মেধা, দক্ষতা, দূরদর্শিতা এবং প্রগতিশীল চিন্তার সমন্বয় ঘটিয়ে যিনি নিজেকে বীমা শিল্পে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি হলেন দেশের অন্যতম জীবন বীমা প্রতিষ্ঠান প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. জালালুল আজিম। বিসিএস (রেলওয়ে) ক্যাডারসহ দীর্ঘ ৩৫ বছরের বহুমূখী পেশার অধিকারী মো. জালালুল আজিম তাঁর বর্ণিল কর্মজীবনের ২৫ বছর কাটিয়েছেন বীমা প্রতিষ্ঠানে। প্রতিভাবান এই বীমা ব্যক্তিত্ব ২০১৩ সালে প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা এর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রগতি লাইফে যোগদানের পূর্বে তিনি ডেল্টা লাইফ ইনসিওরেন্স কোম্পানী লিমিটেড ও নন লাইফ বীমা প্রতিষ্ঠান প্রগতি ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড এ ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডকে একটি আধুনিক ও প্রযুক্তি নির্ভর গুণগত মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলছেন। তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত ও দক্ষ নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক সেবায় পরিবর্তনের ধারা সূচিত হয়েছে। সুদীর্ঘ ৯ বছরে তিনি প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্সকে গুণগত ব্যবসায়িক উন্নতি যুক্ত করেছেন। ২০২০-২১ সালে কোভিড-১৯ অতিমারীতে বিশ্বের অর্থনীতি যেখানে মুখ থুবড়ে পড়ে, সেখানে তাঁর দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বে প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্সের উন্নয়নের পথ দেখিয়েছে।

টাঙ্গাইল জেলার মধুপুরে ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণকারী অত্যন্ত মেধাবী মো. জালালুল আজিম ঢাকা বিভাগ থেকে এসএসসি ও ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি প্রথম বিভাগে পাস করেন। ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষি প্রকৌশল বিষয়ে ১ম শ্রেণীতে ১ম স্থান অধিকার করে স্নাতক (প্রকৌশল) ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ১৯৮৯-৯১ শিক্ষা বর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ (ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট) থেকে এমবিএ ডিগ্রি লাভ করেন। আমেরিকার লাইফ ম্যানেজমেন্ট ইনষ্টিটিউটের একজন ফেলো (এফএলএমআই) তিনি। তাছাড়া তিনি দেশের কাষ্টমার সার্ভিসেস ইনষ্টিটিউট থেকে প্রফেশনাল কাস্টমার সার্ভিসেস (পিসিএস) ডিপ্লোমা লাভ করেন। বীমা কোম্পানিতে যোগদানের আগে মো. জালালুল আজিম ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানীতে (বিটিসি) কর্মরত ছিলেন। এছাড়া তিনি একজন প্রাক্তন বিসিএস ক্যাডারভূক্ত কর্মকর্তা। ১০তম বিসিএস (রেলওয়ে) উত্তীর্ণ হয়ে তিনি বাংলাদেশ রেলওয়েতে কর্মরত ছিলেন। বীমা কোম্পানিতে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় আমেরিকান লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীতে (অ্যালিকো) যোগদানের মাধ্যমে। অ্যালিকোতে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত ছিলেন এবং ২০০২-২০০৬ সাল পর্যন্ত এজেন্সী ডাইরেক্টর পদে দায়িত্ব পালন করেন। অ্যালিকোতে তিনি তাঁর কর্ম দক্ষতার জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯৬ সালে তিনি অ্যালিকো মিডেল ইস্ট, আফ্রিকা এবং সাউথ এশিয়া অঞ্চলের সেরা কর্মকর্তার সম্মানে ভূষিত হন। এছাড়া এজেন্সী ডাইরেক্টরের দায়িত্ব পালনকালে ২০০২ ও ২০০৩ সালে টানা দুই বছর আলিকো ওয়ার্ল্ডে সেরা এজেন্সী ডাইরেক্টর হিসেবে পুরস্কৃত হন। সৃজনশীলতা ও অভিজ্ঞতা তাঁকে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার পথ দেখিয়েছে।

