অর্থকাগজ প্রতিবেদন>
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) নিবন্ধন ও লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করে ‘নিরাপদ খাদ্য প্রবিধানমালা, ২০২৬’ জারি করা হয়েছে। খাদ্যে শৃঙ্খলা আনার এ উদ্যোগ প্রশংসিত হলেও, এর মধ্যে থাকা ১৭টি সংস্থার লাইসেন্সের ভিড়ে নতুন এই বাধ্যবাধকতা ‘১৮ নম্বর লাইসেন্সের বোঝা’ হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের আশঙ্কা, একাধিক সংস্থার নিয়ন্ত্রণ ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ব্যবসার খরচ বাড়বে, যার চূড়ান্ত আর্থিক চাপ গিয়ে পড়বে সাধারণ ভোক্তাদের ওপরই।
নতুন এই প্রবিধিমালায় পুরো খাদ্য ব্যবসাকে মূলত দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। সাধারণ রেস্তোরাঁ, বেকারি, ফলের জুস বার, পেস্ট্রি শপ, ক্যাটারিং সার্ভিস, মিষ্টির দোকান, দুগ্ধজাত পণ্য প্রস্তুতকারক এবং পিঠা বা পুরি বিক্রেতাসহ ফুটপাতের ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাদের জন্য ‘নিবন্ধন’ নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অন্যদিকে শিশুখাদ্য, প্রবীণ বা বিশেষ চিকিৎসায় ব্যবহৃত খাদ্য, পুষ্টিসমৃদ্ধ (ফর্টিফায়েড) খাদ্য, জৈবপণ্য, জেনেটিক্যালি মোডিফাইড (জিএমও) খাদ্য, তেজস্ক্রিয় প্রক্রিয়াজাত পণ্য, কোল্ডস্টোরেজ এবং ভোজ্যতেলের পাইকারি ও আমদানির জন্য কঠোর শর্তযুক্ত ‘লাইসেন্স’ নিতে হবে।
এসব লাইসেন্স ও নিবন্ধনের মেয়াদ থাকবে তিন বছর। নিবন্ধন ফি ১ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হলেও লাইসেন্স ফি নির্ধারিত হবে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মেঝের আয়তনের ওপর ভিত্তি করে। ছোট দোকানের ক্ষেত্রে এটি ১ হাজার থেকে শুরু করে বড় গুদামের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। প্রতিটি খাদ্যপণ্যের প্যাকেজিং, বিল ও প্যাডে এই লাইসেন্স নম্বর, পরিচিতিমূলক কোড বা কিউআর কোড স্পষ্টাক্ষরে প্রদর্শন করা বাধ্যতামূলক। প্রবিধানমালায় বলা হয়েছে, এই নিয়ম লঙ্ঘন করে অনিবন্ধিত ব্যবসা পরিচালনা করলে সর্বোচ্চ দুই থেকে চার বছরের কারাদণ্ড কিংবা ২ থেকে ৮ লাখ টাকা জরিমানা এবং বিনা লাইসেন্সে ব্যবসা করলে সর্বোচ্চ তিন থেকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড কিংবা জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে ৩ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের মার্কেটিং ডিরেক্টর কামরুজ্জামান কামাল নতুন এই প্রবিধানমালাকে ব্যবসায়ীদের ওপর ‘১৮ নম্বর লাইসেন্সের বোঝা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, বর্তমানে শুধু ব্যবসা পরিচালনা করতেই খাদ্য উৎপাদক ও আমদানিকারকদের প্রায় ১৭টি ভিন্ন সরকারি দপ্তর ও সংস্থা থেকে অনুমতি নিতে হয়। উদ্দেশ্য ভালো হলেও এভাবে একাধিক সংস্থাকে বারবার ফি ও নিবন্ধন দেওয়ার এ প্রক্রিয়া পণ্যের গুণগত মান না বাড়িয়ে শুধু ব্যবসার পরিচালনা ব্যয় অনাবশ্যকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে। একই সঙ্গে এটি সঠিকভাবে প্রয়োগ করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বিএফএসএর রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
মাঠপর্যায়ে এ আইনের বাস্তবায়ন নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান। তার মতে, ফুটপাত থেকে শুরু করে সুপারশপ পর্যন্ত বিস্তৃত দেশের বিশাল অনানুষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক খাতকে একা তদারকি করার মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা ও জনবল নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নেই। তা ছাড়া বাজারে আগে থেকেই একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠান নজরদারি করছে, ফলে সব প্রশাসনিক ক্ষমতা একক প্রতিষ্ঠানের অধীনে নিয়ে যাওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত, সে প্রশ্ন থেকে যায়।
ব্যবসায়ী ও প্রতিনিধিদের এসব উদ্বেগের জবাবে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানিয়েছেন, তারা শুরুতেই ছোট বা ফুটপাতের বিক্রেতাদের ওপর চাপ না দিয়ে বড় শিল্পভিত্তিক খাদ্য উৎপাদনের দিকে প্রাথমিক নজর দেবেন। বিএসটিআইয়ের মতো সংস্থা থেকে আগেই অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলো তাৎক্ষণিক কোনো অসুবিধায় পড়বে না, তবে স্বাধীনভাবে খাদ্য মান পরীক্ষা চালিয়ে যাবে বিএফএসএ।
সর্বশেষ হালনাগাদ 52 minutes আগে

