টি শুধু একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে শিল্পে, কর্মসংস্থানে, বিনিয়োগে এবং ভবিষ্যতের রপ্তানি কৌশলেও।

অনেকে বলতে পারেন, ১০ শতাংশই তো। এত উদ্বেগের কী আছে?

বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনেক সময় এক বা দুই শতাংশ মূল্য পার্থক্যই একটি অর্ডারের ভাগ্য বদলে দেয়। সেখানে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক মানে বাংলাদেশের পণ্য হঠাৎ করেই তুলনামূলক ব্যয়বহুল হয়ে ওঠা। ক্রেতারা তখন স্বাভাবিকভাবেই অন্য বিকল্প খুঁজবেন। সবচেয়ে বড় চাপ পড়বে তৈরি পোশাক খাতে, যেখান থেকে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে।

তবে এই সিদ্ধান্তকে শুধু শুল্ক বাড়ানোর ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে।

বিশ্ব বাণিজ্যের নিয়ম দ্রুত বদলাচ্ছে। আগে প্রতিযোগিতা হতো মূলত দামে। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি প্রশ্ন—পণ্যটি কীভাবে তৈরি হয়েছে? শ্রমিকের অধিকার রক্ষা হয়েছে কি? কাঁচামালের উৎস কতটা স্বচ্ছ? উৎপাদন প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মান মেনে চলছে কি না?

অর্থাৎ এখন শুধু ভালো পণ্য বানালেই হবে না, ভালোভাবে পণ্য বানানোর প্রমাণও দেখাতে হবে।

বাংলাদেশের জন্য এটাই সবচেয়ে বড় বার্তা।

গত দুই দশকে দেশের রপ্তানি খাত অসাধারণ সাফল্য দেখিয়েছে। কিন্তু সেই সাফল্যের বড় অংশই এসেছে তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয় এবং দক্ষ শ্রমশক্তির কারণে। এখন সেই সুবিধা একাই যথেষ্ট নয়। বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে হলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এবং শ্রমমান—সবকিছুকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

এই মুহূর্তে সরকারের সামনে দুটি বড় দায়িত্ব রয়েছে। প্রথমটি কূটনৈতিক। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে শুল্ক-সংক্রান্ত উদ্বেগ কমানোর চেষ্টা করতে হবে। দ্বিতীয়টি অভ্যন্তরীণ। শিল্প খাতকে এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করা বাংলাদেশের জন্য বাড়তি চাপ নয়, বরং স্বাভাবিক চর্চায় পরিণত হয়।

একই সঙ্গে আরেকটি বাস্তবতা ভুলে গেলে চলবে না। বাংলাদেশের রপ্তানির বড় অংশ এখনো হাতে গোনা কয়েকটি বাজারের ওপর নির্ভরশীল। একটি বাজারে নীতিগত পরিবর্তন এলেই পুরো অর্থনীতিতে তার অভিঘাত লাগে। তাই নতুন বাজার খোঁজা এখন আর বিকল্প নয়, প্রয়োজন।

ভালো খবরও আছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপর সর্বোচ্চ শুল্ক আরোপ করেনি। অনেক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশও একই ধরনের কিংবা আরও বেশি চাপের মুখে রয়েছে। অর্থাৎ প্রতিযোগিতা থেকে বাংলাদেশ এখনো ছিটকে যায়নি। তবে এই অবস্থান ধরে রাখতে হলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

প্রতিটি সংকট একটি প্রশ্ন রেখে যায়—আমরা কি শুধু ক্ষতি হিসাব করব, নাকি নিজেদের বদলে নেওয়ার সুযোগও দেখব?

 

লেখক : দক্ষিণ আফ্রিকা প্রবাসী ব্যবসায়ী, কবি ও লেখক।

সর্বশেষ হালনাগাদ 2 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version