মো. জালালুল আজিম বীমায় তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে উপলব্ধি করেছেন বীমা কোম্পানিতে প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা। তাঁর এই উপলব্ধির ফসল হিসেবে তিনি প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স ও প্রগতি ইন্স্যুরেন্সের জন্য স্বয়ং সম্পূর্ণ একটি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট গড়ে তুলেন যা প্রগতি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট নামে প্রতিষ্ঠিত। আধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্বলিত এই ট্রেনিং ইনস্টিটিউট প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড ও প্রগতি ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড এর কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কাজের দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে যা বীমা শিল্পের সার্বিক সমৃদ্ধিতে বিশেষ অবদান রাখছে।

পারিবারিক জীবনে মো. জালালুল আজিম যমজ কন্যা সন্তানের জনক। সহধর্মিণী একজন দক্ষ গৃহিনী এবং জীবন সঙ্গিনী হিসেবে তাঁর সহায়ক শক্তি। কন্যাদ্বয়কে সম্ভ্রান্ত পরিবারে বিয়ে দিয়েছেন। সংসার জীবনে তিনি পিতামহও। সফল এই বীমা ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশের বীমা পেশাজীবীদের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। দেশের প্রতিটি মানুষের মাঝে বীমা সুবিধা পৌঁছে দেয়া তাঁর স্বপ্ন। সে ধারনায় তিনি ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা, শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের জন্য জীবন বীমা এবং দেশের সাধারণ জনগণের জন্য পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যবীমাসহ অনেক উদ্ভাবনী জীবন ঘনিষ্ঠ বীমা পরিকল্প চালু করেছেন। মেধা ও দক্ষতার সমন্বয়ে মো. জালালুল আজিম বীমা শিল্পকে তথা দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন।

সম্প্রতি জীবন বীমার সমসাময়িক বিষয় নিয়ে উপস্থিত হয় সত্য প্রকাশে অবিচল অর্থনীতির কাগজ অর্থকাগজ। রাজধানীর কাওরান বাজারস্থ প্রগতি ইন্স্যুরেন্স ভবনে প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর প্রধান কার্যালয়ে অভিজ্ঞ ও প্রজ্ঞাবান এ বীমা ব্যক্তিত্ব মো. জালালুল আজিমের সঙ্গে বীমা নিয়ে বিস্তারিত আলাপ হয়। প্রশ্নের উত্তরগুলো তিনি সহজ ও সাবলীলভাবে অর্থকাগজ প্রতিনিধির কাছে ব্যক্ত করেছেন।  সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন  জ্যৈষ্ঠ প্রতিবেদক  তারেক আবেদীন

অর্থকাগজ ● দেশি বিদেশী বড় বড় প্রতিষ্ঠানে জীবন বীমা ব্যবসা পরিচালনায় আপনার রয়েছে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা। দীর্ঘ সময়ের সে কর্মধারায় মেধাবী বীমা ব্যক্তিত্ব হিসেবে জীবন বীমার অতীত বর্তমানের ভালোমন্দের বিশেষ দিকগুলো জানতে চাই?

জালালুল আজিম ● বাংলাদেশের জীবন বীমা শিল্পের গোড়াপত্তন ১৯৭৩ সালে জীবন বীমা কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শুরু হয়। এরপর গত ৫০ বছর পর্যায়ক্রমে বিপুল সংখ্যক কোম্পানি বাজারে প্রবেশের সঙ্গে শিল্পটির কার্যক্রম দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। শুরু থেকেই বাংলাদেশের জীবন বীমা শিল্প বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিল, যার মধ্যে ছিল জীবন বীমা সম্পর্কে জনসচেতনতার অভাব, দুর্বল একটি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এবং নিম্ন হারের বীমা ‘পেনিট্রেশন’। এরপর ১৯৮৫ সাল থেকে বীমা শিল্পের বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ শুরু হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে ৩৫টি জীবন বীমা কোম্পানি রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ ৩৮ বছরেও অধিকাংশ মানুষের জীবন ও সম্পদ বীমার আওতায় না থাকার কারণে দেশের জিডিপিতে এই খাতের অবদান বেশ নগণ্য। বাংলাদেশের বীমা খাত অন্যান্য দেশের মতো জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারছে না। উন্নত দেশে বীমা খাতের গড় অবদান যেখানে ৭ শতাংশ, সেখানে আমাদের দেশে বীমা খাতের অবদান মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশের নিচে। বীমা প্রিমিয়ামে মাথাপিছু ব্যয় মাত্র ৯ ডলার যা বিশ্বে সর্বনিম্ন। সর্বনিম্ন অবস্থানই খাতটির পরিধি বাড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছে। দেশের মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবন বীমা ছাড়াও কৃষি, বাণিজ্য খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বীমার আওতা বাড়ানোর মাধ্যমে ভবিষ্যতে বীমা খাত আরও ব্যাপকভাবে বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যাই হোক, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার এবং নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বীমা শিল্পের বৃদ্ধি এবং বিকাশের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। দেশের জনগণের জীবন ও সম্পদ বীমার আওতায় আনার লক্ষ্যে সরকার জাতীয় বীমা নীতি -২০১৪ গ্রহণ করেছে। জাতীয় বীমা নীতি যথাযথভবে বাস্তবায়ন করতে পারলে বীমা খাতে বিদ্যমান অধিকাংশ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। জিডিপিতে বীমা খাতের  ৪ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অসম্ভব নয়।

