অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ও তেলের দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোগব্যয় কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশ-এর প্রধান রপ্তানি খাতগুলোর ওপর, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে। রপ্তানিকারকরা মনে করছেন, যদি যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে নতুন রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প দেশটির অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশই আসে এই খাত থেকে। কিন্তু সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতাদের আচরণে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করছেন উদ্যোক্তারা। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে। এর ফলে ভোক্তারা তাদের ব্যয়ের অগ্রাধিকার পরিবর্তন করছেন—খাদ্য ও প্রয়োজনীয় পণ্যে বেশি ব্যয় করছেন, আর পোশাক বা লাইফস্টাইল পণ্যের মতো তুলনামূলক অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমাচ্ছেন।

রপ্তানিকারকদের মতে, এই পরিবর্তন ইতোমধ্যেই ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র এবং অস্ট্রেলিয়া-সহ বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে অনুভূত হতে শুরু করেছে। ইউরোপের কিছু ক্রেতা ইতোমধ্যে নতুন ক্রয়াদেশের পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছেন এবং কয়েকটি ক্ষেত্রে অর্ডার বাতিল হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ)-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, দেশের উদ্যোক্তারা জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন করে রপ্তানি আদেশ বাড়বে বলে আশাবাদী ছিলেন। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়িত হয়নি। তাঁর মতে, অনেক আন্তর্জাতিক ক্রেতা এখন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং নতুন অর্ডার নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সময় নিচ্ছেন।

এই উদ্বেগ কেবল তৈরি পোশাক শিল্পেই সীমাবদ্ধ নয়। অন্যান্য রপ্তানি খাতের উদ্যোক্তারাও একই ধরনের পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন। দেশের শীর্ষ পাটজাত ও লাইফস্টাইল পণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি, ক্রিয়েশন্স প্রাইভেট লিমিটেড-এর কর্মকর্তারা জানান, সম্প্রতি তারা ফ্রাঙ্কফুর্ট-এ অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশ নিয়েছিলেন। মেলা শেষে নতুন অর্ডার নিয়ে ক্রেতাদের সঙ্গে আলোচনা হওয়ার কথা থাকলেও যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অনেক ক্রেতা সেই আলোচনা স্থগিত করে দিয়েছেন।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রাশেদুল করিম মুন্না বলেন, কয়েকজন ক্রেতা আগে থেকেই নতুন অর্ডারের বিষয়ে আগ্রহ দেখালেও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তারা আপাতত সিদ্ধান্ত স্থগিত করেছেন। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে পূর্বে দেওয়া অর্ডারও বাতিল হয়েছে।

একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চামড়াজাত পণ্য ও জুতাশিল্পের উদ্যোক্তারাও। বেঙ্গল লেদার কমপ্লেক্স-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক টিপু সুলতান জানান, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের সঙ্গে আগামী মাসে নতুন অর্ডার নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধের কারণে সেই আলোচনা আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে রপ্তানি আদেশ ধরে রাখা কঠিন হয়ে যেতে পারে।

এদিকে দেশের শীর্ষ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি ডিবিএল গ্রুপ-এর ভাইস চেয়ারম্যান এম এ রহিম ফিরোজ বলেন, ইউরোপে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার খবর ইতোমধ্যেই পাওয়া যাচ্ছে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয়ও বাড়বে। ফলে ভোক্তারা স্বাভাবিকভাবেই তাদের ব্যয়ের বড় অংশ খাদ্য ও প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় করবেন, আর পোশাক কেনা তাদের অগ্রাধিকার তালিকায় নিচে নেমে যাবে।

রপ্তানি খাতে এই অনিশ্চয়তার পাশাপাশি শিল্পমালিকরা স্থানীয় জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও উদ্বিগ্ন। তারা জানিয়েছেন, তেল সরবরাহে বিঘ্ন এবং জ্বালানি বিতরণে কিছু বিধিনিষেধের কারণে কয়েকটি কারখানায় ইতোমধ্যে ডিজেলের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

শিল্পমালিকদের মতে, শিল্পকারখানাগুলো প্রধানত গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ এবং সরকারি বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাট বাড়ায় অনেক কারখানাকে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে ডিজেলের সরবরাহ ব্যাহত হলে উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে শিল্পখাতের উদ্যোক্তারা সরকারের কাছে শিল্পকারখানার জন্য ডিজেল সরবরাহে একটি নির্দিষ্ট কোটা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)-এর পরিচালক নাফিস-উদ-দৌলা সম্প্রতি জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন বলে জানা গেছে।

এদিকে প্রায় ৩০ কোটি ডলার বার্ষিক রপ্তানি আয়কারী স্নোটেক্স গ্রুপ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম খালেদ বলেন, ইতোমধ্যেই বন্দরে পণ্য পরিবহনের সময়সূচিতে জটিলতা দেখা দিয়েছে। কিছু ক্রেতা সরবরাহকারীদের নির্ধারিত সময়ের আগেই পণ্য পাঠানোর অনুরোধ করছেন যাতে সম্ভাব্য পরিবহন বিলম্ব এড়ানো যায়।

তিনি সতর্ক করে বলেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে একদিকে রপ্তানি আদেশ কমবে, অন্যদিকে তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে সুতা ও কাপড়সহ উৎপাদনের বিভিন্ন উপকরণের দাম বাড়বে। ফলে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে এবং বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা দুর্বল হতে পারে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজারগুলোতেও মূল্যস্ফীতি বাড়বে। এতে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে এবং বাংলাদেশের রপ্তানিকৃত পণ্যের চাহিদাও কমতে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন এবং জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও বাড়িয়ে দেবে।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুধু জ্বালানি বাজারেই নয়, বাংলাদেশের রপ্তানি খাতেও অনিশ্চয়তার ছায়া ফেলেছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে দেশের শিল্পখাত ও রপ্তানি আয়ের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা।

অকা/প্র/ই/দুপুর/১১ মার্চ, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 3 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version