প্রণব মজুমদার
রফতানি আয়ে বাংলাদেশ নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এপ্রিল, ২০২২ পর্যন্ত চলতি অর্থ বছরের ১০ মাসে তা পূরণ হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, গত অর্থ বছর রফতানি আয় হয়েছে ৪ হাজার ৪২২ কোটি মার্কিন ডলার। চলতি অর্থ বছরের প্রথম ৯ মাসে রফতানি আয় গত অর্থ বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩ হাজার ৮৬১ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে এ অর্থ বছরে রফতানি আয়ে বাংলাদেশ নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করবে।
বাংলা নববর্ষ ১৪২৯ উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে এসব কথা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনা ভাইরাসের মহামারীর সময়ও ২০২০-২০২১ অর্থবছরে আমাদের জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পায়। গত অর্থ বছর রেকর্ড ২ হাজার ৪৭৭ কোটি মার্কিন ডলার রেমিটেন্স এসেছে দেশে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি বিগত ১৩ বছরে যে শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েছে তা অর্থনীতির সামষ্টিক সূচকগুলো বিবেচনা করলেই স্পষ্ট হয়। ২০০৯ সালে জিডিপি’র আকার ছিল মাত্র ১০ হাজার ২০০ কোটি ডলার। ২০২১ সালে তা ৪১ হজার ৬০০ কোটি মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। মাথাপিছু আয় ৭০২ মার্কিন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ২ হাজার ৫৯১ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, পদ্মা সেতু নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত হচ্ছে, কোনো ঋণ নেওয়া হয়নি। দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞদের দ্বারা অর্থনৈতিক সমীক্ষার মাধ্যমে আমরা অন্যান্য মেগা প্রকল্পগুলো গ্রহণ করেছি। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আমাদের অর্থনীতির চেহারা বদলে যাবে।
তিনি বলেন, ২০২২ এবং ২০২৩ হবে বাংলাদেশের জন্য অবকাঠামো উন্নয়নের এক মাইল ফলকের বছর। আর কয়েক মাস পরেই চালু হতে যাচ্ছে বহুল প্রত্যাশিত পদ্মা সেতু। এই সেতু জিডিপিতে ১ দশমিক ২ শতাংশ হারে অবদান রাখবে বলে তিনি আশা করেন। এ বছরের শেষ নাগাদ উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার অংশে মেট্রোরেল চালু হবে। আশা করা যায়, মেট্রোরেল রাজধানী ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে। আগামী অক্টোবর মাসে চট্টগ্রামে কর্ণফুলি নদীর তলদেশ দিয়ে চালু হবে দেশের প্রথম টানেল। এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন প্রথম ইউনিট আগামী বছরের শেষ নাগাদ চালু হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
সাধারণ মানুষের জীবনযাপনে স্বস্তি নিয়ে আসতে সাধ্যমত চেষ্টা করা হচ্ছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনা ভাইরাসের মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং এই যুদ্ধের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে পণ্যের দামে অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে।
করোনা মহামারির ভয়াবহ অবস্থা থেকে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন আগের অবস্থায় ফেরায় গার্মেন্টস পণ্যের রফতানি বেড়েছে। সার্বিকভাবে গত এপ্রিল দেশে রফতানি আয় ৫১ দশমিক ১৮ শতাংশ বেড়েছে।
৯ মে রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যে জানা গেছে, চলতি অর্থ বছরের প্রথম ১০ মাসে জুলাই থেকে এপ্রিল, গত অর্থ বছরের একই সময়ের তুলনায় আয় ৩৫ দশমিক ১৪ শতাংশ বেড়ে ৪৩ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
ইপিবির তথ্য বলছে, চলতি অর্থ বছর শেষ হওয়ার ২ মাস আগেই রফতানি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেছে বাংলাদেশ। চলতি অর্থ বছরের দশম মাস এপ্রিল বিভিন্ন পণ্য রফতানি করে ৪৭৩ কোটি ৮৭ লাখ (৪.৭৪ বিলিয়ন) ডলার বিদেশি মুদ্রা এনেছেন বাংলাদেশের রফতানিকারকরা।
ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুলাই-এপ্রিল সময়ে তৈরি পোশাক রফতানি থেকে আয় হয়েছে ৩৫ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার, যা গত অর্থ বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩৬ শতাংশ বেশি। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এই খাত থেকে আয় বেড়েছে প্রায় ২২ শতাংশ।