তবে বীমা শিল্প প্রসারে কতিপয় কোম্পানির বীমা দাবি পরিশোধে অসক্ষমতা গ্রাহকের মাঝে আস্থার সংকট তৈরি করছে। এই বাধা দূর করতে প্রয়োজন বীমা কোম্পানিগুলোর স্বচ্ছতা, সময়মতো বীমা দাবি পরিশোধের ব্যবস্থা করা। এ খাতে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করা গেলে খাতটি যেমন বড় হবে, তেমনি মানুষের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তাও বাড়বে।

অর্থকাগজ ● নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে পেশাদার নির্বাহী না অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাকে কে বেশি প্রয়োজনীয় বলে আপনি মনে করেন?

জালালুল আজিম ● বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এর প্রধান হিসেবে একজন পেশাদার প্রধান নির্বাহী বা একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তার মধ্যে কে বেশি প্রয়োজনীয় তা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দিষ্ট পরিস্থিতি এবং প্রেক্ষাপটের ওপর নির্ভর করে।

শিল্প বা বীমা খাতের অভিজ্ঞ এবং দক্ষ একজন পেশাদার প্রধান নির্বাহী নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়ায় স্বভাবতই মূল্যবান অবদান রাখতে পারেন। নিদিষ্ট খাত সম্পর্কে গভীর ধারণা ও সেই সঙ্গে নেতৃত্ব প্রধানের গুণাবলীর জন্যই তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী হয়েছেন। তাই প্রবিধান ও নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে তার বাস্তব অভিজ্ঞতা ও বিবেচনার ওপর ভিত্তি করে সিদ্বান্ত নিতে পারেন। যেহেতু তিনি সংশ্লিষ্ট খাতের সুবিধা ও অসুবিধা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, সেহেতু নিয়ন্ত্রক সংস্থায় প্রধান হিসেবে তার অভিজ্ঞতা অনুসারে সুনিদিষ্ট পরিবর্তন আনতে পারেন, যা ওই খাত সংশ্লিষ্ট ভোক্তাদের চাহিদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে।

অন্যদিকে, অবসরপ্রাপ্ত একজন সরকারি কর্মকর্তা সরকারী প্রশাসন, নীতি-নির্ধারণ এবং প্রবিধানে প্রণয়নে অভিজ্ঞ হতে পারেন। তার রাজনৈতিক পরিবেশ সম্পর্কে গভীর ধারণা থাকতে পারে, যা নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের জটিল বিষয়গুলোর সমাধান করতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে পারে।

অর্থকাগজ ● বাজারের বিবেচনায় লাইফ কোম্পানি অধিকতর মনে হয় বলে অনেকে মত দিয়েছেন। ১০/১২টি কোম্পানি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। এদের মধ্যে ক’টি কোম্পানি মূলধন ভেঙ্গে চলছে! এর প্রতিকারের উপায় কি?

