অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
দেশের পুঁজি বাজারের ইতিহাসে ২০২৫ সালকে সবচেয়ে নিস্তেজ ও হতাশাজনক সময়গুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করছেন সংশ্লিষ্টরা। পুরো বছরজুড়েই বাজারে নতুন বিনিয়োগের প্রবাহ প্রায় থমকে ছিল। বিশেষ করে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য নতুন অর্থ বাজারে আসেনি। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের তারল্য সংকটও কার্যকরভাবে কাটেনি, যা বাজারের স্বাভাবিক গতিশীলতাকে আরও বাধাগ্রস্ত করেছে।
বাজার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরেই পুঁজি বাজার থেকে বড় অঙ্কের অর্থ তুলে নিয়েছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। শুধু ওই মাসেই তারা প্রায় ১২০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রত্যাহার করেছেন। মূলত বড় মূলধনি ও মৌলভিত্তিতে শক্তিশালী কিছু কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করেই এই অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ডিসেম্বর মাসে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির পরিমাণ ছিল প্রায় ১২০ কোটি টাকা। এতে বাজারে বিক্রির চাপ আরও বেড়ে যায় এবং সূচকের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট লিমিটেড। নভেম্বর মাসে যেখানে কোম্পানিটিতে বিদেশি মালিকানা ছিল ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ, ডিসেম্বর শেষে তা প্রায় পুরোপুরি নেমে এসে দাঁড়ায় মাত্র শূন্য দশমিক ০১ শতাংশে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটি থেকে প্রায় ৩৮ কোটি টাকার বিনিয়োগ তুলে নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া সিটি ব্যাংকেও বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। ব্যাংকটিতে বিদেশি মালিকানা কমেছে শূন্য দশমিক ৬৪ শতাংশ, যার আর্থিক মূল্য আনুমানিক ২৫ কোটি টাকা। টেলিযোগাযোগ খাতের শীর্ষ কোম্পানি গ্রামীণফোনেও বিদেশি অংশীদারত্ব কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। কোম্পানিটিতে বিদেশি মালিকানা শূন্য দশমিক ৮৭ শতাংশ থেকে কমে শূন্য দশমিক ৮০ শতাংশে নেমে আসায় প্রায় ২৪ কোটি টাকার বিনিয়োগ কমেছে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে দীর্ঘদিন জনপ্রিয় থাকা স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসেও বিনিয়োগ কমেছে। ডিসেম্বর মাসে কোম্পানিটিতে বিদেশি মালিকানা নেমে আসে ১৪ দশমিক ৫২ শতাংশে, ফলে প্রায় ১৪ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রত্যাহার হয়েছে।
এ ছাড়া ব্র্যাক ব্যাংক, রেনাটা, অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ এবং যমুনা অয়েলের মতো আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বিদেশি বিনিয়োগ সামান্য হ্রাস পেয়েছে। তবে এর বিপরীতে প্রাইম ব্যাংক, লংকাবাংলা ফাইন্যান্স ও ন্যাশনাল ব্যাংকে বিদেশি মালিকানা কিছুটা বেড়েছে, যা বাজারে সামান্য হলেও ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বর্তমানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে বিদেশি বিনিয়োগের মোট পরিমাণ প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। ডিএসইতে তালিকাভুক্ত প্রায় ৩৬০টি কোম্পানির মধ্যে মাত্র ১৩২টিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ রয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে খুবই সীমিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিদেশি মালিকানার দিক থেকে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির মোট শেয়ারের ৩৬ দশমিক ০৬ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দখলে। এরপর রয়েছে অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ, যেখানে বিদেশি মালিকানা ৩২ দশমিক ৮৩ শতাংশ। বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসে বিদেশি অংশীদারত্ব ২৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ এবং নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসে ১৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের পুঁজি বাজারে যে বিদেশি বিনিয়োগ দেখা যায়, তার বড় একটি অংশই আসে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাধ্যমে। এর বাইরে নরওয়ের সার্বভৌম তহবিল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইউরোপভিত্তিক কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বর্তমানে বাংলাদেশের পুঁজি বাজারে প্রধান বিদেশি বিনিয়োগকারী হিসেবে সক্রিয় রয়েছে।●
অকা/পুঁবা/ই/সকাল/১০ জানুয়ারী, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 5 days আগে

