অর্থকাগজ প্রতিবেদন
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে আর্থিক অব্যবস্থাপনা ও নীতিনির্ধারণী দুর্বলতার কারণে সামগ্রিক স্থিতিশীলতা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের ২০টি ব্যাংকে মূলধন ঘাটতির পরিমাণ মাত্র তিন মাসে বেড়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে এই ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি ছিল ৫৩ হাজার ২৫৩ কোটি টাকা। কিন্তু বছরের শেষ প্রান্তিক, অর্থাৎ অক্টোবর-ডিসেম্বরে ঘাটতির অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭১ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকায়। ফলে শুধু এক প্রান্তিকের ব্যবধানেই এই ২০ ব্যাংকের ঘাটতির পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।
যদিও অন্যান্য কিছু ব্যাংকে মূলধন উদ্বৃত্ত থাকায় সামগ্রিক ব্যাংক খাতের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৭ হাজার ৬৪৭ কোটি টাকায়, তা সত্ত্বেও ব্যাংক খাতের বড় একটি অংশের এই রূপে বিপর্যস্ত হয়ে পড়া দেশের আর্থিক খাতের জন্য অশনিসংকেত বয়ে আনছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যেসব ব্যাংক ঘাটতির শীর্ষে রয়েছে, তাদের বেশিরভাগই বিগত এক দশকের বেশি সময় ধরে ক্রমাগত লোকসানে পরিচালিত হচ্ছে এবং তাদের বার্ষিক মুনাফা প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণের জন্য যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক এককভাবে সর্বোচ্চ মূলধন ঘাটতির দায় বহন করছে—যার পরিমাণ ডিসেম্বর শেষে দাঁড়িয়েছে ৫২ হাজার ৮৯১ কোটি টাকা। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ঘাটতি ১৮ হাজার ১৯৯ কোটি, ইউনিয়ন ব্যাংকের ১৫ হাজার ৬৯০ কোটি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ১৩ হাজার ৯৯১ কোটি এবং ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ঘাটতি ১২ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা।
এছাড়া, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে ঘাটতির পরিমাণ ১১ হাজার ৭০৯ কোটি, আইএফআইসি ব্যাংকে ৯ হাজার ২৯ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংকে ৭ হাজার ৭৯৯ কোটি, রূপালী ব্যাংকে ৫ হাজার ১৯২ কোটি, পদ্মা ব্যাংকে ৪ হাজার ৯৮৫ কোটি, অগ্রণী ব্যাংকে ৪ হাজার ৬৮৬ কোটি এবং বেসিক ব্যাংকে ৩ হাজার ১৫৬ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে। এর বাইরেও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে ২ হাজার ৯০৫ কোটি, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে ২ হাজার ৪৭০ কোটি, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকে ১ হাজার ৯১০ কোটি, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকে ১ হাজার ৮৬২ কোটি এবং বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে ১ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকার ঘাটতি দেখা গেছে। এমনকি বিদেশি ব্যাংক হাবিব ব্যাংকও মূলধন ঘাটতির তালিকায় রয়েছে, যার পরিমাণ ১২ কোটি টাকা।
এই ঘাটতির একটি বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ব্যাংকগুলোর উচ্চ খেলাপি ঋণের বোঝা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা বেশি। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে এই অঙ্ক ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। শুধু খেলাপি ঋণ নয়, ঋণ অবলোপনের (write-off) হারও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে অবলোপনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮১ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা, যা এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ৯ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা। এর পাশাপাশি পুনঃতফসিল করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৫ হাজার ১২২ কোটি টাকা।
এত বিপুল পরিমাণ খেলাপি ও অবলোপন করা ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোকে প্রভিশন সংরক্ষণে বাধ্য করা হয়েছে, যা তাদের মূলধন ঘাটতিকে আরও তীব্র করে তুলেছে। প্রভিশন সংরক্ষণের চাপ মেটাতে গিয়ে অনেক ব্যাংক মুনাফা হ্রাসে পড়ে যায়, ফলে মূলধন মজুদ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের সম্মিলিত মূলধন ও ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের অনুপাত বা সিআরএআর (Capital to Risk Weighted Asset Ratio) নেমে এসেছে মাত্র ৩ দশমিক ০৮ শতাংশে, যেখানে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী এই হার হওয়া উচিত কমপক্ষে ১০ শতাংশ। সিআরএআর সেপ্টেম্বরে ছিল ৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এই পতন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের চরম লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা বিদেশি বিনিয়োগকারী ও লেনদেন অংশীদারদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করতে পারে।
ব্যাসেল-৩ নীতিমালার আওতায় প্রতিটি ব্যাংককে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের ন্যূনতম ১০ শতাংশ মূলধন সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক। ব্যাংকগুলোর উদ্যোক্তাদের প্রাথমিক পুঁজি এবং ব্যাংকের মুনাফা থেকেই মূলত এই মূলধন সংরক্ষণের কথা থাকলেও অনেক ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে লোকসান ও অনিয়মের কারণে সেই সক্ষমতা হারিয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি এবং ঋণ অনিয়মের কারণেই আজ এই পরিস্থিতি। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল আমিন মনে করেন, উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে প্রভিশন ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় অনেক ব্যাংক মুনাফা থেকে মূলধন সংরক্ষণে ব্যর্থ হচ্ছে। এই ব্যাংকগুলো দীর্ঘদিন ধরে লোকসান গুনলেও পূর্ববর্তী সরকারের আশীর্বাদে তথ্য গোপন রেখে টিকে ছিল। এখন সেসব বাস্তবতা একে একে প্রকাশ পাচ্ছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, মূলধন ঘাটতির কারণে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে। তাদের ঋণ বিতরণের সক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে, বিদেশি লেনদেনে আস্থা হারাচ্ছে এবং শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতাও হারাচ্ছে। ফলস্বরূপ, এসব ব্যাংকের সুনাম ও গ্রাহকভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, এবং ক্রেডিট রেটিংয়ের অবনতি হচ্ছে। এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে এলসি খোলার সময় মার্জিন বাড়ছে, যা আমদানি কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলছে।
অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ মনে করেন, দেশের আর্থিক খাতে গত ১৫ বছরে যা হয়েছে, তা কেবল ‘অরাজকতা’ নয়—বরং সুপরিকল্পিত লুটপাট। তার ভাষায়, দেশে বর্তমানে ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে অন্তত ৩০টির অবস্থা ভালো নয়। কয়েকটি ব্যাংক এমনকি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন পরিশোধেও ব্যর্থ হচ্ছে। আবার অনেক নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না, যা সঞ্চয়কারীদের আস্থায় বড় ধাক্কা দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে ব্যাংক খাতে চলমান এই সংকট শুধু আর্থিক নয়, এটি একটি কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। এর থেকে উত্তরণে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দোষীদের জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার ক্ষমতায়ন এবং একটি কার্যকর পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন। তা না হলে পুরো আর্থিক খাত ধসে পড়ার ঝুঁকি থেকে যাবে।
অকা/ব্যাংখা/ই/সকাল/২২ মে,২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 10 months আগে

Leave A Reply

Exit mobile version