জালালুল আজিম ● বাংলাদেশে বেশ কিছু সংখ্যক জীবন বীমা কোম্পানি অস্তিত্ব¡ সংকটে ভূগছে। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক! এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সমাধান করার জন্য কয়েকটি কার্যক্রম বিবেচনা করা যেতে পারে-

নিয়ন্ত্রক তদারকিকে শক্তিশালী করা- নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা শিল্পের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা কোম্পানিগুলির পরিচালনার জন্য কঠোর নির্দেশ প্রদান করা যেতে পারে। সেই সঙ্গে প্রদত্ত নীতিমালা বা প্রবিধানগুলোর বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে এবং ব্যর্থ কোম্পানিকে জরিমানা করা নিয়ন্ত্রকের কাজ হতে পারে।

কর্পোরেট গভর্ন্যান্সের উন্নতি - ঝুঁকি ও সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনায় কোম্পানিগুলোর উচিত সুষ্ঠু কর্পোরেট গভর্নেন্স অনুশীলন নিশ্চিত করা। এর মধ্যে কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষণ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন, আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং গ্রাহকদের বীমা দাবী প্রদানের জন্য পর্যাপ্ত লাইফ ফান্ড নিশ্চিত করা।

পেশাদারিত্ব বৃদ্ধি করা - বীমা শিল্পে পেশাদারদের জন্য প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে আচরণবিধি এবং  নৈতিকতা উৎসাহিত করে পেশার উন্নতি করা যেতে পারে।

অর্থকাগজ ● বীমা মালিক ও প্রধান  নির্বাহীদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশন (বিআইএ) এর কমিটিতে আপনি যুক্ত। পর্ষদ অনেক সময় সৎ নির্বাহীকে বিনা কারণে কোম্পানি থেকে চলে যেতে বাধ্য করে। নির্বাহীর নিরাপত্তায় বিআইএ কি ভূমিকা রাখতে পারে?

জালালুল আজিম ● বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) বীমা কোম্পানিসমূহের প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে নৈতিক ও ন্যায্য আচরণের পক্ষে এবং কর্পোরেট গভর্নেন্সের সর্বোত্তম অনুশীলন প্রচারের মাধ্যমে প্রধান নির্বাহী নিরাপত্তাকে সমর্থন করার জন্য ভূমিকা পালন করতে পারে। যদিও (বিআইএ) এর পৃথক কোম্পানির ওপর নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতো সরাসরি কোন কর্তৃত্ব নেই, এটি শুধু বীমা শিল্পে নৈতিক আচরণ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে কাজ করতে পারে।

বিআইএ প্রধান নির্বাহীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নির্বাহীদের নিয়োগ এবং বহিস্কারের ক্ষেত্রে অধিকতর স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে।

অর্থকাগজ ● অনলাইনে লেনদেন কি বীমা গ্রাহককে শতভাগ সুরক্ষা দিতে পারছে?

জালালুল আজিম ● যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অনলাইন বা ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রিমিয়াম প্রদান শতভাগ নিরাপদ। এতে এজেন্টের দ্বারা গ্রাহকের প্রিমিয়াম আত্মসাৎ হওয়ার কোন সম্ভাবনা থাকে না। আমাদের কোম্পানিতে কোন গ্রাহক যখন তার ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে অনলাইনে প্রিমিয়াম পরিশোধ করেন, তাকে তাৎক্ষণাৎ এসএমএস ও ডিজিটাল রশিদ এর মাধ্যমে তার প্রিমিয়াম জমা সংক্রান্ত তথ্য প্রদান করা হয়, ঠিক একইভাবে মোবাইল ব্যাংকিং পদ্ধতিতে প্রিমিয়াম প্রদানের ক্ষেত্রেও গ্রাহককে এসএমএস এর মাধ্যমে তার প্রিমিয়াম জমা সংক্রান্ত তথ্য প্রদান করা হয়। আমি মনে করি এটি দ্রুত এবং ঝামেলামুক্ত প্রিমিয়াম প্রদান পদ্ধতি। এতে গ্রাহককে বীমা অফিসে অথবা ব্যাংকে যাতায়াত করে তার মূল্যবান সময় নষ্ট করতে হয় না।

তবে জালিয়াতি বা নিরাপত্তা লংঘনের ঝুঁকি কমানোর জন্য, বীমা কোম্পানিগুলিকে  গ্রাহকের তথ্য রক্ষা করতে এবং তাদের সিস্টেমে অননুমোদিত অ্যাক্সেস রোধ করতে এনক্রিপশন, ফায়ারওয়াল এবং শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা উচিত।

অর্থকাগজ ● অনেক বীমা কর্মকর্তা ও কর্মীকে দেখা যায় মাঠে অপরাধ ও প্রতারণা করে অন্য কোম্পানিতে যোগ দিচ্ছে ? এতে করে আস্থার জায়গাটি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দেশীয় কোম্পানির বীমা বাজার প্রসারে কি কি ক্ষতি হচ্ছে বলে আপনার ধারনা? এ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের কি কি করণীয় হতে পারে?

