অর্থকাগজ প্রতিবেদন
দেশের ব্যাংকিং খাতে মূলধন সংকট উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। দীর্ঘদিনের দুর্বল তদারকি, রাজনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় ঋণ অনুমোদন, অনিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণ এবং ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণের চাপ মিলিয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে ২০টি ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি বেড়ে প্রায় ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃতফসিল নীতির কারণে আগের প্রান্তিকের তুলনায় সামান্য স্বস্তি মিলেছে, তবুও খাতটির মৌলিক দুর্বলতা বহাল রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ২৩টি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল প্রায় ২ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা। ডিসেম্বর প্রান্তিকে ব্যাংকের সংখ্যা কমে ২০টিতে নেমে এলেও মোট ঘাটতির পরিমাণ এখনও অত্যন্ত উচ্চ অবস্থানে রয়েছে।
ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মূলধন ঘাটতি বলতে বোঝায়, কোনো ব্যাংকের নিজস্ব মূলধন ও সংরক্ষিত তহবিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত ন্যূনতম সীমার নিচে নেমে যাওয়া। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং মানদণ্ড অনুযায়ী ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ মূলধন ধরে রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু দেশের ব্যাংক খাত সেই মানদণ্ড থেকে অনেক দূরে সরে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বছরের পর বছর অনিয়মিত ঋণ বিতরণ, দুর্বল করপোরেট সুশাসন এবং রাজনৈতিক প্রভাবে বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদনের সংস্কৃতি ব্যাংক খাতকে গভীর ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। খেলাপি ঋণের লাগামহীন বিস্তার ব্যাংকগুলোর মূলধনভিত্তিকে ক্রমেই দুর্বল করে তুলছে। এর ফলে নতুন ঋণ বিতরণ এবং বিনিয়োগ সহায়তার সক্ষমতাও সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের ক্যাপিটাল টু রিস্ক ওয়েটেড অ্যাসেটস রেশিও (সিআরএআর) নেমে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে পৌঁছেছে। অথচ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এ হার কমপক্ষে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থাকার কথা। অর্থাৎ দেশের ব্যাংক খাত বর্তমানে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা বেষ্টনী ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে।
একই সময়ে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকায়, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। এত উচ্চ খেলাপি ঋণ অনুপাত ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অবস্থাও চাপের মুখে রয়েছে। ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে জনতা ব্যাংকের ঘাটতি সর্বোচ্চ ২২ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। এছাড়া অগ্রণী ব্যাংকের ঘাটতি ৬ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকের ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা এবং বেসিক ব্যাংকের ঘাটতি ৪ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা।
তবে সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোতে। সাতটি ইসলামী ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৮৭ কোটি টাকায়। এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ঘাটতি সর্বোচ্চ ৬৪ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ঘাটতি ৩০ হাজার ৫৩ কোটি টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংকের ২৯ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা, এক্সিম ব্যাংকের ২৫ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ১৫ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকা। এছাড়া ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ঘাটতি ৬ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা এবং আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের ঘাটতি ২ হাজার ১২ কোটি টাকা।
বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যেও চাপ বাড়ছে। সাতটি বেসরকারি ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংকের ঘাটতি ৯ হাজার ৩২ কোটি টাকা, এবি ব্যাংকের ৬ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা, পদ্মা ব্যাংকের ৫ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা এবং প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৪ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা। এছাড়া আইএফআইসি ব্যাংকের ঘাটতি ৪ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ২ হাজার ৬৫ কোটি টাকা এবং সিটিজেনস ব্যাংকের ঘাটতি ৮১ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর অবস্থাও দুর্বল। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঘাটতি ২ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর প্রান্তিকে মূলধন ঘাটতি কিছুটা কমে আসার পেছনে পুনঃতফসিল নীতির প্রভাব রয়েছে। পুনঃতফসিলের মাধ্যমে কিছু খেলাপি ঋণকে নিয়মিত ঋণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। ফলে এসব ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে তুলনামূলক কম প্রভিশন রাখতে হয়েছে, যা সাময়িকভাবে মূলধনের ওপর চাপ কমিয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মতে, এটি মূল সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়; বরং পরিস্থিতিকে আপাতদৃষ্টিতে সহনীয় দেখানোর একটি সাময়িক ব্যবস্থা। খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার, দায়বদ্ধতা নিশ্চিতকরণ এবং ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া প্রকৃত স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না।
অর্থনীতিবিদ ও চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো এম হেলাল আহমেদ জনি মনে করেন, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে বারবার সরকারি সহায়তা দিতে হচ্ছে, যার চাপ শেষ পর্যন্ত করদাতাদের ওপরই এসে পড়ছে। তার মতে, ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে মূলধন সংকট আরও গভীর হবে এবং তা নতুন বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, আন্তর্জাতিক লেনদেন ও বৈদেশিক অর্থায়নের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সর্বশেষ হালনাগাদ 56 minutes আগে

