অর্থকাগজ প্রতিবেদন

টানা কয়েক বছরের স্থবিরতা কাটিয়ে দেশের মোটরসাইকেল শিল্প আবারও প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে শুরু করেছে। করোনা মহামারির অভিঘাত, বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট, ডলার–সংকট এবং দীর্ঘ সময়ের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে যে শিল্পটি উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছিল, সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে পুনরুদ্ধারের স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে। একই সঙ্গে আমদানিনির্ভর বাজার থেকে দেশীয় উৎপাদনকেন্দ্রিক শিল্পে রূপান্তর এবং রফতানি সম্ভাবনার উন্মোচন এই খাতকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে।

শিল্পসংশ্লিষ্ট সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে দেশে মোটরসাইকেল বিক্রি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ২৪ হাজার ৩০৪ ইউনিটে, যা আগের বছরের তুলনায় ৮ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি। অথচ ২০২০ সালে যেখানে বাজারের আকার ছিল ৬ লাখ ২৫ হাজার ইউনিটের বেশি, সেখানে মহামারির ধাক্কা ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে বিক্রি নেমে এসেছিল ৩ লাখ ৯২ হাজার ৬১০ ইউনিটে। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর বিক্রির এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে নতুন আশাবাদ তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বিক্রি বাড়াই নয়, দেশের মোটরসাইকেল শিল্পের কাঠামোগত পরিবর্তনও এখন উল্লেখযোগ্য। এক দশক আগে দেশের মোটরসাইকেল বাজারের অধিকাংশই বিদেশ থেকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত যান আমদানির ওপর নির্ভরশীল ছিল। বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশের সড়কে চলাচলকারী প্রায় ৯৯ শতাংশ মোটরসাইকেলই এখন স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত অথবা দেশীয় সংযোজন কারখানায় তৈরি। ফলে শিল্পটি এখন কেবল ভোক্তা বাজার নয়, উৎপাদনভিত্তিক শিল্প হিসেবেও শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।

বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় ৮ লাখ মোটরসাইকেল উৎপাদন ও সংযোজনের সক্ষমতা রয়েছে। অথচ অভ্যন্তরীণ চাহিদা বছরে প্রায় ৫ লাখ ইউনিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ। উৎপাদন সক্ষমতা ও বাজার চাহিদার এই ব্যবধান দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোকে রফতানি বাজারের দিকে আরও বেশি মনোযোগী করে তুলেছে।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজার পুনরুদ্ধারের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কারণ কাজ করেছে। করোনা-পরবর্তী সময়ে দীর্ঘদিন ডলার সংকট, আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকগুলোর ঋণপত্র (এলসি) খোলায় অনীহার কারণে কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে বিঘ্ন ঘটে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাজারেও সরবরাহ সংকট তৈরি হয়। তবে গত এক বছরে বৈদেশিক মুদ্রা পরিস্থিতির উন্নতি, এলসি কার্যক্রম স্বাভাবিক হওয়া এবং সরবরাহ ব্যবস্থার পুনরুদ্ধারের ফলে উৎপাদন ও বিক্রি উভয়ই গতি পেতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ক্রয় স্থগিত রাখা ভোক্তাদের একটি বড় অংশও আবার বাজারে ফিরেছে।

বাজারের এই পুনরুদ্ধারে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে জাপানি ব্র্যান্ড হোন্ডা ও ইয়ামাহা। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বছরে ইয়ামাহা ৮৮ হাজার ২৮৯টি মোটরসাইকেল বিক্রি করে প্রায় ২১ শতাংশ বাজার দখল করেছে। অন্যদিকে হোন্ডার বিক্রি ৮৪ হাজার ৮১৩ ইউনিটে পৌঁছেছে, যা মোট বাজারের প্রায় ২০ শতাংশ। জুন মাসে এককভাবে সর্বোচ্চ বিক্রির অবস্থানে ছিল হোন্ডা। একই সময়ে সুজুকি, হিরো ও বাজাজও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, তুলনামূলক কম জ্বালানি খরচ, নির্ভরযোগ্য মান এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্য এসব ব্র্যান্ডকে ক্রেতাদের কাছে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছে।

দেশীয় মোটরসাইকেল শিল্পের বিকাশে সরকারি নীতিগত সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সম্পূর্ণ প্রস্তুত মোটরসাইকেলের আমদানি শুল্ক কমিয়ে স্থানীয় সংযোজন শিল্পকে উৎসাহ দেওয়ার পর এই খাতে বিনিয়োগ দ্রুত বাড়তে শুরু করে। পরবর্তীতে রাইড-শেয়ারিং সেবার সম্প্রসারণ মোটরসাইকেলের ব্যবহার ও চাহিদাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। বর্তমানে এই শিল্পে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।

বর্তমানে দেশে ১০টি উৎপাদন ও সংযোজন কারখানায় জাপানের হোন্ডা, ইয়ামাহা ও সুজুকি, ভারতের বাজাজ, হিরো ও টিভিএসের পাশাপাশি দেশীয় ব্র্যান্ড রানারের মোটরসাইকেল উৎপাদন বা সংযোজন করা হচ্ছে। এতে দেশের শিল্পভিত্তি আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে।

দেশীয় বাজারের পাশাপাশি রপ্তানিতেও ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশে উৎপাদিত মোটরসাইকেল প্রথমবারের মতো মেক্সিকোতে রফতানি হয়েছে, যা দেশের মোটরসাইকেল শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর আগে একই প্রতিষ্ঠান গুয়াতেমালাতেও মোটরসাইকেল রফতানি করেছিল। অন্যদিকে দেশীয় প্রতিষ্ঠান রানার অটোমোবাইলস ইতোমধ্যে নেপাল ও ভুটানসহ আঞ্চলিক বাজারে রফতানি কার্যক্রম শুরু করেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ধারাবাহিকভাবে নতুন বাজারে প্রবেশ করতে পারলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার সম্ভাবনাময় মোটরসাইকেল উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

তবে শিল্পটির সামনে এখনও বেশ কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। একটি মোটরসাইকেল উৎপাদনে ৭০০টিরও বেশি যন্ত্রাংশের প্রয়োজন হলেও দেশে এখনো খুব সীমিত সংখ্যক যন্ত্রাংশ স্থানীয়ভাবে তৈরি হয়। ফলে অধিকাংশ উপাদান বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীলতাও থেকে যাচ্ছে। একই সঙ্গে শুল্ক প্রক্রিয়ার জটিলতা, বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার সীমাবদ্ধতা, বন্দরে পণ্য ছাড়ে বিলম্ব এবং উচ্চ লজিস্টিক ব্যয় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করছে।

শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, ভারতসহ প্রতিযোগী দেশগুলো কর-সুবিধা, সহজ ঋণ এবং শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে তোলার মাধ্যমে মোটরসাইকেল শিল্পকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে নিয়ে গেছে। বাংলাদেশেও যন্ত্রাংশ উৎপাদনে বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, কর ও ভ্যাটে প্রণোদনা, সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি ব্যাংকঋণ এবং রফতানিমুখী নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এই শিল্প আরও দ্রুত সম্প্রসারিত হতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার এখন ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হচ্ছে। তবে উৎপাদন সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে রফতানিই হবে আগামী দিনের প্রধান চালিকাশক্তি। আর সেই লক্ষ্য অর্জনে স্থানীয় যন্ত্রাংশ শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতি প্রণয়নই হতে পারে বাংলাদেশের মোটরসাইকেল শিল্পের টেকসই প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি।

সর্বশেষ হালনাগাদ 17 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version