জালালুল আজিম ● বীমা কর্মকর্তা এবং কর্মীদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং গ্রাহকের প্রিমিয়াম আত্মসাতের ঘটনা বীমা শিল্পে আস্থার সংকট আরও বাড়িয়ে তুলছে। অধিকাংশ সময় দেখা যায়, তার এক কোম্পানির গ্রাহকের প্রিমিয়াম আত্মসাৎ করে করে আরেকটি কোম্পানিতে যোগদান করে। এর ফলে গ্রাহকদের মধ্যে বীমা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরী হয় যা বীমা শিল্পের সম্প্রসারণকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

এই ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা কোম্পানির প্রমাণসহ অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রতারণামূলক কার্যকলাপে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে জরিমানা, লাইসেন্স প্রত্যাহারসহ ফৌজদারি অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত করে প্রবিধান বা নীতিমালা কার্যকর করতে পারে।

অর্থকাগজ ● ‘সকল যাত্রী বীমাকৃত’ এমন স্লোগান আমরা যাত্রীবাহী পরিবহনে দেখতে পাই। বিষয়টি সম্পর্কে আপনার বক্তব্য জানতে চাই।

জালালুল আজিম ● যাত্রী পরিবহনে সকল যাত্রী বীমাকৃত স্লোগানটি সাধারণ যাত্রীদের জন্য একটি ইতিবাচক লক্ষণ নির্দেশ করেছে; পরিবহন কোম্পানি দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে আমি মনে করি এর সঙ্গে সঙ্গে যে বীমা কোম্পানি সম্পৃক্ত সেই কোম্পানির নাম এর সঙ্গে যুক্ত করে দেয়া প্রয়োজন। এতে করে ইতিবাচক পদক্ষেপটির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যাবে। সেই সঙ্গে যাত্রীদের জন্য এই বীমা পলিসি কি ধরনের বীমা কাভারেজ রয়েছে তা যথাযথভাবে উল্লেখ করা। অর্থাৎ যাত্রীদের জন্য বীমা পলিসির শর্তাবলী মনোযোগ সহকারে পড়া এবং কোনটি কভার করা হয়েছে এবং কোনটি নয় তা বোঝা অপরিহার্য।

অর্থকাগজ ● কী কী গুণাবলী থাকলে একটি কোম্পানিকে সফল বীমা কোম্পানি বিবেচনা করা যায়?

জালালুল আজিম ● সফল একটি বীমা কোম্পানির সাধারণত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গুণাবলী থাকে যা একে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে উৎকর্ষ লাভে সাহায্য করে। এখানে কিছু গুণাবলী রয়েছে যা একটি সফল বীমা কোম্পানির সূচক হিসাবে বিবেচিত হতে পারে-

আর্থিক স্থিতিশীলতা - সফল একটি বীমা কোম্পানির একটি শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি থাকা উচিত, যেখানে দাবি পরিশোধ করতে জন্য যথেষ্ট লাইফ ফান্ড বা রিজার্ভ থাকতে হবে।

বৈচিত্রপূর্ণ পরিকল্প - বিভিন্ন গ্রাহক চাহিদা বিবেচনা করে বিস্তৃত পরিসরের বীমা পরিকল্প এবং পরিষেবা প্রদানের সক্ষমতা থাকতে হবে।

গ্রাহক কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি - বীমা গ্রাহকদের চাহিদাগুলিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে গ্রাহক পরিষেবা নিশ্চিত করতে হবে।

উদ্ভাবনী প্রক্রিয়া চালু রাখা - সফল একটি বীমা কোম্পানিকে অন্য কোম্পানি থেকে এগিয়ে থাকার জন্য তার গ্রাহকদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে ক্রমাগতভাবে উদ্ভাবন কার্যক্রম চালু রাখতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করা, নতুন পরিকল্প তৈরি করা এবং নতুন ব্যবসায়িক মডেল অন্বেষণ করা।

