অর্থকাগজ প্রতিবেদন
দেশের রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং করের আওতা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ব্যাংক হিসাব খোলা ও তা সচল রাখার ক্ষেত্রে ট্যাক্সপেয়ার আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা করছে সরকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, কেবল নতুন হিসাব খোলাই নয়, বর্তমানে চালু থাকা বিদ্যমান ব্যাংক হিসাবগুলো সচল রাখতেও এই নিয়ম প্রযোজ্য হতে পারে। আসন্ন জাতীয় বাজেটে অর্থমন্ত্রী এই সংক্রান্ত একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পেশ করতে পারেন বলে আভাস পাওয়া গেছে।
এনবিআর-এর নীতিগত আলোচনা থেকে জানা গেছে, সর্বসাধারণের জন্য এই নিয়ম চালুর পরিকল্পনা থাকলেও কিছু নির্দিষ্ট শ্রেণির ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে। এর মধ্যে সাধারণ শিক্ষার্থী, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতাধীন সরকারি ভাতাভোগী এবং বিশেষ গেজেটের মাধ্যমে কর অব্যাহতি প্রাপ্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানসমূহ এই বাধ্যবাধকতার বাইরে থাকতে পারে।
বর্তমানে দেশে বিপুল সংখ্যক ব্যাংক হিসাব সচল থাকলেও তাদের একটি বড় অংশের কোনো টিআইএন নেই। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, টিআইএন না থাকলে ব্যাংক আমানতের সুদের ওপর বেশি হারে উৎসে কর কর্তন করা হয়, তবে হিসাব সচল রাখার জন্য এটি আগে বাধ্যতামূলক ছিল না।
সরকারের এই সম্ভাব্য সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ব্যাংকিং খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের মতে, এই নিয়ম কার্যকর হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহারের আগ্রহ কমতে পারে, যা সামগ্রিক লেনদেনের পরিমাণ এবং ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা—দুটিই কমিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করবে।
অন্যদিকে, কর বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, ব্যাংক হিসাবের সাথে টিআইএন যুক্ত হলে আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা আসবে, সরকারের নজরদারি বাড়ানো সহজ হবে এবং বড় অঙ্কের কর ফাঁকির সুযোগ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে।
রাজস্ব প্রশাসনকে আরও আধুনিক করতে এনবিআর ব্যাংকিং ব্যবস্থার তথ্যের সঙ্গে সরাসরি অনলাইনভিত্তিক সংযুক্তির (ইন্টিগ্রেশন) উদ্যোগ নিয়েছে। এর পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), ইউটিলিটি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এবং সাব-রেজিস্ট্রি অফিসসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার ডেটাবেজের সাথে সমন্বয় সাধনের পরিকল্পনাও চলছে।
একই সাথে করের জাল বিস্তার করতে আরও কিছু নতুন পদক্ষেপের কথা ভাবা হচ্ছে। যার মধ্যে রয়েছে:
-
১৫০ সিসি বা তার চেয়ে বেশি ক্ষমতার মোটরসাইকেল নিবন্ধনে টিআইএন প্রদর্শন।
-
উৎসে কর কর্তনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট ‘উইথহোল্ডার্স রেজিস্ট্রেশন নম্বর’ (উইন) চালু।
-
খুচরা পর্যায়ে ব্যবসায়ীদের ওপর শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান এই বিষয়ে তাঁর আশঙ্কার কথা জানিয়ে বলেন, "এর আগে ক্রেডিট কার্ডের জন্য টিআইএন বাধ্যতামূলক করার পর কার্ড নেওয়ার প্রবণতা কমেছিল। নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাংক লেনদেনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। মানুষের মনে ব্যাংকিং খাত নিয়ে যে এক ধরনের ভীতি বা দ্বিধা রয়েছে, কোনো কিছু বাধ্যতামূলক করার আগে এনবিআরের উচিত সেই ভীতি দূর করা।"
বর্তমানে দেশে প্রায় ১৭ কোটি ব্যাংক হিসাব থাকলেও, একাধিক হিসাব থাকার কারণে প্রকৃত আমানতকারীর সঠিক সংখ্যা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
কর বিশেষজ্ঞ ও এসএমএসি অ্যাডভাইজরি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া মনে করেন, নগদনির্ভর একটি অর্থনীতিতে হুট করে ই-টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হলে তা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির যাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, "এ ধরনের কঠোর নিয়ম উদ্যোক্তাদের আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে ঠেলে দিতে পারে, যা নগদ লেনদেনের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়াবে এবং শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের আমানত ও তারল্য সংকটের কারণ হতে পারে।"
তিনি আরও পরামর্শ দেন যে, কঠোর বাধ্যবাধকতা আরোপ না করে সরকারের উচিত প্রথমে একটি ক্যাশলেস বা নগদবিহীন লেনদেন ব্যবস্থা জোরদার করা এবং ধাপে ধাপে কর ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় সাধন করা। জাতীয় সম্পদসংক্রান্ত তথ্যভান্ডারকে কর রিটার্নের সঙ্গে পুরোপুরি একীভূত করতে পারলে কর ফাঁকি রোধ এবং করদাতার পরিধি বাড়ানো অনেক সহজ হবে।