গত বছরের এপ্রিলের চেয়ে ৫১ দশমিক ১৮ শতাংশ বেশি রফতানি আয় দেশে এসেছে। এ মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আয় বেশি এসেছে ৪০ দশমিক ৬৬ শতাংশ। অর্থ বছরের হিসাবে ১০ মাসে অর্থাৎ জুলাই-এপ্রিল সময়ে ৪৩ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার আয় করেছেন রফতানিকারকরা। এই অঙ্ক গত অর্থ বছরের পুরো সময়ের (২০২১ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের এপ্রিল) চেয়েও ১২ শতাংশ বেশি।
রফতানির এই ধারা অব্যাহত থাকলে অর্থ বছর শেষে এবার রফতানি আয় ৫২ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করে রফতানি বাণিজ্যে ইতিহাস সৃষ্টি করবে বাংলাদেশ এমন ধারণা ইপিবির। অর্থ বছরের বাকি দুই মাসেও মে ও জুন) এই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে বলে আশা করছেন রফতানিকারকরা।
এপ্রিল মাসে রফতানির লক্ষ্যমাত্রা ধরা ছিল ৩৩৬ কোটি ৯০ লাখ ডলার। গত বছরের এপ্রিলে পণ্য রফতানি থেকে ৩১৩ কোটি ৪৪ লাখ ডলার আয় হয়েছিল। ১০ মাসের হিসাবে সার্বিক রফতানি আয় বেড়েছে ৩৫ দশমিক ১৪ শতাংশ। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আয় বেশি এসেছে ২০ দশমিক ৫২ শতাংশ।
একক মাসের হিসাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে এপ্রিল মাসের এই আয় চতুর্থ সর্বোচ্চ। সবচেয়ে বেশি এসেছিল গত বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে ৪৯০ কোটি ৭৭ লাখ (৪ দশমিক ৯০ বিলিয়ন) ডলার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এসেছিল চলতি বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে ৪৮৫ কোটি ৩ লাখ ৭০ হাজার (৪ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন) ডলার। মার্চে এসেছিল ৪৭৬ কোটি ২২ লাখ ডলার। ফেব্রুয়ারিতে এসেছে ৪২৯ কোটি ৪৫ লাখ (৪ দশমিক ২৯ বিলিয়ন) ডলার।
দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক রিজার্ভ নিয়ে চিন্তিত। বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, মার্চ অবধি চলতি অর্থ বছরের প্রথম ৯ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৪৯০ কোটি ডলার। যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। রফতানির চেয়ে আমাদানি বেশি হওয়ায় রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ছে।
৮ মে প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যের (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট) হালনাগাদ প্রতিবেদন এই তথ্য তুলে ধরা হয়।
তথ্য বলছে, বাণিজ্য ঘাটতির এই অঙ্ক জাতীয় বাজেট অর্থাৎ ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার এক-তৃতীয়াংশের বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী চলতি অর্থ বছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে রফতানি বেড়েছে ৩২ দশমিক ৯২ শতাংশ। অন্যদিকে আমদানি বেড়েছে ৪৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এই নয় মাসে রফতানি থেকে দেশ আয় করেছে তিন হাজার ৬৬২ কোটি ডলার। পণ্য আমদানির পেছনে ব্যয় হয়েছে ৬ হাজার ১৫২ কোটি ডলার। আমদানি ব্যয় থেকে রফতানি আয় বাদ দিলে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় দুই হাজার ৪৯০ কোটি ডলার।
আমদানি ও রফতানি বাণিজ্যের ভারসাম্যহীনতা আমাদের অর্থনীতির ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির জন্য বাধা। এ সংকট থেকে অবশ্যিই বের হতে হবে আমাদের। যেসব পণ্য আমাদের দেশে উৎপন্ন হয়, তা বাড়িয়ে সে দ্রব্য আমদানি কমিয়ে আনা উচিত। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা রক্ষায় বিলাস পণ্য আমদানি একেবারে কমিয়ে আনতে হবে। ভাবতে হবে দেশটা সবার, দুর্যোগের সংকট কাটাতে সংযমী হওয়া দরকার। তাছাড়া দেশীয় পণ্য কিনে আমরা ধন্য হবো এ ভাবনা নিয়ে আমদের হোক আগামী দিন। ●
লেখক সব্যসাচী লেখক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও অর্থকাগজ সম্পাদক

reporterpranab@gmail.com

অকা/নিলে/দুপুর, ৫ জুন, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 4 years আগে

Leave A Reply

Exit mobile version