সুদৃঢ় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা - বীমা কোম্পানিগুলোকে অবশ্যই কার্যকরভাবে ঝুঁকি পরিচালনা করতে সক্ষম হতে হবে; বীমা অবলিখনের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

দক্ষ নেতৃত্ব - যে কোনো কোম্পানির সাফল্যের জন্য কার্যকর নেতৃত্ব অপরিহার্য। সফল একটি বীমা কোম্পানির সিইও বা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঠিক কৌশলগত সিদ্ধান্ত ও দূরদৃষ্টি কোম্পানিকে স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি এবং লাভের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

নৈতিক এবং স্বচ্ছতা অনুশীলন - বীমা কোম্পানির প্রসারের জন্য বিশ্বাস অপরিহার্য এবং সফল একটি বীমা কোম্পানিকে তার ব্যবসার সমস্ত দিকগুলিতে নৈতিক এবং স্বচ্ছ অনুশীলন প্রদর্শন করা উচিত।

সামগ্রিকভাবে, সফল একটি বীমা কোম্পানিকে অবশ্যই আর্থিক স্থিতিশীলতা, বৈচিত্রপূর্ণ পরিকল্প সম্ভার, গ্রাহক সেবা, উদ্ভাবন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, দক্ষ নেতৃত্ব এবং একটি প্রতিযোগিতামূলক বাজারে উন্নতির জন্য নৈতিক ও স্বচ্ছ অনুশীলনের সমন্বয় থাকতে হবে।

অর্থকাগজ ● নতুন জীবন বীমা কোম্পানির অনুমোদন দেওয়া কি যুক্তিসঙ্গত হবে?

জালালুল আজিম ● ১৭ কোটি জনসংখ্যার এ দেশে বর্তমানে ৮২টি নিবন্ধিত বীমা কোম্পানি বীমা ব্যবসা পরিচালনা করছে, যার মধ্যে ৩৫টি জীবন বীমা কোম্পানি। বাংলাদেশের বাজারের আকৃতি অনুযায়ী নিবন্ধিত বীমা কোম্পানির এ সংখ্যা অত্যন্ত বেশি। পার্শ্ববর্তী বিশাল জনসংখ্যার দেশ ভারতে এত সংখ্যক বীমা কোম্পানি নেই। ২০১৩ ও ২০১৪ সালে ১৪টি লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানিকে ব্যবসা পরিচালনার জন্য অনুমোদন দেয়া হয়েছে, যার মধ্যে একটি বা দুইটি কোম্পানির আশানুরূপ ব্যবসা অর্জন করতে পেরেছে। এছাড়া অন্যান্য কোম্পানির লাইফ ফান্ড নেতিবাচক, বীমা গ্রাহকদের দাবির টাকা পরিশোধে নানা ধরনের গড়িমসি করে সময় মত দাবি পরিশোধ না করা ইত্যাদি বীমা শিল্পের ইমেজ নষ্ট করছে। এছাড়া বীমা শিল্পে দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে, বর্তমানে অধিকাংশ কোম্পানি দক্ষ জনবলের অভাবে যথাযথ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন কোনো লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির অনুমোদনের কোন যৌক্তিক কারণ আছে বলে আমি মনে করি না।

অর্থকাগজ ● বীমা উন্নয়নে বিশ্বায়ন ও আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োজনীয়তা কতটুকু?

জালালুল আজিম ● বীমা উন্নয়নেও বিশ্বায়নের সঙ্গে খাপ খাইয়ে পথ চলা জরুরি। এ জন্য দক্ষ প্রযুক্তি নির্ভর থাকা উচিত। বিশেষত বীমা গ্রাহকদের দ্রুত ও যুগোপযোগী সেবা প্রদানের জন্য তথ্য প্রযুক্তির কোন বিকল্প নেই। সেই লক্ষ্যে কর্মক্ষেত্রে প্রগতি লাইফকে সম্পূর্ণরূপে ডিজিটাল পদ্ধতির তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর জীবন বীমা কোম্পানী হিসেবে গড়ে তুলেছি আমরা। অনেক কোম্পানিতে বীমা কার্যক্রমে পুরোপুরি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নেই। সে কারণেই অস্বচ্ছতা পরিলক্ষিত। ●

অকা/জীবী/বিসা/বিকেল, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 3 years আগে

Leave A Reply

Exit mobile version