অর্থকাগজ প্রতিবেদন
দেশের প্রধান শেয়ার বাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ-এ এপ্রিল মাসজুড়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বড় অঙ্কের শেয়ার বিক্রি নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দেশের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশি শেয়ার থেকে দূরত্ব বাড়াচ্ছেন।
ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে বিদেশিরা প্রায় ১২৪ কোটি ১৪ লাখ টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন। বিপরীতে একই সময়ে তাদের শেয়ার কেনার পরিমাণ ছিল মাত্র ১২ কোটি ৬ লাখ টাকা। ফলে বিদেশি লেনদেনে বড় ধরনের নেতিবাচক ভারসাম্য তৈরি হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে আন্তর্জাতিক ফান্ড ম্যানেজাররা ঝুঁকিপূর্ণ ফ্রন্টিয়ার মার্কেট থেকে অর্থ সরিয়ে তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগমুখী খাতে চলে যাচ্ছেন। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের শেয়ার বাজারে।
এপ্রিল মাসে বিদেশিদের মোট লেনদেন দাঁড়িয়েছে ১৩৬ কোটি ২০ লাখ টাকা, যা আগের মাস মার্চের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। বিশ্লেষকদের ভাষ্য, এটি শুধু বিক্রির চাপ নয়, বরং নতুন বিনিয়োগে বিদেশিদের অনাগ্রহও স্পষ্ট করছে। এতে বাজারে তারল্যের সংকট আরও প্রকট হচ্ছে।
ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি বিনিয়োগ রয়েছে এমন তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা ১৩০টি। এর মধ্যে এপ্রিল মাসে ১৯টি কোম্পানিতে বিদেশি অংশীদারিত্ব কমেছে, বেড়েছে ১৪টিতে এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ৯৭টিতে।
সবচেয়ে বেশি বিক্রির চাপ পড়েছে বড় মূলধনি ও শক্তিশালী মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলোতে। এর মধ্যে Square Pharmaceuticals থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রায় ৪০ কোটি ৭২ লাখ টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন। ফলে কোম্পানিটিতে বিদেশিদের শেয়ারধারণ ১৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ থেকে কমে ১৫ দশমিক ১১ শতাংশে নেমে এসেছে।
একইভাবে BRAC Bank-এ বিদেশিদের প্রায় ৩৭ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি হয়েছে। এতে ব্যাংকটিতে বিদেশি শেয়ারধারণ ৩৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ থেকে কমে ৩৬ দশমিক ২২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এ ছাড়া Renata PLC, British American Tobacco Bangladesh, Marico Bangladesh এবং Grameenphone-এর মতো বড় কোম্পানিতেও বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে।
কিছু প্রতিষ্ঠানে বিদেশিরা পুরোপুরি বিনিয়োগ গুটিয়ে নিয়েছেন। এপ্রিল মাসে Ring Shine Textiles ও Premier Bank-এ থাকা অবশিষ্ট সব শেয়ার বিক্রি করে বেরিয়ে গেছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। অন্যদিকে প্রথমবারের মতো Bangladesh National Insurance-এ বিদেশি বিনিয়োগ প্রবেশ করেছে।
বিদেশি ক্রয়ের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবস্থানে ছিল BSRM Steels। কোম্পানিটিতে প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ টাকার শেয়ার কেনেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। এতে তাদের শেয়ারধারণ শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে বেড়ে শূন্য দশমিক ৬০ শতাংশে পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকারের মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে—এমন প্রত্যাশা তৈরি হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। বরং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় বাংলাদেশ অতিরিক্ত ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের শেয়ার বাজারে শক্তিশালী করপোরেট সুশাসন ও উন্নত মৌলভিত্তির কোম্পানির সংখ্যা তুলনামূলক কম। ফলে বিদেশি বিনিয়োগ সীমিত কয়েকটি শেয়ারে কেন্দ্রীভূত থাকে। এ অবস্থায় নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হলে বড় ধরনের বিক্রির চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এ ছাড়া দুর্বল করপোরেট সুশাসন, আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতার অভাব, জাঙ্ক শেয়ারের আধিক্য, মূলধনি মুনাফার কর কাঠামোর জটিলতা এবং বিদেশে অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়াগত সীমাবদ্ধতাও দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি বিনিয়োগে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ডিএসই কর্মকর্তাদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের এই ধারাবাহিক বিক্রি শেয়ার বাজার নিয়ন্ত্রকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। কারণ বিদেশিরা যখন City Bank, Southeast Bank, Beximco Pharmaceuticals এবং IDLC Finance-এর মতো শীর্ষ কোম্পানিগুলো থেকেও বিনিয়োগ কমাচ্ছেন, তখন ডিএসইএক্স সূচকের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।
সর্বশেষ হালনাগাদ 1 hour আগে

